মদরিচ এক অবিনশ্বর শিল্পী

ক্রীড়া ডেস্ক

খেলা

ফুটবলে কিছু খেলোয়াড় আছেন যাদের সাফল্য শুধু পরিসংখ্যান দিয়ে মাপা যায় না। তারা কেবল গোল, অ্যাসিস্ট কিংবা ট্রফির সংখ্যায় সীমাবদ্ধ

2026-06-25T04:28:35+00:00
2026-06-25T04:28:35+00:00
 
  বৃহস্পতিবার, ২৫ জুন ২০২৬,
১১ আষাঢ় ১৪৩৩
বৃহস্পতিবার, ২৫ জুন ২০২৬
খেলা
মদরিচ এক অবিনশ্বর শিল্পী
ক্রীড়া ডেস্ক
প্রকাশ: বৃহস্পতিবার, ২৫ জুন, ২০২৬, ৪:২৮ এএম 
লুকা মদরিচ। ছবি : সংগৃহীত
ফুটবলে কিছু খেলোয়াড় আছেন যাদের সাফল্য শুধু পরিসংখ্যান দিয়ে মাপা যায় না। তারা কেবল গোল, অ্যাসিস্ট কিংবা ট্রফির সংখ্যায় সীমাবদ্ধ নন; তারা হয়ে উঠেন একটি যুগের প্রতীক। ক্রোয়েশিয়ার মাঝমাঠের জাদুকর লুকা মদরিচ ঠিক তেমনই একজন। ঘানার বিপক্ষে বিশ্বকাপের ম্যাচে মাঠে নামার মধ্য দিয়ে তিনি স্পর্শ করেছেন নিজের আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের ২০০তম ম্যাচের অনন্য মাইলফলক। এই সংখ্যা শুধু একটি রেকর্ড নয়, বরং প্রায় দুই দশক ধরে দেশকে নেতৃত্ব দেওয়া, প্রতিকূলতার বিরুদ্ধে লড়াই করে উঠে আসা এবং ফুটবলকে শিল্পের পর্যায়ে নিয়ে যাওয়ার এক অসাধারণ যাত্রার প্রতিচ্ছবি।

১৯৮৫ সালে ক্রোয়েশিয়ার জাদার শহরে জন্ম নেওয়া মদরিচের শৈশব ছিল সংগ্রামে ভরা। ক্রোয়েশিয়ার স্বাধীনতা যুদ্ধের ভয়াবহতা খুব কাছ থেকে দেখেছেন তিনি। যুদ্ধের কারণে পরিবারকে উদ্বাস্তু জীবন কাটাতে হয়েছিল। এমনকি যুদ্ধের নির্মমতায় প্রাণ হারান তার দাদা। যে বয়সে শিশুদের স্কুল আর খেলার মাঠে সময় কাটানোর কথা, সেই বয়সে আশ্রয়কেন্দ্রের পাশে ফুটবল খেলেই বড় হয়েছেন মদরিচ। 

কিন্তু প্রতিকূলতা তার স্বপ্নকে থামাতে পারেনি। বরং সেখান থেকেই জন্ম নিয়েছিল অদম্য মানসিক শক্তি, যা পরবর্তীতে তাকে বিশ্বের অন্যতম সেরা মিডফিল্ডারে পরিণত করে। ক্যারিয়ারের শুরুতে অনেকেই মনে করতেন, ছোট গড়নের কারণে আন্তর্জাতিক ফুটবলে সফল হওয়া তার পক্ষে কঠিন হবে। কিন্তু তিনি প্রমাণ করেছেন, ফুটবলে শারীরিক শক্তির চেয়ে বুদ্ধিমত্তা, দূরদর্শিতা ও দক্ষতা অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ। ক্রোয়েশিয়ার ক্লাব দিনামো জাগরেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করার পর ইউরোপের বড় ক্লাবগুলোর নজরে আসেন তিনি। এরপর ইংল্যান্ডের টটেনহ্যাম হটস্পারে যোগ দিয়ে ধীরে ধীরে ইউরোপের অন্যতম সেরা সৃজনশীল মিডফিল্ডার হিসেবে নিজের পরিচয় গড়ে তোলেন।

২০১২ সালে স্পেনের বিখ্যাত ক্লাব রিয়াল মাদ্রিদে যোগ দেওয়ার পর তার ক্যারিয়ার নতুন উচ্চতায় পৌঁছে যায়। শুরুতে কিছু সমালোচনার মুখে পড়লেও সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তিনি ক্লাবটির ইতিহাসের অন্যতম সেরা মিডফিল্ডারে পরিণত হন। মাঝমাঠে খেলার গতি নিয়ন্ত্রণ, নিখুঁত পাস, আক্রমণ তৈরি এবং নেতৃত্বের অসাধারণ ক্ষমতা দিয়ে তিনি রিয়াল মাদ্রিদের সাফল্যের অন্যতম ভিত্তি হয়ে উঠেন। তার হাত ধরে ক্লাবটি একের পর এক ইউরোপসেরা হওয়ার গৌরব অর্জন করেছে।

২০১৮ সাল ছিল মদরিচের ক্যারিয়ারের সবচেয়ে স্মরণীয় বছরগুলোর একটি। সে বছর তিনি বিশ্বের সেরা ফুটবলারের স্বীকৃতি অর্জন করেন এবং দীর্ঘদিন ধরে লিওনেল মেসি ও ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদোর আধিপত্য ভেঙে বিশ্বের সেরা খেলোয়াড়ের পুরস্কার জেতেন। একই বছর তার নেতৃত্বে ক্রোয়েশিয়া প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপের ফাইনালে ওঠে। পুরো আসরে অসাধারণ পারফরম্যান্সের জন্য তিনি টুর্নামেন্টের সেরা খেলোয়াড়ের পুরস্কারও জেতেন। এরপর ২০২২ সালের বিশ্বকাপে দলকে তৃতীয় স্থান এনে দিয়ে আবারও প্রমাণ করেন, তিনি শুধু একজন দক্ষ ফুটবলারই নন, একজন অসাধারণ নেতা।

২০০৬ সালে জাতীয় দলের জার্সিতে অভিষেক হওয়ার পর থেকে মদরিচ বহু প্রজন্মের ফুটবলারের সঙ্গে খেলেছেন। সময়ের সঙ্গে সতীর্থ বদলেছে, কোচ বদলেছে, দলের কৌশল বদলেছে; কিন্তু একটি নাম সবসময় অপরিবর্তিত থেকেছে লুকা মদরিচ। তিনি হয়ে উঠেছেন ক্রোয়েশিয়ার ফুটবলের হৃদস্পন্দন, অনুপ্রেরণা এবং নির্ভরতার প্রতীক।

আন্তর্জাতিক ফুটবলে ২০০ ম্যাচ খেলা অত্যন্ত বিরল একটি অর্জন। এটি শুধু দীর্ঘ ক্যারিয়ারের প্রমাণ নয়; বরং ধারাবাহিকতা, ফিটনেস, পেশাদারিত্ব এবং দেশের প্রতি অগাধ ভালোবাসার প্রতিফলন। যখন অনেক খেলোয়াড় ক্যারিয়ারের শেষ প্রান্তে এসে হারিয়ে যান, তখনও মদরিচ জাতীয় দলের মাঝমাঠে অন্যতম ভরসার নাম। বয়স বাড়লেও তার খেলার বুদ্ধিমত্তা, দৃষ্টিশক্তি, পাসের নিখুঁততা এবং নেতৃত্বের গুণাবলি এখনও আগের মতোই উজ্জ্বল।

ঘানার বিপক্ষে ২০০তম ম্যাচে মাঠে নামার মুহূর্তটি তাই শুধু একজন ফুটবলারের ব্যক্তিগত অর্জন নয়; এটি একটি দেশের গর্ব, একটি প্রজন্মের আবেগ এবং ফুটবলপ্রেমীদের জন্য অনুপ্রেরণা। ফুটবলের ইতিহাসে জিদান, জাভি, আন্দ্রেস ইনিয়েস্তা কিংবা আন্দ্রেয়া পিরলোর মতো কিংবদন্তিদের পাশে নিজের নাম স্বর্ণাক্ষরে লিখে ফেলেছেন লুকা মদরিচও।

ভবিষ্যতে যখন ফুটবল ইতিহাসের পাতাগুলো উল্টানো হবে, তখন লুকা মদরিচকে শুধু একজন অসাধারণ মিডফিল্ডার হিসেবে নয়, বরং এমন একজন যোদ্ধা হিসেবে স্মরণ করা হবে, যিনি যুদ্ধবিধ্বস্ত শৈশব থেকে উঠে এসে নিজের দেশকে বিশ্ব ফুটবলের অভিজাত আসনে বসিয়েছিলেন। ২০০তম আন্তর্জাতিক ম্যাচ সেই মহাকাব্যিক যাত্রার আরেকটি উজ্জ্বল অধ্যায় হয়ে চিরকাল স্মরণীয় হয়ে থাকবে।

সময়ের আলো/আআ



  বিষয়:   মদরিচ  অবিনশ্বর  শিল্পী  ক্রোয়েশিয়া 


Loading...
Loading...
খেলা- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: