বিশ্বকাপ ফাইনালে ফুটবলের যে চার কিংবদন্তিকে হারিয়েছে জার্মানি

ক্রীড়া ডেস্ক

খেলা

বিশ্বকাপ ইতিহাসে জার্মানি চারবার চ্যাম্পিয়ন হয়েছে। আরও বিস্ময়কর বিষয় হলো, তাদের চারটি শিরোপার প্রতিটিই এসেছে ফুটবল ইতিহাসের একেকজন মহাতারকাকে ফাইনালে

2026-06-20T23:53:27+00:00
2026-06-20T23:53:27+00:00
 
  রবিবার, ৯ আগস্ট ২০২৬,
২৫ শ্রাবণ ১৪৩৩
রবিবার, ৯ আগস্ট ২০২৬
খেলা
বিশ্বকাপ ফাইনালে ফুটবলের যে চার কিংবদন্তিকে হারিয়েছে জার্মানি
ক্রীড়া ডেস্ক
প্রকাশ: শনিবার, ২০ জুন, ২০২৬, ১১:৫৩ পিএম 
২০১৪ বিশ্বকাপ ফাইনালে আর্জেন্টিনাকে হারানোর পর ট্রফি নিয়ে উল্লাস করছে জার্মানি ফুটবল দল। ছবি : সংগৃহীত
বিশ্বকাপ ইতিহাসে জার্মানি চারবার চ্যাম্পিয়ন হয়েছে। আরও বিস্ময়কর বিষয় হলো, তাদের চারটি শিরোপার প্রতিটিই এসেছে ফুটবল ইতিহাসের একেকজন মহাতারকাকে ফাইনালে পরাজিত করার মাধ্যমে। সেই তালিকায় রয়েছেন ফেরেঙ্ক পুসকাস, ইয়োহান ক্রুইফ, ম্যারাডোনা ও মেসির মতো কিংবদন্তিরা।

১৯৯০ বিশ্বকাপ ফাইনালে পশ্চিম জার্মানির কাছে ১-০ গোলে হেরে কান্নায় ভেঙে পড়া আর্জেন্টাইন অধিনায়ক দিয়েগো ম্যারাডোনার ছবি আজও ফুটবলপ্রেমীদের আবেগতাড়িত করে। একইভাবে ২০১৪ বিশ্বকাপ ফাইনালে জার্মানির কাছে অতিরিক্ত সময়ে ১-০ গোলে পরাজয়ের পর বিশ্বকাপ ট্রফির দিকে বিষণ্ন দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকা লিওনেল মেসির ছবিও আর্জেন্টিনা সমর্থকদের হৃদয়ে গভীর বেদনার স্মৃতি হয়ে আছে।

পুসকাস : ১৯৫০-এর দশকের দুর্ধর্ষ হাঙ্গেরি দল ‘মাইটি মাগইয়ার্স’-এর নেতা ছিলেন তিনি। এই দল শুধু ফুটবল খেলত না, যেন মাঠে তৈরি করত এক ধরনের বিজ্ঞান। তাদের খেলার মধ্যে ছিল নিখুঁত পরিকল্পনা, অসাধারণ ছন্দ এবং অনন্য সমন্বয়। সেই দলের নেতৃত্বে থাকা পুসকাস ছিলেন ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম সেরা প্রতিভা। ছোটখাটো গড়ন, গোলাকার মুখ আর অবিশ্বাস্য বাঁ পা— তার প্রতিটি শট ও পাস ছিল যেন শিল্পকর্মের মতো নিখুঁত।

তার নেতৃত্বে হাঙ্গেরি পরিণত হয়েছিল এক অপ্রতিরোধ্য শক্তিতে। চার বছরে একটি ম্যাচও হারেনি তারা। ৩২ ম্যাচ অপরাজিত থেকে ১৯৫৪ বিশ্বকাপে এসেছিল দলটি। এর এক বছর আগে লন্ডনের ওয়েম্বলিতে ইংল্যান্ডকে ৬-৩ গোলে হারিয়ে তারা বিশ্বকে চমকে দেয়। যে ইংল্যান্ড নিজেদের মাঠে প্রায় ৯০ বছর কোনো বিদেশি দলের কাছে হারেনি, সেই গর্ব মাত্র ৯০ মিনিটেই ভেঙে দিয়েছিল হাঙ্গেরি। ম্যাচটি ইতিহাসে পরিচিত হয়ে যায় ‘ম্যাচ অব দ্য সেঞ্চুরি’ নামে।

তাই ১৯৫৪ বিশ্বকাপে হাঙ্গেরিকেই শিরোপার প্রধান দাবিদার ধরা হচ্ছিল। গ্রুপ পর্বে তারা দক্ষিণ কোরিয়াকে ৯-০ এবং তৎকালীন পশ্চিম জার্মানিকে ৮-৩ গোলে উড়িয়ে দিয়েছিল। কিন্তু ফাইনালে পুসকাসকে নিয়েও হাঙ্গেরি পশ্চিম জার্মানির কাছে ৩-২ গোলে হেরে যায়। ‘মিরাকল অব বার্ন’ নামে পরিচিত সেই ম্যাচ পুসকাসকে বিশ্বকাপ থেকে বঞ্চিত করলেও তার কিংবদন্তি মর্যাদাকে ম্লান করতে পারেনি।

ক্রুইফ : যাকে অনেকেই আধুনিক ফুটবলের জনক বলে থাকেন। ‘টোটাল ফুটবল’-এর রূপকার ক্রুইফ ১৯৭৪ বিশ্বকাপে নেদারল্যান্ডসকে ফাইনালে তুলেছিলেন। কিন্তু সেখানেও প্রতিপক্ষ ছিল পশ্চিম জার্মানি। ফাইনালে ২-১ গোলে হেরে বিশ্বকাপ অধরাই থেকে যায় তার।

বিশ্বকাপ না জিতলেও আয়াক্স আমস্টারডামের হয়ে টানা তিনটি ইউরোপিয়ান কাপ, তিনটি ব্যালন ডি’অর এবং পরবর্তীতে বার্সেলোনাকে নতুন ফুটবল দর্শন উপহার দিয়ে তিনি কিংবদন্তির আসনে অধিষ্ঠিত হন। আজকের ফুটবল বিশ্বের অন্যতম সফল কোচ পেপ গার্দিওলার দর্শনের শিকড়ও অনেকাংশে ক্রুইফের চিন্তাধারায় নিহিত।

ম্যারাডোনা : ১৯৮৬ সালে বিশ্বকাপ জয় করেছিলেন ম্যারাডোনা। ইংল্যান্ডের বিপক্ষে ‘হ্যান্ড অব গড’ এবং ‘গোল অব দ্য সেঞ্চুরি’র মাধ্যমে তিনি নিজেকে ইতিহাসের অন্যতম সেরা ফুটবলার হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেন। তবে ম্যারাডোনার মহত্ত্বকে শুধু গোল বা পরিসংখ্যান দিয়ে ব্যাখ্যা করা যায় না।

বিশ্বকাপের চার বছর আগে ১৯৮২ সালে, আর্জেন্টিনা ও ইংল্যান্ডের মধ্যে হয়েছিল ফকল্যান্ড যুদ্ধ। আর্জেন্টিনার ভাষায় মালভিনাস নামে পরিচিত সেই দ্বীপপুঞ্জ দেশটির ইতিহাসে এক গভীর ক্ষতের প্রতীক। যুদ্ধে নিহত ৬৪৯ আর্জেন্টাইনের অনেকেই ছিলেন ১৮-১৯ বছরের তরুণ। বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনালে ইংল্যান্ডের মুখোমুখি হওয়ার আগে ম্যারাডোনা বলেছিলেন, তার মাথায় তখন ঘুরছিল সেই মালভিনাসের ছেলেদের কথাই।

ফকল্যান্ড যুদ্ধের মাত্র চার বছর পর ইংল্যান্ডের বিপক্ষে সেই ম্যাচটি আর্জেন্টিনার জন্য ছিল আবেগ, জাতীয় গর্ব এবং প্রতিশোধের প্রতীক। আর সেই বিশ্বকাপে প্রায় একক নেতৃত্বে দলকে শিরোপা জিতিয়ে ম্যারাডোনা পরিণত হন ফুটবল ইতিহাসের এক অমর কিংবদন্তিতে।

শুধু জাতীয় দলের জার্সিতেই নয়, ক্লাব ফুটবলেও তার প্রভাব ছিল অসাধারণ। ইতালির তুলনামূলক ছোট ক্লাব নাপোলিকে তিনি প্রথমবারের মতো সিরি আ জিতিয়েছিলেন। উত্তর ইতালির শক্তিশালী ক্লাবগুলোর আধিপত্য ভেঙে নাপোলিকে শীর্ষে তোলা ছিল ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম বড় রূপকথা।

নাপোলিতে তখন ম্যারাডোনা শুধু একজন ফুটবলার ছিলেন না, ছিলেন মানুষের বিশ্বাসের প্রতীক। দেয়ালে দেয়ালে তার ছবি, যিশুর পাশে ম্যারাডোনা, নবজাতকের নাম রাখা হতো দিয়েগো। ১৯৯০ বিশ্বকাপের সেমিফাইনালে আর্জেন্টিনার প্রতিপক্ষ হলো ইতালি, আর ম্যাচের ভেন্যু— নাপোলি। পুরো ইতালি চেয়েছিল নিজেদের জয়, কিন্তু নাপোলির মানুষ পড়ে গেল দ্বিধায়। কারণ তাদের নায়ক এবার যে দেশের বিপক্ষেই খেলছেন! শেষ পর্যন্ত পেনাল্টি শুটআউটে আর্জেন্টিনা জিতে যায়।


তবে শেষপর্যন্ত ১৯৯০ বিশ্বকাপ ফাইনালে আবারও পশ্চিম জার্মানির মুখোমুখি হয়ে ১-০ গোলে হেরে যান ম্যারাডোনা। সেই পরাজয়ের পর কান্নারত ম্যারাডোনার ছবি আজও ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম আবেগঘন মুহূর্ত হিসেবে স্মরণ করা হয়।

মেসি : ২০১৪ বিশ্বকাপে দুর্দান্ত পারফরম্যান্স করে আর্জেন্টিনাকে ফাইনালে তুলেছিলেন মেসি। কিন্তু অতিরিক্ত সময়ে মারিও গোটজের লক্ষ্যভেদে জার্মানির কাছে ১-০ ব্যবধানে হেরে তার বিশ্বকাপ স্বপ্ন ভেঙে যায়। ম্যাচ শেষে বিশ্বকাপ ট্রফির দিকে তাকিয়ে থাকা মেসির সেই ছবি আজও কোটি সমর্থকের হৃদয়ে বেদনার স্মৃতি হয়ে আছে।

তবে সেই গল্পের সমাপ্তি হয়নি সেখানে। আট বছর পর ২০২২ সালে, মেসি অবশেষে বিশ্বকাপ জিতে নিজের ক্যারিয়ারকে পূর্ণতা দেন। আটটি ব্যালন ডি’অর, ৪৬টি দলীয় শিরোপা এবং দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে সর্বোচ্চ পর্যায়ে ধারাবাহিক পারফরম্যান্স তাকে সর্বকালের সেরাদের আলোচনায় স্থায়ীভাবে প্রতিষ্ঠিত করেছে। চলমান বিশ্বকাপের আলজেরিয়া ম্যাচ পর্যন্ত তার ঝলমলে ক্যারিয়ারে রয়েছে ৯০৯ গোল ও ৪১১ অ্যাসিস্ট মিলিয়ে মোট ১ হাজার ৩২০ গোলে অবদান।

তাই ২০২৬ আলজেরিয়ার বিপক্ষে মেসি হ্যাটট্রিক করার পর ব্রাজিলের কিংবদন্তি ফুটবলার রোনালদো নাজারিও বলেছিলেন, ‘এখন সময় এসেছে মেসিকে ফুটবল ইতিহাসের সর্বকালের সেরা খেলোয়াড় হিসেবে মেনে নেওয়ার। বিশ্বকে আর এই সত্য এড়িয়ে যাওয়া উচিত নয়।‘

সময়ের আলো/জেডআই


  বিষয়:   ফুটবল  বিশ্বকাপ 


Loading...
Loading...
খেলা- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: