লেবাননে ইসরায়েলের সাম্প্রতিক সামরিক উত্তেজনা তেহরান ও ওয়াশিংটনের মধ্যে হওয়া একটি সমঝোতাকে দুর্বল করে দিতে পারে এবং পুরো মধ্যপ্রাচ্যে আরও অস্থিতিশীলতা সৃষ্টি করতে পারে।
জাস্টিন সালহানির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে স্বাক্ষরিত একটি সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেছে যে উভয় পক্ষ এবং তাদের মিত্রদের মধ্যে সব ফ্রন্টে, বিশেষ করে লেবাননে, ‘সামরিক অভিযান অবিলম্বে ও স্থায়ীভাবে বন্ধ’ করতে হবে।
অস্থায়ী এই চুক্তিতে আরও বলা হয়েছে, চূড়ান্ত চুক্তিতে লেবাননসহ সব ফ্রন্টে যুদ্ধের স্থায়ী অবসান নিশ্চিত করা হবে।
তবে বাস্তব পরিস্থিতি ভিন্ন। বিশ্লেষকদের মতে, ইসরায়েল এই সমঝোতার শর্তগুলো উপেক্ষা করছে বা ইচ্ছাকৃতভাবে তা মানছে না। চুক্তি স্বাক্ষরের পরও লেবাননে ইসরায়েলি হামলা অব্যাহত রয়েছে।
এই হামলার ফলে ২ মার্চ থেকে শুরু হওয়া ইসরায়েলের বিমান ও স্থল অভিযানে লেবাননে নিহতের সংখ্যা ৪,০০০-এরও বেশি হয়েছে। সহিংসতার এই বৃদ্ধি ইরানকে সুইজারল্যান্ডে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে নির্ধারিত আলোচনাও স্থগিত করতে বাধ্য করেছে।
হিজবুল্লাহ এবং লেবানন সরকার উভয়ই দেশ থেকে ইসরায়েলি বাহিনীর সম্পূর্ণ প্রত্যাহার দাবি করেছে। তবে হিজবুল্লাহ ইরান–যুক্তরাষ্ট্র আলোচনার সঙ্গে বিষয়টি যুক্ত করতে চায়, আর লেবানন সরকার ইসরায়েলের সঙ্গে সরাসরি আলাদা আলোচনার পক্ষে অবস্থান নিয়েছে।
মধ্যপ্রাচ্য বিশেষজ্ঞ মাইকেল ইয়ং বলেছেন, লেবানন এই সমঝোতার প্রাথমিক পর্যায়েই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে, কারণ ইরান চায় লেবাননের আঞ্চলিক অখণ্ডতার বিষয়টি এই চুক্তির সাফল্যের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত হোক।
তার মতে, লেবাননের পরিস্থিতি স্থিতিশীল না হলে পুরো ইরান–যুক্তরাষ্ট্র সমঝোতাই ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে।
ইসরায়েল ইরান-যুক্তরাষ্ট্র চুক্তি ‘ভেস্তে দেওয়ার চেষ্টা করবে’
ইসরায়েল ও ইরান-সমর্থিত হিজবুল্লাহ ২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে যুদ্ধ করছে। তবে ইসরায়েল দুই দফায় এই সংঘাত আরও তীব্র করেছে— ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বর এবং চলতি বছরের মার্চে— যার ফলে লেবাননে ব্যাপক বোমাবর্ষণ ও স্থল অভিযান চালানো হয়।
মার্চের এই তীব্রতা শুরু হয় এমন সময়ে, যখন হিজবুল্লাহ এক বছরের বেশি সময় পর প্রথমবারের মতো ইসরায়েলে হামলা চালায়। এটি ছিল ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আলি খামেনির হত্যাকাণ্ড এবং ২০২৪ সালের শেষ দিক থেকে ইসরায়েলের ১০ হাজারের বেশি যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘনের জবাব হিসেবে।
এর পর থেকে ইসরায়েল লেবাননে অন্তত ৪,০৫৭ জনকে হত্যা করেছে এবং ১২,১২১ জনের বেশি মানুষ আহত হয়েছে। দেশটি প্যারামেডিক ও সাংবাদিকদের লক্ষ্যবস্তু করেছে এবং বহু গ্রাম ধ্বংস করে দিয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্র একাধিকবার লেবাননে যুদ্ধবিরতি ঘোষণার চেষ্টা করলেও বাস্তবে পরিস্থিতি ভিন্নভাবে চলেছে।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প লেবানন নিয়ে একাধিক মন্তব্য করেছেন। তিনি বলেছেন, ইসরায়েলের উচিত লেবাননে তাদের সামরিক অভিযান কমিয়ে আনা। তবে ইসরায়েলি কর্মকর্তারা বারবার বলেছেন, লেবাননে তাদের সামরিক অভিযান চালিয়ে যাওয়ার সক্ষমতা বজায় রাখা জরুরি।
জি-৭ সামিট ২০২৬-এ ট্রাম্প বলেন, ইসরায়েল হিজবুল্লাহর বিরুদ্ধে অনেক দিন ধরে লড়ছে এবং এতে বহু মানুষের মৃত্যু হচ্ছে। তিনি বলেন, কাউকে খুঁজতে গিয়ে প্রতিবারই পুরো একটি অ্যাপার্টমেন্ট ভবন ধ্বংস করার প্রয়োজন নেই, কারণ সেখানে সাধারণ মানুষও থাকে।
তিনি আরও বলেন, তিনি লেবানন ও হিজবুল্লাহ নিয়ে ইসরায়েলের আচরণে সন্তুষ্ট নন এবং ইসরায়েল আরও দ্রুত অভিযান শেষ করতে পারত।
বিশ্লেষকদের মতে, লেবাননের বিষয়টি যুক্তরাষ্ট্র–ইরান সমঝোতা স্মারকে অন্তর্ভুক্ত থাকায় ইরান সেখানে পরিস্থিতিকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে দেখছে। একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র, যাদের লেবানন সরকারের সঙ্গে ভালো দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক রয়েছে, তারা ইসরায়েলের ওপর যুদ্ধ বন্ধে চাপ প্রয়োগ করতে পারে।
ডেভিড উড বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র চাইছে ইরান ও লেবানন সংকটকে আলাদা করে দেখতে। তার মতে, এতে লেবাননের জন্য সুযোগ তৈরি হতে পারে, যাতে দেশটি ইসরায়েল–লেবানন যুদ্ধবিরতি কার্যকর করতে পারে।
তিনি আরও বলেন, এটি লেবানন রাষ্ট্রকে দেখানোর সুযোগ দেবে যে তারা নিজেদের ভূখণ্ড নিয়ন্ত্রণ করতে এবং অ-সহিংস উপায়ে দেশ রক্ষা করতে সক্ষম—যা হিজবুল্লাহর সশস্ত্র প্রতিরোধ কৌশলের বিকল্প হতে পারে।
তবে পরিস্থিতি ভিন্ন দিকেও যেতে পারে।
বিশেষজ্ঞ মাইকেল ইয়ং বলেন, ইসরায়েল সম্ভবত এই সমঝোতা স্মারক এবং ইরান–যুক্তরাষ্ট্র আলোচনাকে ভেস্তে দেওয়ার চেষ্টা করবে। তার মতে, তারা চায় না এই আলোচনা সফল হোক, তাই লেবাননে যুদ্ধ অব্যাহত রাখাই তাদের একটি কৌশল হতে পারে।
তাছাড়া করিম সাফিয়েদ্দিন মনে করেন, লেবাননে যুদ্ধ বন্ধ করার জন্য ইসরায়েলের কোনো রাজনৈতিক, প্রযুক্তিগত, শিল্প বা অর্থনৈতিক প্রণোদনা নেই।
হিজবুল্লাহর ভূমিকা কী
ইসরায়েল যদি লেবাননে হামলা বন্ধ না করে এবং যুক্তরাষ্ট্র যদি ইসরায়েলি সরকারের ওপর চাপ দিতে অক্ষম বা অনিচ্ছুক থাকে, তাহলে ইরান কী পদক্ষেপ নেবে—এটাই এখন বড় প্রশ্ন।
বিশেষজ্ঞ করিম সাফিয়েদ্দিন বলেছেন, ইরানের ভেতরে, এমনকি রাষ্ট্রীয় কাঠামোর মধ্যেও মতভেদ রয়েছে যে লেবাননে ইসরায়েলি আগ্রাসন থামাতে তারা কতদূর যাবে।
শনিবার যুদ্ধবিরতি ঘোষণা থাকা সত্ত্বেও ইসরায়েল আবার লেবাননে হামলা চালায়। এর পর ইরান আবারও গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক পথ হরমুজ প্রণালী বন্ধ করার ঘোষণা দেয়।
নতুন সমঝোতা স্মারকের (এমওইউ) কারণে লেবাননের অনেক মানুষ আশা করছে যুদ্ধ শেষের পথে। তবে এখনো বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিষয় অমীমাংসিত রয়ে গেছে।
হিজবুল্লাহর মহাসচিব নাইম কাসেম বুধবার এক ভাষণে তাদের প্রধান সমর্থক ইরানের প্রশংসা করেন। তিনি বলেন, ইরান লেবাননের ‘প্রতিরোধ আন্দোলন’ ও জনগণকে এমন এক প্রস্তুতির মানসিকতায় যুক্ত করেছে, যা ইসরায়েলকে তাদের ‘আগ্রাসন বন্ধ করতে’ বাধ্য করেছে।
ইসরায়েল ও লেবানন আগামী সপ্তাহে সরাসরি আলোচনা চালিয়ে যাওয়ার কথা রয়েছে। তবে হিজবুল্লাহকে নিরস্ত্র করার বিষয়টি এখনো বড় বাধা হিসেবে রয়েছে। ২০২৫ সালের শুরু থেকে লেবানন সরকার এই গোষ্ঠীকে নিরস্ত্র করার উদ্যোগ নিয়েছে, কিন্তু ইসরায়েল–হিজবুল্লাহ সংঘাতের নতুন তীব্রতা সেই প্রক্রিয়াকে থামিয়ে দিয়েছে।
বিশ্লেষক ডেভিড উড বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র–ইরান সমঝোতা স্মারকের কারণে লেবাননের রাজনৈতিক নেতৃত্ব আবারও জটিল পরিস্থিতির মুখে পড়েছে।
একদিকে লেবানন নিজের ভবিষ্যৎ নিজে নিয়ন্ত্রণ করতে চায় এবং ইসরায়েল–হিজবুল্লাহ যুদ্ধ টেকসইভাবে শেষ করতে চায়। অন্যদিকে প্রেসিডেন্ট জোসেফ আউন ইরানের ভূমিকা এবং লেবাননে যুদ্ধবিরতির বিষয়টি সমঝোতায় অন্তর্ভুক্ত হওয়াকে স্বাগত জানালেও বাস্তবে যুদ্ধ এখনো থামেনি।
ডেভিড উড আরও বলেন, ইসরায়েল ও হিজবুল্লাহর মৌলিক সংঘাত সমাধানে লেবাননের ক্ষমতা খুব সীমিত। তাই ভবিষ্যতে বৈরুতকে অবশ্যই বাইরের শক্তির সহায়তার ওপর নির্ভর করতে হবে।
সময়ের আলো/ইউএমএইচ