ব্রাজিলের নাম শুনলেই চোখে ভাসে ফুটবল, সাম্বা নাচ, আমাজন জঙ্গল কিংবা দৃষ্টিনন্দন সমুদ্রসৈকত। তবে এসব ছাপিয়ে দেশটির অলিগলিতে লুকিয়ে আছে এক ভিন্নধর্মী আধ্যাত্মিক আবহ। খ্রিস্টানপ্রধান এই দেশটিতে ইসলামের অবস্থান ও বিস্তার অনেকের কাছেই বিস্ময়ের মতো মনে হতে পারে। কিন্তু তথ্যের গভীরতায় ডুব দিলে দেখা যায়, ব্রাজিলে ইসলামের ইতিহাস যেমন প্রাচীন, বর্তমান সময়ে এর বিকাশ তেমনি সুসংহত ও সম্ভাবনাময়।
মুসলিম জনসংখ্যা ও বর্তমান চিত্র
২০২৬ সালের সরকারি আদমশুমারি (IBGE) এবং আন্তর্জাতিক গবেষণা সংস্থা 'ওয়ার্ল্ড পপুলেশন রিভিউ'-এর তথ্যমতে, ব্রাজিলে মুসলিম জনসংখ্যা প্রায় ৭ লক্ষ ৬৭ হাজার থেকে ১৫ লক্ষের মধ্যে। অনেক সময় সরকারি শুমারিতে ধর্ম পরিবর্তনের তথ্য দেরিতে হালনাগাদ হওয়ায় এই ব্যবধান দেখা দেয়। তবে বিভিন্ন ইসলামিক সেন্টারের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, প্রকৃত সংখ্যা প্রায় ১৫ লক্ষের কাছাকাছি, যা দেশটির মোট জনসংখ্যার প্রায় ০.৭০%।
ধর্মীয় অবকাঠামো : মসজিদ ও মুসাল্লা
ব্রাজিলে মুসলিমদের সামাজিক ও ধর্মীয় কর্মকাণ্ডের মূল প্রাণকেন্দ্র হলো মসজিদগুলো। বর্তমানে দেশটিতে সক্রিয় মসজিদের সংখ্যা প্রায় ১৫১টি। এর বাইরেও শতাধিক 'মুসাল্লা' বা সালাত কেন্দ্র এবং ইসলামিক কালচারাল সেন্টার রয়েছে। সাও পাওলো, পারানা এবং রিও ডি জেনিরোর মতো বড় বড় শহরগুলোতে এই ধর্মীয় কেন্দ্রগুলোর ঘনত্ব সবচেয়ে বেশি।
ইসলামের প্রসারের নেপথ্যে
ব্রাজিলে ইসলাম দ্রুত ছড়িয়ে পড়ার পেছনে মূলত দুটি কারণ কাজ করছে :
১. অভিবাসন : গত শতাব্দীতে সিরিয়া, লেবানন ও ফিলিস্তিন থেকে আসা আরব বংশোদ্ভূত মুসলিমরাই ব্রাজিলে ইসলামের শক্তিশালী ভিত্তি গড়ে তোলেন। সাম্প্রতিক সময়ে আফ্রিকা ও মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশ থেকেও মানুষ সেখানে আশ্রয় নিচ্ছেন।
২. স্থানীয়দের ধর্মান্তর : বর্তমান সময়ের সবচেয়ে চমকপ্রদ প্রবণতা হলো স্থানীয় ব্রাজিলীয়দের ইসলাম গ্রহণ। ইন্টারনেট ও সোশ্যাল মিডিয়ার কল্যাণে লাতিন সংস্কৃতির মানুষ ইসলামের প্রতি আকৃষ্ট হচ্ছেন। 'ফেডারেশন অব মুসলিম অ্যাসোসিয়েশনস ইন ব্রাজিল'-এর তথ্যমতে, গত এক দশকে স্থানীয়দের মধ্যে ইসলাম গ্রহণের হার বহুগুণ বেড়েছে এবং বর্তমানে প্রায় ১০ হাজারেরও বেশি স্থানীয় মুসলিম রয়েছেন।
ঐতিহ্যের প্রতীক কিছু বিখ্যাত মসজিদ
মেসকিতা ব্রাজিল (সাও পাওলো) : ১৯২৯ সালে প্রতিষ্ঠিত এটি সমগ্র দক্ষিণ আমেরিকার প্রথম এবং প্রাচীনতম মসজিদ। এটি ব্রাজিলে ইসলামি সংস্কৃতির সূতিকাগার হিসেবে পরিচিত।
ওমর ইবনুল খাত্তাব মসজিদ (ফজ দো ইগুয়াসু) : বিখ্যাত ইগুয়াসু জলপ্রপাতের শহরে অবস্থিত এই মসজিদটির স্থাপত্যশৈলী জেরুজালেমের আল-আকসা মসজিদের আদলে তৈরি। এটি পর্যটকদের অন্যতম প্রধান আকর্ষণ।
ইমাম আলী ইবনে আবি তালিব মসজিদ (কুরিতিবো) : ১৯৭২ সালে প্রতিষ্ঠিত এই মসজিদটি চমৎকার ক্যালিগ্রাফি ও গম্বুজের জন্য পরিচিত। এটি ওই অঞ্চলের মুসলিমদের ঐক্য ও সংস্কৃতির প্রতীক।
ব্রাসিলিয়া ইসলামিক সেন্টার মসজিদ : দেশটির রাজধানীতে অবস্থিত এই মসজিদটি রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক মহলে ইসলামের প্রতিনিধিত্ব করছে।
উজ্জ্বল সম্ভাবনার পথে ব্রাজিল
আজকের ব্রাজিলে ইসলাম আর কোনো বহিরাগত ধর্ম নয়, বরং দেশটির সংস্কৃতির অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে উঠছে। যদিও মুসলিমরা সেখানে সংখ্যালঘু, তবে তাদের ধর্মীয় স্বাধীনতা, হালাল খাদ্যের বিশাল বাজার এবং স্থানীয়দের ক্রমাগত ইসলামে দীক্ষিত হওয়ার হার প্রমাণ করে— ফুটবল আর উৎসবের এই দেশে ইসলামের ভবিষ্যৎ অত্যন্ত উজ্জ্বল।
সময়ের আলো/আআ