ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর দল লিকুদ পার্টির এক মন্ত্রী বলেছেন, আজ হোক বা কাল, সিরিয়ার সঙ্গে ইসরাইলকে যুদ্ধে জড়াতেই হবে। পরপর কয়েকটি রেডিও সাক্ষাৎকারে গত বুধ ও বৃহস্পতিবার এই মন্তব্য করেন ইসরাইলের প্রবাসীবিষয়ক মন্ত্রী আমিচাই চিকলি।
এ সময় তিনি বলেন, মধ্যপ্রাচ্যে একটি ‘কট্টর সুন্নিদের অশুভ অক্ষ’ মাথা চাড়া দিয়ে উঠেছে। সিরিয়ার প্রেসিডেন্ট আহমেদ আল-শারার সরকারের দিকে ইঙ্গিত করে কট্টর ডানপন্থি এই মন্ত্রী বলেন, আইএস ও আল-কায়েদার আদর্শে পুষ্ট কোনো জিহাদি সরকার কখনো ইসরাইলের পাশে শান্তিতে বসবাস করতে পারে না। এদের মূল লক্ষ্যই হলো জেরুজালেম দখল করা।
বৃহস্পতিবার ইসরাইলের আর্মি রেডিওতে দেওয়া সাক্ষাৎকারে চিকলি তার দৃষ্টিতে নতুন গড়ে ওঠা এক ইসরাইলবিরোধী জোটের রূপরেখা তুলে ধরেন। পাকিস্তান, তুরস্ক ও কাতারকে নিয়ে গড়ে ওঠা এই জোটকে তিনি ইরান ও আমেরিকার মধ্যকার যুদ্ধবিরতি চুক্তির চেয়েও অনেক বেশি বিপজ্জনক বলে মনে করছেন।
লিকুদ পার্টির এই মন্ত্রী স্বীকার করেন, আমেরিকার সঙ্গে চুক্তির মাধ্যমে ইরান বেশ কিছু বড় সাফল্য পেয়েছে। তবে তার মতে, এর চেয়েও বেশি উদ্বেগের বিষয় হলো মধ্যপ্রাচ্যে গড়ে ওঠা এই নতুন অক্ষ। চিকলির দাবি, আমেরিকা ও ইরানের মধ্যে সমঝোতায় বড় ভূমিকা রাখার পর থেকেই পাকিস্তান ও তুরস্ক এই জোটের অংশ হয়ে উঠেছে।
বৃহস্পতিবার কোল বারামা রেডিওতে দেওয়া আরেকটি সাক্ষাৎকারে এই নতুন জোটে কাতারের ভূমিকাও উল্লেখ করেন তিনি। উপসাগরীয় এই দেশটিকে তিনি আখ্যা দিয়েছেন ‘জিহাদিদের জনসংযোগ শাখা’ হিসেবে।
সারা বিশ্বেই ডানপন্থি রাজনীতিবিদ ও সরকারগুলোর সঙ্গে সুসম্পর্ক গড়ে তুলছেন আমিচাই চিকলি। এ সপ্তাহেই তিনি টমি রবিনসন নামক এক কট্টর ডানপন্থি ব্রিটিশ উসকানিদাতার পক্ষে সাফাই গেয়েছেন। রবিনসনের আসল নাম স্টিফেন ইয়াক্সলি-লেনন। রাশিয়া থেকে দেশে ফেরার পর যুক্তরাজ্যের পুলিশ তাকে আটকে দিয়ে তার ফোন বাজেয়াপ্ত করে।
এ ঘটনার সমালোচনা করে চিকলি বলেন, ব্রিটেনে প্রক্সি ইসলামি সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে সবচেয়ে জোরালো কণ্ঠস্বরটিকে এখন সন্ত্রাসবিরোধী আইনের বেড়াজালে হেনস্থা করা হচ্ছে। এভাবে চলতে থাকলে ব্রিটেন শিগগিরই ইউরোপের দ্বিতীয় ইসলামি প্রজাতন্ত্রে পরিণত হবে।
কোল বারামা রেডিওর সাক্ষাৎকারে ইসরাইলি এই মন্ত্রী বলেন, পাকিস্তান ও তুরস্ক হলো ভারত, গ্রিস ও সাইপ্রাসের ‘শত্রু’। এই তিনটি দেশই ইসরাইলের অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ মিত্র। তুরস্ক, কাতার ও পাকিস্তানের দিকে ইঙ্গিত করে বুধবার ১০৩ এফএম রেডিওতে চিকলি বলেন, চোখের সামনেই আমরা এক নতুন অক্ষশক্তির উত্থান দেখতে পাচ্ছি।
এই তথাকথিত জোটকে তিনি আখ্যা দিয়েছেন ‘কট্টরপন্থি সুন্নিদের অশুভ অক্ষ’ হিসেবে। তার ভাষ্য মতে, অতীতে আমরা যা কিছু দেখেছি, এটি তার চেয়েও বহুগুণ বেশি বিপজ্জনক। সাক্ষাৎকারে কাতার ও পাকিস্তানের নাম নিলেও চিকলি মনোযোগ ছিল মূলত তুরস্কের ওপর।
তুর্কি প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোগানের রূপকল্পকে তিনি ইসরাইলের জন্য ‘অত্যন্ত বিপজ্জনক সমীকরণ’ বলে মন্তব্য করেছেন। চিকলির দাবি, সিরিয়ায় আক্ষরিক অর্থেই এক ‘তুর্কি নিয়ন্ত্রিত রাজ্য’ গড়ে তুলেছে আঙ্কারা। ইরানের চেয়ে তুরস্ক ও সিরিয়া আমাদের জন্য দশ হাজার গুণ বেশি উদ্বেগের কারণ।
লিকুদ পার্টির এই মন্ত্রী এমন একসময়ে এ মন্তব্য করলেন, যখন তুরস্ক ও ইসরাইলের মধ্যে উত্তেজনার পারদ ক্রমেই চড়ছে। সম্প্রতি এরদোয়ান বলেছেন, সিরিয়া ও লেবাননে ইসরাইলের হামলা তুরস্কের নিরাপত্তার জন্য হুমকি। চলতি মাসের শুরুর দিকে তুর্কি প্রেসিডেন্ট বলেন, ইসরাইলকে থামাতেই হবে, এটি সমগ্র মানবতার দায়িত্ব। এর মধ্যেই আবার তুরস্কের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মুস্তাফা চিফতি সম্প্রতি জেরুজালেমকে ‘মুক্ত’ করা নিয়ে সরাসরি কথা বলেছেন।
তুরস্ককে ইসরাইলের জন্য হুমকি হিসেবে তুলে ধরা প্রথম নেতা নন চিকলি। গত সপ্তাহেই লিকুদ পার্টির আরেক আইনপ্রণেতা অ্যারিয়েল কেলনার তুরস্ককে সরাসরি ‘শত্রু রাষ্ট্র’ বলে আখ্যা দিয়েছেন। অন্যদিকে গত মাসে ইসরাইলের সংস্কৃতি ও ক্রীড়ামন্ত্রী মিকি বলেছেন, তুরস্ককে এবার শত্রু রাষ্ট্র হিসেবে গণ্য করতে হবে ইসরাইলের।
এর আগে গত ফেব্রুয়ারিতে ইসরাইলের সাবেক প্রধানমন্ত্রী নাফতালি বেনেটও তুরস্ককে শত্রু হিসেবে চিহ্নিত করার ইঙ্গিত দেন। এই বিরোধীদলীয় নেতা বলেন, তুরস্কই হলো নতুন ইরান। টানা আড়াই বছর ধরে চলা সংঘাতের পর ইসরাইলিরা কিছুটা শান্তির মুখ দেখতে পাবে কি না এমন প্রশ্নের জবাবে চিকলি বলেন, তিনিও সেই আশাই করেন; তবে সেই শান্তি খুব বেশি দিন টিকবে না।
চিকলির মতে, তুরস্কের ‘উচ্চাকাক্সক্ষা খুব স্পষ্ট’ এবং তারা প্রতিনিয়ত ইসরাইলের স্বার্থে আঘাত করছে। তবে তিনি এও বলেন, ইসরাইলের ‘আঙ্কারা দখল করার কোনো ইচ্ছা নেই’ বরং তুরস্ক ও সিরিয়ার সঙ্গে যুদ্ধ না হলে তিনি ‘খুব খুশি’ হবেন।
সময়ের আলো/জেডি