ঝালকাঠি সদর উপজেলার বেরপাশা গ্রামের গ্যারেজ মালিক মো. বেল্লাল হোসেন। ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা ও ইজিবাইক রাখার জন্য তিনি একটি বাণিজ্যিক বৈদ্যুতিক মিটার নিয়েছেন। তবে নামে বাণিজ্যিক মিটার হলেও, সেটি কেবল লোক-দেখানো ‘শো-পিস’ হিসেবেই ঝুলিয়ে রাখা হয়েছে। মূলত রাতের আঁধারে পার্শ্ববর্তী বিদ্যুতের পোল (খুঁটি) থেকে অবৈধ সংযোগ নিয়ে প্রতিদিন একাধিক ইজিবাইক চার্জ দেওয়া হতো এই গ্যারেজে।
অভিযুক্ত বেল্লাল ওই গ্রামের মো. মোহাজ্জেল হাওলাদারের ছেলে এবং স্থানীয় ওয়ার্ড বিএনপির সাধারণ সম্পাদক। রাজনৈতিক প্রভাবের কারণে প্রতিবেশী বা স্থানীয় কেউ এ বিষয়ে মুখ খোলার সাহস পাননি। তবে সম্প্রতি এক মিটার রিডার এই অবৈধ সংযোগের বিষয়টি দেখে ফেলেন এবং ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে অবহিত করেন। এর পরিপ্রেক্ষিতে গত শুক্রবার রাতে পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির একটি দল আকস্মিক অভিযান চালিয়ে পোল থেকে অবৈধভাবে বিদ্যুৎ সংযোগ দিয়ে ইজিবাইক চার্জ দেওয়ার সময় হাতেনাতে ধরে ফেলে।
শুধু বেরপাশা গ্রামই নয়, ঝালকাঠির প্রত্যন্ত এলাকাগুলোতে একশ্রেণির অসাধু চক্র এভাবে পোল থেকে অবৈধ সংযোগ নিয়ে ইজিবাইক ও অটোরিকশা চার্জ দিয়ে যাচ্ছে। ফলে তীব্র বিদ্যুৎ ঘাটতির কারণে ঘন ঘন লোডশেডিংয়ে বিপর্যস্ত হচ্ছে সাধারণ মানুষের জীবন। বিশেষ করে গ্রামাঞ্চলে লোডশেডিংয়ের পরিমাণ শহরের চেয়ে দ্বিগুণ।
অভিযোগ রয়েছে, পল্লী বিদ্যুতের একশ্রেণির অসাধু কর্মকর্তা-কর্মচারী গ্যারেজ প্রতি মাসিক চুক্তিভিত্তিক মোটা অঙ্কের টাকা (মাসোহারা) নিয়ে দিনের পর দিন এসব অবৈধ কর্মকাণ্ড চালিয়ে যাওয়ার সুযোগ করে দিচ্ছেন। এতে লাভবান হচ্ছেন কতিপয় গ্যারেজ মালিক ও দুর্নীতিবাজ বিদ্যুৎ কর্মচারীরা। অন্যদিকে সরকার প্রতি মাসে লাখ লাখ টাকার রাজস্ব হারাচ্ছে এবং সাধারণ মানুষকে পোহাতে হচ্ছে চরম দুর্ভোগ।
স্থানীয় বাসিন্দা আব্দুল আজিজ মিয়ার দেওয়া তথ্য ও গ্যারেজ মালিকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, গাড়ির সংখ্যা: ঝালকাঠি জেলার ২টি পৌরসভা ও ৪টি উপজেলায় ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা ও ইজিবাইকের সংখ্যা প্রায় অর্ধলক্ষাধিক। এর মধ্যে শুধু ঝালকাঠি শহরেই রয়েছে আড়াই হাজারেরও বেশি গাড়ি।
সাধারণত একটি ইজিবাইকের জন্য ১২ ভোল্টের ৪ থেকে ৫টি ব্যাটারির প্রয়োজন হয়।
প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের দাম বাণিজ্যিক হারে ৮ টাকা ধরলে, প্রতিদিন গড়ে ৪ লাখ টাকারও বেশি বিদ্যুৎ খরচ হচ্ছে। সে হিসাবে প্রতি মাসে এই খাতে বিদ্যুৎ খরচের পরিমাণ দাঁড়ায় প্রায় ১ কোটি ১২ লাখ টাকা।
একটি অটোরিকশা বা ইজিবাইক ৮ ঘণ্টা চার্জ দেওয়ার জন্য চালকদের কাছ থেকে প্রতিদিন ২০০ থেকে ২২০ টাকা নেওয়া হয়। এই হিসাবে প্রতি মাসে গাড়ি প্রতি আয় হয় প্রায় ৬ হাজার টাকা। শুধু শহরেই এ ধরনের শতাধিক গ্যারেজ রয়েছে।
অটোরিকশা চালক সাহাজ উদ্দিন জানান, রাতে প্রায় ৭৫ ভাগ গাড়িই অবৈধ সংযোগের মাধ্যমে চার্জ দেওয়া হয়। বাকি ২৫ ভাগ চার্জ হয় বৈধ লাইনে। দিনে সাধারণত চার্জ দেওয়া হয় না। সারারাত চার্জ দিয়ে সারাদিন গাড়ি চালানো হয়। তাছাড়া রাতের বেলায় অবৈধ সংযোগে চার্জ দেওয়াটা নিরাপদ মনে করেন গ্যারেজ মালিকেরা।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক গ্যারেজ মালিক হাসতে হাসতে বলেন, সব গাড়ি যদি বৈধ মিটার দিয়ে চার্জ দেওয়া হয়, তবে বিদ্যুৎ বিল দিতে দিতে গ্যারেজ মালিকেরা ফকির হয়ে যাবে। আর পল্লী বিদ্যুতের লোকজন এসে ঝামেলা করবে কেন? তাদেরকে তো প্রতি মাসে মোটা অঙ্কের টাকা দিতে হয়। তবে বড় কোনো অফিসার পরিদর্শনে এলে, যারা মাসোহারা নেন তারা আগেই আমাদের সতর্ক করে দেন। তখন আমরা গ্যারেজ তালাবদ্ধ রাখি অথবা অবৈধ সংযোগটি সাময়িকভাবে খুলে রাখি।
সরেজমিনে শহর ও আশপাশের এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, বেশিরভাগ গ্যারেজই খালি জায়গায় টিনশেড ঘর তৈরি করে গড়ে তোলা হয়েছে। এসব বৈধ গ্যারেজের আড়ালে ও আশপাশে অসংখ্য অবৈধ গ্যারেজও গড়ে উঠেছে।
বিষয়টি নিয়ে ঝালকাঠি পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির সিনিয়র জেনারেল ম্যানেজার মো. জুলফিকার রহমান জানান, অবৈধভাবে গড়ে ওঠা এসব গ্যারেজের তথ্য তাদের কাছে রয়েছে। পল্লী বিদ্যুৎ প্রতিনিয়ত এগুলোর বিরুদ্ধে অভিযান চালাচ্ছে, বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করছে এবং জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নিচ্ছে।
সারাদেশে যখন বিদ্যুৎ সংকট চলছে এবং বিদ্যুতের অপচয় রোধে সরকার নানা নির্দেশনা দিয়ে প্রজ্ঞাপন জারি করেছে, তখন ঝালকাঠিতে এমন বিদ্যুৎ চুরির বিরুদ্ধে পল্লী বিদ্যুতের এই কঠোর অভিযান অব্যাহত থাকবে বলে তিনি জানান।
সময়ের আলো/জোই