ইরানি আইন অমান্য করে হিজাব ছাড়াই কনসার্টে সংগীত পরিবেশন করার অভিযোগে দেশটির এক জনপ্রিয় নারী গায়িকাকে ৭৪টি দোররা বা চাবুক মারার রায় দিয়েছেন আদালত। সাজাপ্রাপ্ত ওই গায়িকার নাম পারাস্তু আহমদি।
সাজাপ্রাপ্ত গায়িকার পরিবারের এক ঘনিষ্ঠ সূত্র এবং ইরানের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যমের বরাতে এই চাঞ্চল্যকর তথ্য নিশ্চিত হওয়া গেছে। সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, সাম্প্রতিক যুদ্ধ-পরবর্তী পরিস্থিতিতে ইরানের বর্তমান রাজনৈতিক ব্যবস্থায় নারীদের ওপর ধর্মীয় বিধিনিষেধ আরও কঠোর হওয়ারই স্পষ্ট ইঙ্গিত দিচ্ছে এই রায়।
জানা গেছে, গত সপ্তাহে ইরানের কোম প্রদেশের একটি রুদ্ধদ্বার আদালতে পারাস্তু আহমদি এবং তার ব্যান্ডের আরও আটজন সদস্য ও কলাকুশলীকে এই সাজা শোনানো হয়। মূলত ২০২৪ সালের একটি কনসার্টে ইরানি আইন অমান্য করে হিজাব ছাড়া, চুল ও হাত খোলা রেখে পারফর্ম করেছিলেন পারাস্তু। পরবর্তীতে ইউটিউবে সেই পারফর্ম্যান্সের ভিডিও ব্যাপকভাবে ভাইরাল হলে তাদের বিরুদ্ধে আইনি পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়।
আদালত কেবল দোররা মারার নির্দেশই দেননি, সেই সঙ্গে আগামী দুই বছরের জন্য পারাস্তু ও তার সহকর্মীদের সব ধরনের পারফর্ম্যান্স এবং দেশ ছাড়ার ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করেছেন। নাম প্রকাশ না করার শর্তে দণ্ডপ্রাপ্ত গায়িকার পরিবারের এক সদস্য জানিয়েছেন, রায় ঘোষণার সময় অভিযুক্ত নয়জনের মধ্যে দুজন ব্যক্তি ইরানে উপস্থিত ছিলেন না।
সম্প্রতি মধ্যপ্রাচ্যে হাজার হাজার মানুষের প্রাণহানি এবং বৈশ্বিক অর্থনীতিতে ধস নামানো মাসব্যাপী এক রক্তক্ষয়ী সংঘাতের পর, ইরান ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র একটি যুদ্ধবিরতি চুক্তিতে সম্মত হয়েছে।
নরওয়েভিত্তিক মানবাধিকার সংগঠন ‘ইরান হিউম্যান রাইটস’-এর পরিচালক মাহমুদ আমিরি-মোগাদ্দাম এই রায়ের তীব্র নিন্দা জ্ঞাপন করেছেন। তিনি বলেন, এই সাজা যেমন অমানবিক ও অপমানজনক, তেমনি এটি একটি বিপজ্জনক সংকেত যে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সাথে শান্তি চুক্তির পর বর্তমান শাসনব্যবস্থা দেশের নারীদের ওপর দমনপীড়ন আরও বাড়িয়ে দিতে পারে।
উল্লেখ্য, চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি মাসে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের যৌথ সামরিক হামলায় ইরানের শীর্ষ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনিসহ বেশ কয়েকজন গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিত্ব নিহত হন। খামেনির মৃত্যুর পর তার ছেলে মোজতবা খামেনি শীর্ষ নেতার স্থলাভিষিক্ত হন এবং ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পসের (আইআরজিসি) কট্টরপন্থী নেতারা দেশটির শাসনভার নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নেন। ফলে যুদ্ধ শেষ হলেও ইরানের নতুন শাসনব্যবস্থা কোনো ধরনের শিথিলতার দিকে যায়নি।
এর আগে ২০২২ সালে কুর্দি তরুণী মাহসা আমিনির মৃত্যুর ঘটনাকে কেন্দ্র করে ইরানে নারীদের অধিকার নিয়ে একটি বড় ধরনের গণআন্দোলন গড়ে উঠেছিল। ‘নারী, জীবন, স্বাধীনতা’ স্লোগানের সেই আন্দোলনের পর থেকে দেশটির অনেক নারীই বাধ্যতামূলক হিজাব আইন অমান্য করতে শুরু করেন। সেই আন্দোলনের প্রেক্ষাপটেই গায়িকা পারাস্তু আহমদি কালো পোশাক পরে একটি দেশাত্মবোধক গান গেয়ে ভিডিওটি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে আপলোড করেছিলেন।
ভিডিওর ক্যাপশনে তিনি লিখেছিলেন, ‘আমি পারাস্তু, এমন এক মেয়ে যে নিজের ভালোবাসার মানুষের জন্য গাইতে চায়। এটি এমন এক অধিকার যা আমি উপেক্ষা করতে পারি না।’ এই ভিডিওটি প্রকাশের পর তাকে সাময়িকভাবে আটকও করা হয়েছিল।
সময়ের আলো/আরবিএন