বাড়ির সামনে পদ্মা নদী। অথই জলের ঢেউ ছুঁয়ে আসা বাতাস লাগে গায়ে, মন কেমন করে ওঠে। যে বাবা মিশে গেছে প্রকৃতির উদার জমিনে, নদী তার কথা কানেকানে বলে যায়, হাওয়ায় ভেসে বেড়ায় পরিচিত গন্ধ। মনে হয়, বাবা এভাবেই থেকে যাক, শহরে, বন্দরে, নদীতে, নৈঃশব্দ্যের কোলাহলে। শহরতলী জুড়ে বাবাকে নিয়েই গল্প হোক!
আমার বাবা, জনমদুখী বাবা। অভাবের সংসারে প্রকৃতি যাকে জন্ম দিয়েছিল কেবল টিকে থাকার লড়াই করতে, একটা গোটা জীবন জোড়াতালি দিয়ে চালাতে। ভালো থাকা ব্যপারটাই কোনোদিন স্থান পায়নি সেই অভিধানে। বাবা মেনে নিয়েছে সবটাই। বাবাদের বোধহয় 'মেনে নেওয়ার বিনয়টুকু ছাড়া আর কিছুই থাকে না।'
গৃহস্থ পরিবারে বেড়ে ওঠা বাবার জন্মাবধি ছিলো মাটির সঙ্গে সম্পর্ক। বাবা খুব জানতো, কোন মাটিতে কোন গাছ ভালো জন্মে, কোন মৌসুমে কোন ধান চাষ করতে হয়, বৃষ্টির আভাস পেলে কোন বীজ নিয়ে দৌড়ে মাঠে যেতে হয় কিংবা এ বছর বন্যায় কতটুকু জনপদ ভাঙতে পারে সেই হিসেব। আমার বাবা কবিতা লিখতো। সেই কবিতাগুলো লাঙলের সুতীক্ষ্ণ ফলায় মাটির দলার মতো টুকরো টুকরো হয়ে গেছে রোজ। বাবা কবিতা ছেড়ে এত দূরে চলে এসেছিল যে, সে কথা আমাদের পারিবারিক পরিসরে নতুন করে জানাজানি হয়েছিল বছর ২৫ পর। সংসারের জোয়াল টানতে গিয়ে কবিতায় টান পড়েছিল কারও, এ কথা আবার বলার মতো কোনো ঘটনা হলো নাকি! শুধু আমি অনুভব করেছিলাম, বাবার বুকের ভেতরের ছাতিম গাছটা কত কতবার মরে গেছে!
নুন আনতে পান্তা ফুরোবার জীবনে বাবা নিত্য গ্রাম থেকে শহরে হেঁটে যাওয়া আসা করতো পড়াশোনার জন্য। সেই পথের দূরত্ব ছিলো দ্বৈতভাবে ৪৪ কিলোমিটার। মাঝখানে চার আনা দিয়ে কিছুটা নদী পথ পেরোনো। ছোট্ট একটা ঘরে ৫ ভাইবোন একসঙ্গে পড়াশোনা করতে হতো। একটামাত্র কাঠের টেবিল ছিলো সেই ঘরের বিলাসী উপকরণ। কে পড়বে টেবিলে? সবাই ওই চারকোণা বস্তুটাকে নিজের অনুষঙ্গ করতে চাইতো। বাবা ছিলো সবার বড়। তাই কোনোকিছু ছেড়ে দেওয়ার প্রশ্ন আসলে, বাবাকেই বিনাবাক্য ব্যয়ে মেনে নিতে হতো সব। ছাড়তে ছাড়তে কখন যে আমার গতভাগা বাবা নিজেকেই ছাড়িয়ে গেছে, সে হিসেব করার ফুরসতও জীবন তাকে দেয়নি কোনোদিন।
বাবা স্বপ্ন ছেড়ে স্বপ্ন কিনতে চেয়েছে, কাছের মানুষদের উল্লাসের সীমাহীন সীমারেখায় শহুরে আইল্যান্ডের মতো সবুজ গাছটা হতে চেয়েছে। কিন্তু শেষমেশ সেই বিচরণ ক্ষেত্রে সে বারবার নিজেকে অপাঙ্কতেয় হিসেবে আবিষ্কার করেছে। তবুও বাবা অচীন বৃক্ষের মতো নির্ভার থেকেছে, গভীর নদীর মতো শান্ত থেকেছে। বুদ্ধের মতো এমন অতল নীরবতা বাবা কোথায় পেয়েছিল, তা জানার সুযোগ হয়নি কখনও।
বাবা ভেবেছিল, একদিন জীবন বদলাবে। ছোট ভাইবোনদের পড়াশোনা করিয়ে, বিয়ে দিয়ে খানিকটা আয়েশ করে বসবে জীবনের জলচৌকিতে। কিন্তু সুদিন চিরকাল অধরা থেকে গেছে। জীবনের দুর্বিপাকে ঘূর্ণি খেতে খেতে যখন একটু থামার সময় ঘনিয়ে এসেছিল, একটা দুর্ঘটনা বাবাকে একদম থামিয়েই দিলো। শুরু হলো গৃহবন্দী জীবন, দিনমান এক বিছানায় শুয়ে থাকতে থাকতে বেঁচে থাকার আগ্রহ হারিয়ে ফেলা, অন্যের বোঝা হয়ে ওঠার এক অসহ্য নিঃসীম সময়। তবুও তিনি বেঁচে থাকলেন, সন্তানদের সঙ্গে আরও কিছুদিন যাপন করার নির্লোভ লোভে। শরীর মন ক্ষয়ে যেতে যেতে আয়ু যখন শামিয়ানা গুটিয়ে নিতে শুরু করেছে, তখন বাবা হাসপাতালে। দুঃসহ কতগুলো রাত্রি-দিন পেরোলো। ডাক্তার সাহেব বললেন, বাবা হারানোর মানসিক প্রস্তুতি নিতে। জীবনে কতকিছুর জন্য শরীর, মনকে প্রস্তুত করেছি, বাবার বেলায় তা আর পারলাম না। কোনো সন্তানই বোধহয় পারে না। একটা সময় মনে হতো, মা-বাবা না থাকলে মানুষ আবার কেমন করে বাঁচে? অথচ, আমিও কীভাবে কীভাবে যেন বাবাকে ছাড়া অনেকগুলো বছর বেঁচে আছি।
সেদিন ছিলো কার্তিকের সন্ধ্যা। বাবার স্মৃতিঘেরা গাঁয়ে তখন শীতের বুড়ি একটু একটু করে আঁচল মেলে দিয়েছে। শহরেও হালকা আভা এসে লাগে গায়ে। আমার সেই জন্মমাসে বাবা দুনিয়ার পাততাড়ি গুটিয়ে চলে গেল। হারিয়ে গেল কালের থই থই অন্ধকারে। পায়ের তলার মাটি কেমন করে সরে যায়, কেমন করে মানুষ শূন্যে ভাসে, আকাশটা ভেঙে গেলে কতখানি রোদ এসে লাগে গায়ে, অনুভূতিহীন এক আশ্চর্য অনুভবে সবই টের পেয়েছিলাম সেদিন!
বাবা আজ কোথাও নেই, কিংবা চলে গিয়ে আরও ঢের বেশি আছে। এখনও গাঁয়ের মাটিতে পা রাখলে মানুষের গল্পে বাবা ফিরে আসে বারবার, ফিরে আসে বাবাহীন কন্যা জীবনের হাজারটা প্রতিবন্ধকতায়, ফিরে আসে বাবার শেখানো নিত্য জীবন দর্শনে। কখনও মনে হয়, বাবার উপস্থিতি থাকুক আমার সমস্ত নৈঃশব্দ্য জুড়ে, আবার কখনও মনে হয়- 'শহরতলী জুড়ে গলির মোড়ে মোড়ে বাবাকে নিয়েই গল্প হোক'। বাবা বেঁচে থাকুক পদ্মার অথই পারাবারে, কোলাহলে, গল্পে কিংবা স্বীকৃতি না পাওয়া সমস্ত কবিতায়!
সময়ের আলো/মহু