ডালাসের তীব্র গরম আর বিশ্বকাপের বাড়তি চাপ এই দুইয়ের মাঝেই গ্রুপ ‘এফ’-এর গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচে মুখোমুখি হচ্ছে জাপান ও সুইডেন। শীর্ষ দুইয়ে জায়গা নিশ্চিত করার এই লড়াইয়ে কাগজে-কলমে সামান্য এগিয়ে জাপান, যারা বর্তমান টুর্নামেন্টে সবচেয়ে সংগঠিত ও ভারসাম্যপূর্ণ দলগুলোর একটি।
হাজিকি মোরিয়াসুরের দল কেবল ফলাফলেই নয়, খেলার ধরনেও নজর কাড়ছে। দ্রুত ট্রানজিশন, শৃঙ্খলাবদ্ধ ডিফেন্স এবং মাঝমাঠে নিখুঁত নিয়ন্ত্রণ তাদের ফুটবলের মূলশক্তি। প্রতিপক্ষের ভুল কাজে লাগানো এবং মুহূর্তেই আক্রমণে রূপ নেওয়ার ক্ষমতা জাপানকে আলাদা উচ্চতায় নিয়ে গেছে। নেদারল্যান্ডসের মতো শক্তিশালী দলের বিপক্ষে ড্র এবং তিউনিসিয়ার বিপক্ষে ৪-০ গোলের জয় তাদের আত্মবিশ্বাস আরও দৃঢ় করেছে। বিশেষ করে আয়াসে উয়েদা ও দাইচি কামাদার ফর্ম আক্রমণভাগ ধারালো করে তুলেছে, যেখানে প্রতিটি সুযোগই গোলের সম্ভাবনা তৈরি করছে। বড় দলের বিপক্ষে সাম্প্রতিক সাফল্য যেমন ব্রাজিল ও ইংল্যান্ডের বিপক্ষে জয় জাপানকে মানসিকভাবে আরও শক্ত অবস্থানে দাঁড় করিয়েছে, যা চাপের ম্যাচে তাদের বাড়তি সুবিধা দিচ্ছে।
অন্যদিকে সুইডেন দাঁড়িয়ে আছে এক ভিন্ন বাস্তবতার সামনে। টুর্নামেন্টের শুরুটা দারুণ হলেও ধারাবাহিকতা ধরে রাখতে পারেনি তারা। তিউনিসিয়ার বিপক্ষে ৫-১ গোলের বড় জয় তাদের আক্রমণভাগের ভয়ংকর রূপ দেখালেও পরের ম্যাচে নেদারল্যান্ডসের কাছে ১-৫ ব্যবধানে হেরে সুইডেনের রক্ষণভাগের দুর্বলতা স্পষ্ট হয়ে গেছে। ভিক্টর গিওকেরেস ও আলেকজান্ডার ইসাকের মতো বিশ্বমানের দুই স্ট্রাইকার থাকা সত্ত্বেও দলটির মূল সমস্যা হলো ভারসাম্য। আক্রমণ যত শক্তিশালী, মাঝমাঠ ও রক্ষণ ততটাই অস্থির, ফলে ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখতে ব্যর্থ হচ্ছে সুইডেন। চাপের ম্যাচে ডিফেন্সিভ সংগঠন ভেঙে পড়ার প্রবণতা তাদের জন্য বড় উদ্বেগের কারণ বিশেষ করে এমন প্রতিপক্ষের বিপক্ষে যারা দ্রুত পাসিং ও স্পেস ব্যবহার করতে দক্ষ।
ফিফার র্যাঙ্কিংয়েও দুই দলের ব্যবধান স্পষ্ট। জাপানের অবস্থান ১৮ তে, ফলে ইউরোপীয় শক্তিগুলোর কাছাকাছি চলে এসেছে এবং ধারাবাহিক পারফরম্যান্স দিয়ে নিজেদের প্রমাণ করছে। অন্যদিকে সুইডেনের ৩৮। এখনও পুনর্গঠনের পর্যায়ে রয়েছে এবং বড় ম্যাচে ধারাবাহিকতা খুঁজে পেতে লড়াই করছে। এই পরিসংখ্যানই ইঙ্গিত দেয় ম্যাচে মানসিক স্থিতি ও দলগত শৃঙ্খলায় জাপান তুলনামূলকভাবে এগিয়ে। সব মিলিয়ে এই ম্যাচে দেখা যাবে দুই বিপরীত ফুটবল দর্শনের লড়াই। একদিকে জাপানের পরিকল্পিত, সংগঠিত ও গতিময় দলীয় ফুটবল, অন্যদিকে সুইডেনের ব্যক্তিগত প্রতিভানির্ভর আক্রমণ। জাপান যেখানে প্রতিটি লাইনে সমন্বিতভাবে খেলতে অভ্যস্ত, সেখানে সুইডেনের নির্ভরতা গিওকেরেস-ইসাক জুটির ওপর। তাই ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ কোন দিকে যাবে, তা অনেকটাই নির্ভর করবে মাঝমাঠের দখল ও প্রথম গোলের ওপর। জাপানের বর্তমান ফর্ম ও স্থিতিশীলতা তাদের সামান্য এগিয়ে রাখলেও সুইডেনের আক্রমণভাগ যেকোনো মুহূর্তে ম্যাচের রং বদলে দিতে সক্ষম। ফলে এটি হতে যাচ্ছে এক কঠিন, কৌশলগত ও তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ লড়াই।
গ্রুপ এফের অন্য ম্যাচে কানাস সিটিতে শীর্ষ দুইয়ে জায়গা নিশ্চিত করার সমীকরণে নেদারল্যান্ডস মাঠে নামবে তিউনিশিয়ার বিপক্ষে। নেদারল্যান্ডস যেখানে গ্রুপ শীর্ষে থেকে নকআউট নিশ্চিত করার পথে এগোতে চায়, সেখানে তিউনিশিয়ার লক্ষ্য টিকে থাকার শেষ লড়াইয়ে অন্তত একটি ফল বের করা। প্রথম দুই ম্যাচে দারুণ ছন্দে ছিল নেদারল্যান্ডস। জাপানের বিপক্ষে ২-২ গোলে ড্র করে তারা প্রতিযোগিতামূলক মানসিকতার প্রমাণ দেয়, এরপর সুইডেনকে ৫-১ ব্যবধানে উড়িয়ে দিয়ে নিজেদের আক্রমণ শক্তির ভয়ংকর রূপ দেখায়। কোচের পরিকল্পনায় আক্রমণভাগ অত্যন্ত ধারালো, বিশেষ করে উইং ও ফাইনাল থার্ডে দ্রুত পাসিং ও জায়গা তৈরি করার সক্ষমতা তাদের বড় শক্তি। ডাচ দল এখন পর্যন্ত দেখিয়েছে, তারা বড় ম্যাচে চাপ সামলাতে জানে এবং গোলের সুযোগকে কাজে লাগাতে খুব বেশি সময় নেয় না।
অন্যদিকে তিউনিশিয়া শুরুটা করেছে কঠিনভাবে। জাপানের বিপক্ষে ৪-০ ব্যবধানে হেরে তারা বড় ধাক্কা খেয়েছে, যেখানে ডিফেন্সিভ দুর্বলতা স্পষ্টভাবে ধরা পড়ে। দ্বিতীয় ম্যাচে কিছুটা উন্নতি দেখা গেলেও তারা এখনও ধারাবাহিকতা খুঁজে পায়নি। দলটির সমস্যা মূলত আক্রমণ ও মাঝমাঠের সংযোগে বল দখল করলেও শেষ মুহূর্তে কার্যকর আক্রমণ তৈরি করতে পারছে না তারা। তবে শারীরিক শক্তি ও রক্ষণভাগে ঘন ব্লক তৈরি করার সক্ষমতা তাদের বড় ভরসা। ফিফা র্যাঙ্কিংয়েও দুই দলের ব্যবধান স্পষ্ট। নেদারল্যান্ডস বিশ্বের ৮ নম্বরে অবস্থান করছে, যেখানে তিউনিশিয়া ৪৫-এর ঘরে রয়েছে। এই পার্থক্য শুধু র্যাঙ্কিং নয়, মানসিক শক্তি ও অভিজ্ঞতাতেও প্রতিফলিত হচ্ছে।
নেদারল্যান্ডসের তারকা শক্তি তাদের আক্রমণভাগে ডিপে ও গ্যাপকোদের মতো খেলোয়াড়রা যেকোনো মুহূর্তে ম্যাচের মোড় ঘুরিয়ে দিতে পারেন। মাঝমাঠে ভারসাম্য রেখে খেলা নিয়ন্ত্রণ করাও তাদের বড় সুবিধা। অন্যদিকে তিউনিশিয়ার আশা মূলত রক্ষণভাগের শৃঙ্খলা এবং কাউন্টার অ্যাটাকের ওপর নির্ভরশীল, যেখানে দ্রুত গতির উইঙ্গাররা সুযোগ কাজে লাগাতে পারে। সব মিলিয়ে এটি একপেশে লড়াই হওয়ার সম্ভাবনা থাকলেও ফুটবলে কোনো কিছুই নিশ্চিত নয়। নেদারল্যান্ডস ফেভারিট হলেও তিউনিশিয়ার জন্য এটি ‘বাঁচা-মরার ম্যাচ’, যেখানে একটি ভুল পুরো সমীকরণ বদলে দিতে পারে।
সময়ের আলো/আনবিএন