বিশ্বকাপের মঞ্চে প্রতিদিনই জন্ম নেয় নতুন গল্প। তবে কিছু গল্প শুধু ফলাফলের জন্য নয়, সাহস, লড়াই আর অসম্ভবকে সম্ভব করার জন্য ইতিহাসের পাতায় জায়গা করে নেয়। কানসাস সিটির মাঠে তেমনই এক অবিশ্বাস্য অধ্যায়ের জন্ম দিল ছোট্ট দ্বীপরাষ্ট্র কুরাসাও। গোলশূন্য ড্র হলেও ইকুয়েডরের বিপক্ষে এই ম্যাচটি তাদের কাছে যেন জয়েরই সমান।
মাত্র ১ লাখ ৫৮ হাজার জনসংখ্যার দেশ কুরাসাও প্রথমবারের মতো খেলছে ফুটবল বিশ্বকাপে। টুর্নামেন্টের প্রথম ম্যাচে জার্মানির কাছে ৭-১ গোলে বিধ্বস্ত হওয়ার পর অনেকেই ভেবেছিলেন, তাদের বিশ্বকাপ যাত্রা হয়তো আর বেশি দূর এগোবে না। সেই ম্যাচে গোলপোস্টের নিচে দাঁড়িয়ে অসহায় দেখাচ্ছিল গোলরক্ষক এলয় রুমকে।
কিন্তু অভিজ্ঞ এই গোলকিপার ভেঙে পড়েননি। বরং কয়েক দিনের ব্যবধানে নিজেকে পরিণত করলেন বিশ্বকাপের নতুন নায়কে।
শুরু থেকেই একের পর এক আক্রমণ চালাতে থাকে ইকুয়েডর। ম্যাচের অধিকাংশ সময় বলের দখল, আক্রমণের তীব্রতা এবং সুযোগ তৈরিতে এগিয়ে ছিল ইকুয়েডর। কিন্তু তাদের সামনে দেয়াল হয়ে দাঁড়ান কুরাসাওয়ের অধিনায়ক ও গোলরক্ষক এলয় রুম।
৩৭ বছর বয়সি এই গোলকিপার পুরো ম্যাচে ১৫টি সেভ করেন, যা বিশ্বকাপ ইতিহাসে নির্ধারিত ৯০ মিনিটে সর্বোচ্চ সেভের নতুন রেকর্ড। ১৯৬৬ সালে গড়া পুরোনো রেকর্ড ভেঙে দিয়ে তিনি লিখেছেন নতুন ইতিহাস। ইকুয়েডরের ফুটবলাররা বারবার তার পরীক্ষা নিয়েছেন, কিন্তু প্রতিবারই অসাধারণ দক্ষতায় বল ঠেকিয়ে দিয়েছেন রুম।
তার অবিশ্বাস্য পারফরম্যান্সের ফলেই বিশ্বকাপের মঞ্চে প্রথমবারের মতো কোনো পয়েন্ট অর্জন করল কুরাসাও। গোলশূন্য ড্রয়ের পর খেলোয়াড়দের উচ্ছ্বাস দেখলে মনে হচ্ছিল তারা যেন কোনো শিরোপা জিতেছে। কারণ এই এক পয়েন্টই তাদের নকআউট পর্বে ওঠার স্বপ্নকে বাঁচিয়ে রেখেছে।
ম্যাচ শেষে আবেগাপ্লুত রুম নিজের অনুভূতি প্রকাশ করতে গিয়ে বলেন, ‘এটা আমাদের জন্য অনেক বড় ব্যাপার। মনে হচ্ছে আমরা ম্যাচটা জিতে গেছি। বিশ্বকাপে আমাদের প্রথম পয়েন্ট, এটা অবিশ্বাস্য অনুভূতি।’
তিনি আরও বলেন, ‘আমরা কোথা থেকে এসেছি এবং এখন কোথায় দাঁড়িয়ে আছি, সেটাই সবচেয়ে বড় বিষয়। আমরা
দেখিয়ে দিয়েছি, আমাদের হৃদয় সিংহের মতো। আমি জানতাম অনেকগুলো সেভ করেছি এবং এটা দীর্ঘদিনের একটি রেকর্ড ছিল। এ জন্য আমি সত্যিই গর্বিত।’
রুম জানান, ম্যাচের প্রথম সেভটিই তাকে আত্মবিশ্বাস জুগিয়েছিল। এরপর প্রতিটি আক্রমণের জন্য নিজেকে প্রস্তুত রেখেছিলেন তিনি। যদিও ড্রয়ে সন্তুষ্ট, তবু কিছুটা আক্ষেপও আছে তার। কারণ কুরাসাও কয়েকটি ভালো সুযোগ তৈরি করেছিল, যেখান থেকে গোলও পেতে পারত।
হাসতে হাসতে তিনি বলেন, ‘আমার মনে হয় এখন কুরাসাওয়ে আমার একটা মূর্তি দরকার! আমি যখন ৪০ বছর বয়সে পৌঁছাব, তখন এই ম্যাচের কথা মনে করে গর্ববোধ করব।’
বিশ্বকাপের মতো বড় আসরে প্রায়ই ছোট দলগুলো নিজেদের অস্তিত্ব জানান দেয়। তবে কুরাসাওয়ের এই গল্প অন্যরকম। জার্মানির বিপক্ষে সাত গোল হজম করা দলটি মাত্র কয়েক দিনের ব্যবধানে বিশ্বের নজর কাড়ল অবিশ্বাস্য এক লড়াই দিয়ে। আর সেই রূপকথার কেন্দ্রবিন্দুতে আছেন এলয় রুম।
এখনও তাদের সামনে কঠিন পরীক্ষা বাকি। গ্রুপের শেষ ম্যাচে আইভরিকোস্টকে হারাতে পারলেই শেষ ৩২-এর টিকেট পেয়ে যেতে পারে কুরাসাও। সেটা হবে কি না, তা সময়ই বলে দেবে। তবে একটি বিষয় নিশ্চিত। কানসাস সিটির রাতে এলয় রুম ও কুরাসাও প্রমাণ করেছে, ফুটবলে অসম্ভব বলে কিছু নেই। কখনো কখনো একটি গোলশূন্য ড্র-ও ইতিহাসের সবচেয়ে বড় বিজয়ের অনুভূতি এনে দিতে পারে।
সময়ের আলো/জেডি