বিশ্বকাপের ইতিহাসের সবচেয়ে ছোট দেশ কুরাসাও। নেদারল্যান্ডস রাজ্যের অধীন একটি স্বায়ত্তশাসিত দেশ। প্রথমবার বিশ্বকাপ খেলতে এসে যেন পুরো বিশ্বকে চমকে দিয়েছে দক্ষিণ ক্যারিবিয়ান সাগরের দ্বীপ রাষ্ট্রটি। গোলরক্ষক এলয় রুমের নৈপুণ্যে ইকুয়েডরকে রুখে দিয়েছে দলটি।
ম্যাচের মাত্র দুই মিনিটেই নিজের জাত চেনালেন কুরাসাও গোলরক্ষক এলয় রুম। একদম কাছ থেকে ইকুয়েডর ফরোয়ার্ড এনার ভ্যালেন্সিয়ার বুলেট গতির শট রুখে দিয়ে চলতি বিশ্বকাপের অন্যতম সেরা এক সেভ করলেন তিনি। যা শেষ পর্যন্ত তাকে এনে দিল ক্যারিয়ার-সেরা এক পারফরম্যান্স এবং কুরাসাওকে ভাসাল রূপকথার ইতিহাসে।
বাংলাদেশ সময় রোববার (২১ জুুন) সকালে 'ই' গ্রুপের ম্যাচে ইকুয়েডরের বিরুদ্ধে গোলশূন্য ড্র করে মাঠ ছাড়ে কুরাসাও। আর এই ম্যাচে অবিশ্বাস্য ১৫টি সেভ করেন রুম। বিশ্বকাপের ইতিহাসে নির্ধারিত ৯০ মিনিটের ম্যাচে এটাই কোনো গোলরক্ষকের সর্বোচ্চ সেভের রেকর্ড। প্রায় এক লাখ ৫৬ হাজার জনসংখ্যার ছোট্ট দ্বীপরাষ্ট্র কুরাসাও বিশ্বকাপের ইতিহাসে সবচেয়ে ছোট দেশ। আর তাদেরই কি না বিশ্বকাপের প্রথম পয়েন্ট এনে দেওয়ার নায়ক বনে গেলেন রুম।
দলের সবচেয়ে বয়স্ক খেলোয়াড় রুম এদিন ইকুয়েডরের একের পর এক আক্রমণ একাই প্রতিহত করেছেন। যার মধ্যে ৪১ মিনিটে জন ইয়েবোয়াহর ১৮ মিটার দূর থেকে নেওয়া জোরালো শট কিংবা দ্বিতীয়ার্ধে ভ্যালেন্সিয়ার দুর্দান্ত হেডার— সবই মুখ থুবড়ে পড়েছে রুমের বিশ্বস্ত গ্লাভসে।
বিশ্বকাপের ইতিহাসে এক ম্যাচে এর চেয়ে বেশি সেভের রেকর্ড আছে কেবল যুক্তরাষ্ট্রের টিম হাওয়ার্ডের। ২০১৪ সালের বিশ্বকাপে বেলজিয়ামের বিপক্ষে শেষ ষোলোর ম্যাচে অতিরিক্ত সময়ে গড়ানো খেলায় ১৬টি সেভ করেছিলেন তিনি।
ম্যাচ শেষে সাংবাদিকদের রুম রসিকতা করে বলেন, খেলার সময় এসব রেকর্ড নিয়ে ভাবিনি। তবে টিম হাওয়ার্ডের রেকর্ডটা ছুঁতে না পারায় একটু আফসোস তো হচ্ছেই। অবশ্য এই ফলাফলকে দলগত প্রচেষ্টার ফসল হিসেবেই দেখছেন তিনি। অন্যদিকে প্রতিপক্ষ ইকুয়েডরের গোলরক্ষক হেরনান গালিন্দেজ অকপটে স্বীকার করেছেন, রুম আজ জীবনের সেরা ম্যাচটি খেলেছেন।
কুরাসাও গোলরক্ষকের জন্য ইতিহাস গড়া অবশ্য নতুন কিছু নয়। ২০১৯ সালে গোল্ডকাপে হন্ডুরাসের বিপক্ষে দেশের প্রথম জয়ের ম্যাচেও ডজনের বেশি সেভ করেছিলেন রুম। তবে ফুটবল বিশ্বের সবচেয়ে বড় মঞ্চে এমন পারফরম্যান্স তার দেশের জন্য যেমন ঐতিহাসিক, তেমনি তার ব্যক্তিগত স্বপ্নেরও এক চূড়ান্ত প্রাপ্তি।
নেদারল্যান্ডসে জন্ম নেওয়া রুম চলতি বছরের শুরুতে ফিফাকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, ছোটবেলা থেকেই তার স্বপ্ন ছিল কুরাসাওয়ের হয়ে বিশ্বকাপে খেলা। বাবার সূত্রে কুরাসাওয়ের নাগরিকত্ব পাওয়া রুম ছোটবেলায় সেখানে ছুটি কাটাতে যেতেন। ২০১৫ সালে কুরাসাওয়ের তৎকালীন কোচ ও সাবেক ডাচ কিংবদন্তি প্যাট্রিক ক্লুইভার্টের ডাকে সাড়া দিয়ে জাতীয় দলে যোগ দেন তিনি।
রুমের এই অতিমানবীয় পারফরম্যান্সের ঢেউ লেগেছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও। ম্যাচের আগে যেখানে ইনস্টাগ্রামে তার অনুসারী সংখ্যা ছিল এক লাখের কম, ম্যাচের পর তা লাফিয়ে পৌঁছে গেছে প্রায় ৭ লাখের ঘরে। ঠিক এমনটাই ঘটেছিল কেপ ভার্দের ভোজিনহার ক্ষেত্রেও।
জার্মানি সীমান্তের কাছাকাছি জন্ম নেওয়া ৬ ফুট ৩ ইঞ্চি উচ্চতার এই গোলরক্ষক বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের ইউএসএল চ্যাম্পিয়নশিপের দল মায়ামি এফসিতে খেলছেন। তবে ক্যারিয়ারের সিংহভাগ সময় কাটিয়েছেন ডাচ ক্লাব ভিতেসে-তে। এছাড়া খেলছেন এমএলএসের কলম্বাস ক্রু এবং ডাচ লিগের পিএসভি আইন্দহোভেনের হয়ে।
নেদারল্যান্ডস রাজ্যের অধীন স্বায়ত্তশাসিত দেশ হওয়ায় তাদের ম্যাচ দেখতে গ্যালারিতে হাজির হয়েছিলেন নেদারল্যান্ডসের রাজা উইলেম-আলেকজান্ডার এবং রানি মাক্সিমা। তবে ম্যাচ শেষে কুরাসাওয়ের মানুষের কাছে রুম নিজেই বনে গেছেন 'রাজা'।
রুম জানান, ম্যাচ শেষে ডাচ রাজপরিবারের সদস্যরা ড্রেসিংরুমে এসে দলের সঙ্গে নেচে-গেয়ে উদযাপন করেছেন, এমনকি রানি স্বয়ং তাকে জড়িয়ে ধরে চুমু খেয়েছেন।
সূত্র : রয়টার্স
সময়ের আলো/আআ