নানুবাড়ির স্মৃতি

ড. মোহাম্মদ আলী ওয়াক্কাস

সাহিত্য

মা, মাটি এবং মাতৃভূমি সবার ভালোবাসার ধন। সবাই চায় নিরাপদ অকৃত্রিম মায়ের মুখবদনের মাঝেই যাপিত জীবনের রস আস্বাদনের। এ জীবনে

2026-06-20T20:10:56+00:00
2026-06-20T20:10:56+00:00
 
  বুধবার, ২ সেপ্টেম্বর ২০২৬,
১৮ ভাদ্র ১৪৩৩
বুধবার, ২ সেপ্টেম্বর ২০২৬
সাহিত্য
নানুবাড়ির স্মৃতি
ড. মোহাম্মদ আলী ওয়াক্কাস
প্রকাশ: শনিবার, ২০ জুন, ২০২৬, ৮:১০ পিএম 
গ্রাফিক : সময়ের আলো
মা, মাটি এবং মাতৃভূমি সবার ভালোবাসার ধন। সবাই চায় নিরাপদ অকৃত্রিম মায়ের মুখবদনের মাঝেই যাপিত জীবনের রস আস্বাদনের। এ জীবনে মায়ের ত্যাগ, পরিশ্রম, আদর, স্নেহ শাসন কি অন্য কিছুর সঙ্গে কস্মিনকালেও তুলনীয়? মায়ের কারণেই সম্পর্ক তৈরি হয় মাতুতালয়ের সঙ্গে, যেখানটায় মায়ের দিকের স্বজনদের যত্নআত্তি নেকনজর এবং খাতির শৈশব মনে সুখানুভূতির জন্ম দেয়। কম-বেশি সবার জীবনেই এ আনন্দ ছেঁকে দেখার মওকা এসেছে। নানুবাড়ি যেন রসের হাঁড়ি! কী নেই? শৈশবের দুরন্তপনার অলিখিত অনুমোদন এবং সামান্য ফুরসত মন ও মননকে চাঙ্গা করার সঞ্জীবনী শক্তি নানুবাড়ির আঁতুড়ঘর। এ বাড়িকে ঘিরে রয়েছে আমার হরেক পদের স্মৃতি। যা জাবর কেটে সারাজীবন প্রেষিত হওয়ার সুযোগ রয়েছে। দলবেঁধে নানুবাড়ি যাওয়ার আনন্দই ছিল অন্যরকম। এখনকার প্রজন্মের কাছে রূপকথার মতো শোনাবে। আমার কালের প্রজন্ম কতই না ভাগ্যবান ছিল! সামাজিকীকরণের পরতে পরতে নানুবাড়ির আড্ডা, কিচ্ছা এবং স্মৃতির যে অনাবিল সুধা তা অনুভব করার মাঝেই আজকের আমি হয়ে ওঠার গল্প প্রোথিত। সামাজিকতা, মানবিকতা, জবাবদিহিতা, অতিথিপরায়ণতা, আন্তরিকতা, মানুষের পাশে দাঁড়ানোর হিম্মত এবং মানুষকে ভালোবাসার সবকে নানুর অবদান কি চাইলেই ভোলা যায়? স্মৃতির আঙিনায় অতীতের ফ্লাশব্যাক আমাকে নস্টলজিক করে ফেলে!

হবিগঞ্জের লাখাই উপজেলার কাটিহারার চৌধুরী বাড়ি হলো আমার নানাবাড়ি। যে গ্রামের সিংহভাগজুড়েই মায়ের নারীর টানের মানুষের বাস। পুরো গ্রামজুড়েই আমার নানুবাড়ি। প্রকৃতির নিবিড় শান্ত পরিবেশ জলডাঙ্গার মিশ্রণ বর্ষা এবং হেমন্তে মৌসুমের পরিবর্তন। ব্যবসায়িক সম্পর্কের সুবোধে রাজধানীর সঙ্গে সখ্যতা, সামাজিক বন্ধনের দৃঢ়তা, পারস্পরিক যোগসূত্র, আমরা মনোভাব, পঞ্চায়েতের যৌক্তিক অনুশাসন স্নেহ-ভালোবাসা শ্রদ্ধার মিশেল এবং ধর্মীয় আবহের উপস্থিতি গ্রামকে আলগা করে চেনার সুযোগ করে দিয়েছে। সাধারণত বর্ষা এবং শীতে নানুবাড়ি যাওয়ার সুযোগ আসত। সেই সময়ে বিদ্যুৎ ছিল না। কেরোসিনের হারিকেনের আলোতে গল্প আর আড্ডায় গভীর রাত অবধি জেগে থাকার মাঝেই নতুন চিন্তার উন্মেষ ঘটত। যা কি চাইলেই অস্বীকার করা যায়? তৎকালীন সময়ে যোগাযোগ অবস্থা ছিল তথৈব! বর্ষায় নৌকা ভ্রমণের মাঝেই মূলত মজা বেশি লাগত। আর হেমন্ত ও শীতে পায়ে হেঁটে দিগন্ত পাড়ি দেওয়ার স্মৃতি এখনও নয়ন কোণে দৃশ্যমান। নানুবাড়ির যাপিত জীবন যেন কল্পকাহিনিকেও হার মানায়!

Advertisement
বছরে দুটো সময় আমরা অপেক্ষার প্রহর গুনতাম। কখন সেই মাহেন্দ্রক্ষণ আসবে? কখন ছুটি পাব? বাঁধহীন আনন্দে মেতে উঠে নিজেকে মেলে ধরব। অবশেষে কাক্সিক্ষত সময়ের উপস্থিতিতে আনন্দাশ্রু চলে আসত। শীতে বা হেমন্তে নানাবাড়ি যাওয়া ছিল অনেকটা রাজ্য বিজয়ের মতো। যেখানে পায়ে হেঁটে যাতায়াতই ছিল একমাত্র অবলম্বন। আম্মা পালকি চড়ে যেতেন এবং পিছু সামনে আমরা ছুটতাম। অনেকটা রবিঠাকুরের বীরপুরুষ কবিতার সেনানীর মতো। যাত্রার দিনকয়েক আগেই ছোটমামা নেওয়ার জন্য চলে আসতেন এবং নানু স্বাদের খাবার তৈরি করে পথপানে চেয়ে থাকতেন। পাশের উপজেলার কয়েক কিলো রাস্তা পাড়ি দিতে ঘণ্টাতিনেক সময় লাগত! এ সময়ে বিকল্প বাহন হিসেবে আমরা মামার কোলে কাঁধে উঠতাম। সেই মামা আজ আর দুনিয়াতে নেই। আঁকাবাঁকা মেঠোপথ, সবুজের সমারোহ ডাল, গম, ধান, তিল, তিসি এবং সর্ষের ক্ষেত মাড়িয়ে এগিয়ে চলা। পথে রাখালের গলার তৃপ্তির গান এবং গোপাটে গরুপাল দেখে মন ভরে যেত। 

দিগন্তে সূর্যাস্তের দৃশ্য এবং আকাশে রংধনু ছিল দেখার মতো। নানুবাড়িতে পৌঁছেই রাজ্যের দুষ্টুমি, দুদণ্ড বিশ্রামে অনাগ্রহ। নানুর হাতের জাদুকরী খাবার খেয়েই বেরিয়ে যাওয়া। সবাই প্রিয়জন পুরো গ্রামে নিরাপত্তার চাদর। জ্যোৎস্না রাতের আড্ডা, নানুর শিক্ষামূলক গল্প, মসজিদের ঘাটে সাঁতার, খেলাধুলা, মামার সঙ্গে বাজার এবং ধানক্ষেত দেখতে যাওয়ার স্মৃতিপটে জলমল করে। এলাকার মানুষজন আমাদের বেশ স্নেহ ও আদর করতেন। বিভিন্ন কারণে আব্বার সঙ্গে সবার যোগাযোগ ভালো ছিল। ঢাকা থেকে আমাদের বাড়ি পর্যন্ত রাস্তা বেশ ভালো ছিল। অনেকের দূর থেকে ফিরতে রাত হয়ে গেলে গরিবের সরাইখানায় আতিথেয়তা গ্রহণ করে ভোরে গন্তব্যে যাত্রা করত। এখানটায় আত্মীয়-অনাত্মীয় সবার সরব উপস্থিতি ছিল লক্ষণীয়। নানুর এলাকার লোকজনের কাছে এ কারণটাও আলগা অনুভূতি জাগাত। গ্রামের মাদরাসার বার্ষিক মাহফিলকে ঘিরে মানুষের মাঝে উৎসবের আমেজ সৃষ্টি হতো। যা আমরাও উপভোগ করতাম।

বর্ষায় নানুবাড়ি যাওয়ার স্মৃতি আজও মনে পড়ে। ইঞ্জিনবিহীন পালতোলা নৌকা ভাড়া করে যাওয়া এবং এর পাটাতন গলুই ছাদে হইচইয়ের মজাই ছিল অন্যরকম। মাঝির দাঁড় টানার শব্দ এবং ভাটিয়ালি গানের সুরের মূর্ছনায় বিমোহিত হতাম। বর্ষার নতুন পানি, আকাশের  নীলাভ দৃশ্য, নানা পদের নৌকা এবং মাছ ধরার জালের উপস্থিতি দেখে ভালো লাগত। যাওয়া-আসার সময় শাপলা শালুক, কলমি-কেওড়ালি টেনে তুলতাম। আমন এবং জলি ধানের বেড়ে ওঠার চিত্রপট এখনও মনে হয়। পাট ক্ষেতের মিতালি এবং মাঝেমধ্যে প্রকৃতির বৈরী আবহাওয়ার মুখোমুখি এ যেন বেশ রোমাঞ্চকর ছিল।

নানুবাড়িতে পৌঁছেই দৌড় এবং খেলাধুলা। নানুর হাতের পাটশাক, শিমের বিচি দিয়ে মাগুর মাছ এবং পালিত দেশি মুরগি ভুনার স্বাদ এখনও মুখে লেগে আছে। সকালের নাশতায় চিতই পিঠা এবং চিটারুটির সঙ্গে হাঁস ভুনা কি চাইলেই ভোলা যায়? নানুবাড়ি থেকে আসতে মন চাইত না। বর্ষায় বাহনের সুযোগে নানা কিসিমের জিনিসপত্র সঙ্গে  দিয়ে দিতেন। তাতে কি ছিল না? ডাব-নারকেল থেকে শুরু করে ডাল, শিমের বিচি, দেশি হাঁস-মুরগি সবই, এ যেন মায়ার ভান্ডার। এসব খেতে গিয়েও নানুর কথা মনে পড়ত। এখনটায় শাহ আব্দুল করিমের গানের দুটো কলি মনে পড়ে গেল

মাইর লগে যে নাইওর যাইতাম
নয়া কাপড় ফিন্দা আইতাম
ধান চাউল আনতাম কইলা ভরি।
ভুলতে না পারি,
ফুরু থাকতে যাইতাম নানারবাড়ি।

আজ এসব অতীত। রাস্তাঘাটের প্রভূত উন্নতি হয়েছে। মিনিট তিরিশেকের মাঝেই নানুর ভিটায় যাওয়া যায়। এখন কেন যেন সময় করতে পারি না? নানু-নানা, মামা-খালারা পৃথিবীর সফর শেষ করেছেন। আজ আমরা তাদের রেখে যাওয়া পদচিহ্ন থেকে যোজন যোজন দূরে। জাগতিক ব্যস্ততা, বাস্তবতা এবং ইট-পাথরের মোহ আমাদের নির্জীব প্রাণীতে রূপান্তর করছে। অথচ নানুবাড়িকে ঘিরেই রয়েছে নানা মধুর স্মৃতি।

আমাদের সন্তানদের আজ খেলার সাথি নেই। প্রতিবেশীর মাঝে আন্তরিকতার ঘাটতি। আভিজাত্য, দম্ভ, চাকচিক্য এবং  আলগা ফুটানিতে সমাজ বিষাক্ত। কোমলমতিরা আজ ইনকিউবেটরে। শিশুরা বেড়ে উঠছে ইট-পাথরের বন্দি জীবনের দেয়ালে। মানবতাবোধ, সামাজিকতার এবং আন্তরিকতার স্বাদ তারা কীভাবে পাবে? মানবিক সমাজ বিনির্মাণে এসবের বড্ড প্রয়োজন!
  বিষয়:   নানুবাড়ির স্মৃতি  ড. মোহাম্মদ আলী ওয়াক্কাস 


Loading...
Loading...
সাহিত্য- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
Advertisement
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: