বৈশ্বিক জ্বালানি বাণিজ্যের গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত বাণিজ্যপথ বাব আল-মান্দেব প্রণালির আশপাশ থেকে হুথি যোদ্ধাদের হটিয়ে দিয়েছে ইয়েমেনের সেনাবাহিনী। পাশাপাশি লোহিত সাগরের তীরবর্তী ইয়েমেনি বন্দর শহর মোখার নিয়ন্ত্রণ নিয়েছে বলেও দাবি করেছে সশস্ত্র বাহিনী।
সোমবার লোহিত সাগরের উপকূল ধরে সৌদি-সমর্থিত ইয়েমেনি সরকারি বাহিনী দ্রুত অগ্রসর হয়। এ সময় তারা বাব আল-মান্দেব প্রণালির আশপাশের বেশ কয়েকটি অবস্থান থেকে ইরান-সমর্থিত হুথি যোদ্ধাদের হটিয়ে দেয় এবং গুরুত্বপূর্ণ বন্দরনগরী মোখার দিকে এগিয়ে যায়।
সোমবার স্থানীয় সময় বিকালের দিকে এক বিবৃতিতে ইয়েমেনের আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত প্রেসিডেন্সিয়াল পরিষদ সরকারের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, মোখা সরকারি বাহিনীর দখলে এসেছে। সরকারি আরেকটি সূত্রের তথ্য অনুসারে, সৌদি বিমানবাহিনীর ব্যাপক সহায়তায় সৈন্যরা শহরটির উপকণ্ঠে পৌঁছেছে।
খবর পাওয়া গেছে, হুথি যোদ্ধারা পাহাড়ি এলাকার দিকে পিছু হটছে। এই দাবির সত্যতা অবশ্য নিরপেক্ষভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি। আর হুথি বিদ্রোহীরা ইয়েমেনি সরকারের এই দাবিকে ভিত্তিহীন বলে প্রত্যাখ্যান করেছে।
ইয়েমেনি বাহিনী অবশ্য সোমবারের আগেই বাব আল-মান্দেব প্রণালির প্রবেশপথের কাছে গুরুত্বপূর্ণ কিছু অবস্থান দখল করে নিয়েছিল, যার মধ্যে ধুবাব জেলার একটি বিমানঘাঁটিও রয়েছে।
বাব আল-মান্দেবের প্রবেশমুখ এলাকাটি কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, এই প্রণালি লোহিত সাগরের সঙ্গে এডেন উপসাগরের সংযোগ স্থাপন করেছে এবং একই সঙ্গে এটি বিশ্বব্যাপী জাহাজ চলাচল ও জ্বালানি সরবরাহের একটি প্রধান পথ।
সৌদি-নেতৃত্বাধীন জোট জানিয়েছে, তাদের নৌবাহিনী ইয়েমেনের লোহিত সাগর তীরবর্তী হোদেইদাহ অঞ্চলে একটি সামরিক অভিযান চালিয়েছে।
এর জবাবে পাল্টা এক বিবৃতিতে হুথিরা দাবি করেছে, গোষ্ঠীটির যোদ্ধারা সৌদি আরবের বেশ কয়েকটি কৌশলগত স্থাপনায় হামলা চালিয়েছে। এসবের মধ্যে রয়েছে রিয়াদের কিং খালিদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর, রাবিঘে অবস্থিত সৌদির রাষ্ট্রায়ত্ত তেল কোম্পানি আরামকোর একটি শোধনাগার, আবহা আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর এবং খামিস মুশাইতের একটি সামরিক ঘাঁটি।
এই দাবির সত্যতা তাৎক্ষণিক যাচাই করা সম্ভব হয়নি। সৌদি আরবের সরকার বা আরামকো কর্তৃপক্ষ এ বিষয়ে তাৎক্ষণিক কোনো মন্তব্য করেনি।
হুথিরা সৌদি আকাশসীমায় চলাচলকারী যানের ওপর হামলার হুমকিও দিয়েছে।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যুদ্ধ শুরুর পর ইরান অবরোধ জারি করায় বন্ধ আছে আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাণিজ্যের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত বাণিজ্যিক জলপথ হরমুজ প্রণালি। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যুদ্ধের আগ পর্যন্ত বৈশ্বিক বাজারের ২০ শতাংশ জ্বালানিপণ্য এই পথ দিয়ে পরিবাহিত হতো।
বাব আল-মান্দেব প্রণালিও আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাণিজ্যের গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত বাণিজ্যিক জলপথ। হরমুজ প্রণালি বন্ধ থাকায় যুদ্ধের গত কয়েক মাসে ৫০ কিলোমিটার দীর্ঘ বাব আল-মান্দেব প্রণালির গুরুত্বও বেড়েছে।
গত ১১ সেপ্টেম্বর ইয়েমেনি সেনাবাহিনীকে পিছু হটতে বাধ্য করে বাব আল-মান্দেব প্রণালির মাঝখানে অবস্থিত ময়উন বা পেরিম দ্বীপ দখলের মধ্য দিয়ে কৌশলগত এ প্রণালির দখল নেয় হুথি বাহিনী।
তবে এই প্রণালিকে ঘিরে নতুন সংঘাত উদ্বেগ আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। কারণ, উপকূলীয় এলাকার নিয়ন্ত্রণ ইয়েমেনি সরকারের অবস্থান শক্তিশালী করতে পারলেও, হুথিরা এখনও তাদের নিয়ন্ত্রণে থাকা অন্যান্য এলাকা থেকে বাব আল-মান্দেব কিংবা লোহিত সাগরে চলাচলকারী জাহাজ লক্ষ্য করে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালাতে সক্ষম।
ইয়েমেনের তৃতীয় বৃহত্তম শহর তাইজের আশপাশেও সংঘাত তীব্র হয়েছে। সরকারি সামরিক সূত্র জানিয়েছে, হুথিরা একটি পাহাড়ি রাস্তার কিছু অংশ দখল করে নিয়েছে, যার ফলে শহরের ভেতরে থাকা সরকারি বাহিনী বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ার ঝুঁকিতে পড়েছে। তবে সরকারি অপর একটি সূত্র এই দাবিকে অস্বীকার করেছে।
সরকারি সূত্রে আরও জানা গেছে, হুথিরা তাইজ প্রদেশের কিছু অংশেও অগ্রসর হয়েছে এবং তাইজ-আদেন সড়কের একটি সেতু উড়িয়ে দিয়েছে। এতে প্রদেশের গুরুত্বপূর্ণ একটি সড়কে যোগাযোগব্যবস্থা বিঘ্নিত হচ্ছে। এসব পরস্পরবিরোধী তথ্যের সত্যতা অবশ্য নিরপেক্ষভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
আভা বিমানবন্দরে ব্যালিস্টিক মিসাইল ছুড়ল হুথিরা
সৌদি আরবের আসির প্রদেশের আভা বিমানবন্দরে ব্যালিস্টিক মিসাইল হামলা চালিয়েছে ইয়েমেনের হুথি বিদ্রোহীরা। গত কয়েক দিন ধরে সৌদির বিভিন্ন বেসামরিক অবকাঠামোকে টার্গেট করছে ইরান-সমর্থিত এ সশস্ত্র বাহিনী।
মঙ্গলবার হুথি সামরিক মুখপাত্র ইয়াহিয়া সারে এক্সে এক পোস্টে বলেছেন, ‘ব্যালিস্টিক মিসাইল হামলাটি ছিল নির্ভুল এবং সরাসরি। এতে বিমানবন্দরটিতে বিমান চলাচলে বিঘ্ন ঘটে এবং বিমানবন্দরটিও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।’
সৌদির আকাশ দিয়ে বিমান না চালাতে আন্তর্জাতিক বিমান সংস্থাগুলোকে আহ্বান জানিয়েছেন সারে। তিনি বলেছেন, ‘সৌদির আকাশসীমায় বিমান চালালে কী পরিণতি ভোগ করতে হবে আমরা আমাদের সেই সতর্কতা আবারও পুনর্ব্যক্ত করছি। তাদের আকাশসীমা এখন আমাদের সামরিক লক্ষ্যের বিষয়ে পরিণত হয়েছে।’
সৌদি আরব হুথিদের সর্বশেষ এ হামলা নিয়ে এখন পর্যন্ত কোনো মন্তব্য করেনি।
এর আগে সৌদির জাজান এবং নাজরানের বিমানবন্দরে হামলা চালায় হুথিরা। যেটির তথ্য নিশ্চিত করেছে রিয়াদ। হুথিদের হামলায় এ দুটি বিমানবন্দরের অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
সময়ের আলো/ইউএমএইচ