ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে স্বাক্ষরিত সাম্প্রতিক সমঝোতা চুক্তি নিয়ে উপসাগরীয় মিত্রদের অসন্তোষ ও উদ্বেগ দূর করতে আনুষ্ঠানিকভাবে পশ্চিম এশিয়া সফর শুরু করেছেন মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও। বুধবার তার এই কূটনৈতিক সফর শুরু হয়েছে বলে জানিয়েছে রয়টার্স। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান স্বাক্ষরিত এই চুক্তির অধীনে ইরানকে প্রস্তাবিত ৩০০ বিলিয়ন ডলারের একটি পুনর্গঠন তহবিলসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে বড় ধরনের ছাড় দেওয়া হয়েছে। এটি পারস্য উপসাগরীয় দেশগুলোর কাছে তাদের এক সময়কার আঞ্চলিক ‘শত্রুর’ প্রতি ‘অতিরিক্ত উদারতা’ দেখানার শামিল বলে মনে হচ্ছে।
তিন দিনের উপসাগরীয় অঞ্চলে সফরের অংশ হিসেবে মঙ্গলবার স্থানীয় সময় গভীর রাতে সংযুক্ত আরব আমিরাতের রাজধানী আবুধাবিতে পৌঁছান রুবিও। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের সঙ্গে ইরানের চার মাস ধরে চলা যুদ্ধের অবসান ঘটাতে গত সপ্তাহে স্বাক্ষরিত চুক্তির পর এটিই মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রীর প্রথম উচ্চ পর্যায়ের কূটনৈতিক সফর।
আবুধাবিতে পৌঁছানোর পর এই চুক্তি নিয়ে মিত্রদের অস্বস্তি দূর করার বিষয়ে জানতে চাওয়া হলে রুবিও সাংবাদিকদের বলেন, ‘আলোচনায় অবশ্যই এ বিষয়টি উঠবে।’ তিনি আরও জানান, ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে স্বাক্ষরিত সমঝোতা স্মারকে উল্লেখ নেই এমন গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো নিয়েও দ্বিপক্ষীয় স্তরে আলোচনা হবে।
সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে ইরান সংক্রান্ত আলোচনা থেকে মার্কিন শীর্ষ কূটনীতিক রুবিও অনেকটাই আড়ালে ছিলেন। তার পরিবর্তে রোববার সুইজারল্যান্ডে ইরানি প্রতিনিধিদের সঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ আলোচনায় মার্কিন পক্ষের নেতৃত্ব দেন ভাইস প্রেসিডেন্ট জে ডি ভ্যান্স। এক সময় ইরানের বিরুদ্ধে কড়া অবস্থান নেওয়া রুবিও এখন কীভাবে মিত্রদের কাছে এই চুক্তিকে উপস্থাপন করেন, তা নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে।
কারণ অনেক রিপাবলিকান আইনপ্রণেতাই মনে করছেন, এই চুক্তি মূলত তেহরানের কাছে ট্রাম্প প্রশাসনের এক ধরনের নতিস্বীকার। রুবিও এবং ভ্যান্স, দুজনেই সাবেক মার্কিন সিনেটর। রিপাবলিকান পার্টির ভেতরে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের উত্তরসূরি হওয়ার দৌড়ে সম্ভাব্য প্রার্থী হিসেবে তাদের জোরালো অবস্থান রয়েছে।
রুবিওর এবারের পশ্চিম এশিয়া সফরটি অত্যন্ত সংবেদনশীল। ট্রাম্পের দৃঢ় সমর্থনপুষ্ট এই অন্তর্বর্তী চুক্তির প্রতি সমর্থন দেওয়ার পাশাপাশি তাকে চুক্তির শর্ত নিয়ে সন্দিহান উপসাগরীয় মিত্রদের আশ্বস্ত করতে হবে। রয়টার্স জানিয়েছে, চার মাসব্যাপী সংঘাতের সময় উপসাগরীয় নেতারা বারবার শান্তির আহ্বান জানালেও সমঝোতা চুক্তির চূড়ান্ত শর্ত দেখে তারা চমকে গেছেন এবং একই সঙ্গে হতাশ হয়েছেন।
যুক্তরাষ্ট্রের পশ্চিম এশিয়ার আরব মিত্রদের প্রধান শঙ্কা হলো, ইরান এই ৩০ হাজার কোটি ডলারের পুনর্গঠন তহবিল তার সামরিক শক্তি নতুন করে বাড়াতে ব্যবহার করতে পারে। এ ছাড়া এই চুক্তিতে তেহরানের ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতা নিয়ে কোনো কথা বলা হয়নি, যা উপসাগরীয় দেশগুলোর জন্য বড় উদ্বেগে পরিণত হয়েছে। কারণ যুদ্ধের সময় এই দেশগুলো ইরানি ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোনের সরাসরি আঘাতের শিকার হয়েছিল।
রুবিও তার এই সফরে যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলগত সামরিক ঘাঁটি থাকা সংযুক্ত আরব আমিরাত ও কুয়েত পরিদর্শনে যাচ্ছেন, যেখানে সংঘাতের সময় ইরানি ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় বেসামরিক নাগরিক নিহত ও ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছিল। যুদ্ধের কারণে তেলবহির্ভূত অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি হাজার হাজার প্রবাসী পালিয়ে যাওয়ায় বিশেষ করে আরব আমিরাত এখন তীব্র অর্থনৈতিক সংকটে পড়েছে।
এর ফলে আক্রমণকারী দেশের এত কাছাকাছি থাকা একটি বিকাশমান বৈশ্বিক আর্থিক কেন্দ্রের দীর্ঘমেয়াদি স্থায়িত্ব নিয়ে নতুন প্রশ্ন উঠেছে। রয়টার্সের এক প্রতিবেদনে জানানো হয়, উপসাগরীয় আরব দেশগুলোতে হামলার উদ্দেশ্যে ইরাকে নতুন গোপন সেল গঠন করেছে ইরান। এই সেলগুলো এপ্রিল ও মে মাসে কুয়েত, আরব আমিরাত ও সৌদি আরবের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় অন্তত সাতটি ড্রোন হামলা চালিয়েছিল।
সময়ের আলো/আআ