সিলেট নগরীর প্রধান সড়ক থেকে শুরু করে পাড়া-মহল্লা, গলি ও উপগলিতে এখন মরণফাঁদে পরিণত হয়েছে যত্রতত্র গড়ে ওঠা অবৈধ গতিরোধক বা স্পিডব্রেকার। সড়ক আইনের কোনো রকম তোয়াক্কা না করেই বিভিন্ন বেসরকারি প্রতিষ্ঠান, ব্যবসায়ী ও স্থানীয় প্রভাবশালীরা নিজেদের খেয়ালখুশিমতো হাজারখানেক স্পিডব্রেকার তৈরি করেছেন নগরীজুড়ে। প্রধান সড়কের কোনোটিতেই নেই দূর থেকে চেনার মতো কোনো রং বা নির্দেশক চিহ্ন। ফলে প্রতিনিয়ত বাড়ছে মারাত্মক সড়ক দুর্ঘটনার ঝুঁকি, পঙ্গুত্ববরণ করছেন অনেকেই।
সিলেট সিটি করপোরেশন (সিসিক) ও ট্রাফিক বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, প্রধান সড়কগুলোতে এই ধরনের অননুমোদিত গতি নিরোধকগুলো দ্রুত চিহ্নিত করে অপসারণের উদ্যোগ নেওয়া জরুরি। অনুমোদনহীন ও অপরিকল্পিত স্পিডব্রেকার নিয়ে সিলেট নগরজুড়ে তীব্র ক্ষোভের মুখে নড়েচড়ে বসেছে সংশ্লিষ্ট প্রশাসন।
এ বিষয়ে জানার জন্য যোগাযোগ করা হলে সিলেট মেট্রোপলিটন পুলিশের উপকমিশনার (ট্রাফিক) সুদীপ্ত রায় বলেন, সড়ক দুর্ঘটনা রোধ এবং ট্রাফিক ব্যবস্থায় শৃঙ্খলা ফেরাতে ইতিমধ্যে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া শুরু হয়েছে। স্পিডব্রেকার ও সড়কের নিরাপত্তা নিয়ে আমাদের সঙ্গে সিলেট সিটি করপোরেশনের বৈঠক হয়েছে। সিলেট মেট্রোপলিটন পুলিশের উপকমিশনার (ট্রাফিক) সুদীপ্ত রায় আরও বলেন, নগরীর সড়কগুলো প্রশস্তকরণ, পর্যাপ্ত সড়কবাতি স্থাপন এবং ঝুঁকিপূর্ণ স্পিডব্রেকারগুলোতে জরুরি ভিত্তিতে রং করার জন্য আমরা সিসিককে আনুষ্ঠানিক চিঠি দিয়েছি।
অন্যদিকে সড়ক সংস্কার ও রোড মার্কিংয়ের চলমান কাজ নিয়ে সিলেট সিটি করপোরেশনের (সিসিক) প্রশাসক আবদুল কাইয়ুম চৌধুরী আশ্বস্ত করে বলেন, নগরবাসীর নিরাপদ যাতায়াত নিশ্চিত করতে এবং অননুমোদিত গতি নিরোধকগুলোর ঝুঁকি কমাতে আমাদের কাজ চলছে।
বাংলাদেশ সরকারের সড়ক পরিবহন আইন-২০১৮ এবং সড়ক ও জনপথ (সওজ) বিভাগের স্পিডব্রেকার নির্মাণ নীতিমালায় স্পষ্ট করে এই ধরনের অবৈধ স্থাপনাকে শাস্তিযোগ্য অপরাধ হিসেবে গণ্য করা হয়েছে। সড়ক পরিবহন আইন, ২০১৮-এর ৩৭ নম্বর ধারা অনুযায়ী যথাযথ কর্তৃপক্ষের অনুমতি ছাড়া মহাসড়ক বা কোনো সড়কের উন্নয়ন, রক্ষণাবেক্ষণ বা সড়ক নিরাপত্তার স্বার্থ ব্যাহত করে এমন কোনো স্থায়ী বা অস্থায়ী স্থাপনা বা প্রতিবন্ধকতা তৈরি করা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ।
একই আইনের ৮২ নম্বর ধারার (১) উপধারা অনুযায়ী, কোনো ব্যক্তি যদি এই বিধান লঙ্ঘন করে সড়কে অবৈধ প্রতিবন্ধকতা (যেমন অননুমোদিত স্পিডব্রেকার) তৈরি করেন তবে তা দণ্ডনীয় অপরাধ। এর জন্য দোষী ব্যক্তি অনধিক ২ (দুই) বছরের কারাদণ্ড বা স্থায়ী স্থাপনার ক্ষেত্রে অনধিক ৫ (পাঁচ) লাখ টাকা এবং অস্থায়ী স্থাপনার ক্ষেত্রে অনধিক ৫০ (পঞ্চাশ) হাজার টাকা অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হবেন।
আইনের ৪২ ধারা অনুযায়ী, সড়ক ব্যবহারকারীদের নিরাপত্তার জন্য সড়কে ট্রাফিক সাইন, সংকেত বা রোড মার্কিং থাকা বাধ্যতামূলক। স্পিডব্রেকারের ক্ষেত্রে অন্তত ৫০ থেকে ১০০ মিটার আগে সতর্কীকরণ সাইনবোর্ড এবং স্পিডব্রেকারের গায়ে সাদা-হলুদ রঙে মার্কিং থাকা জরুরি। ৮৫ ধারা অনুযায়ী, এই বিধি লঙ্ঘন বা রোড সেফটি প্রোটোকল না মানা দণ্ডনীয় অপরাধ। এই ধারার উপধারা অনুযায়ী, সড়কে এমন কোনো প্রতিবন্ধকতা তৈরি করা যাবে না যা চালক, যাত্রী বা পথচারীর জীবনের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে।
সড়ক ও জনপথ বিভাগের আন্তর্জাতিক মানদণ্ড আইআরস স্ট্যান্ডার্ড অনুযায়ী, যেকোনো গতি নিরোধকের উচ্চতা সর্বোচ্চ ৩ থেকে ৪ ইঞ্চির বেশি হওয়া যাবে না এবং এর ঢাল হতে হবে পর্যাপ্ত চওড়া। কিন্তু সিলেটের পাড়া-মহল্লায় সিমেন্ট ও ইট দিয়ে এমন সব উঁচু ও খাড়া স্পিডব্রেকার দেওয়া হয়েছে, যা ছোট যানবাহনের নিচের অংশ ক্ষতিগ্রস্ত করছে এবং গর্ভবতী নারী ও গুরুতর অসুস্থ রোগীদের জন্য অবর্ণনীয় কষ্টের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
অনুসন্ধানে দেখা গেছে, সিলেট নগরীর টিলাগড়, মীরবক্সটুলা, আম্বরখানা, শিবগঞ্জ, উপশহরসহ বিভিন্ন প্রধান সড়ক এবং এর সংলগ্ন উপগলিগুলোতে নিয়মনীতিহীনভাবে স্পিডব্রেকার বসানো হয়েছে।
আইন অনুযায়ী গতি নিরোধক দেওয়ার আগে যথাযথ কর্তৃপক্ষের অনুমতি নেওয়া এবং সেটিতে রিফ্লেক্টিভ (আলো প্রতিফলিত হয় এমন) রং করার বাধ্যবাধকতা থাকলেও সিলেটে তার চিত্র সম্পূর্ণ উল্টো। কালো পিচঢালা সড়কে কোনো রং বা সাদা জেব্রা ক্রসিং না থাকায় রাতের অন্ধকারে চালকরা স্পিডব্রেকার দেখতে পান না। হঠাৎ ব্রেক করতে গিয়ে বিশেষ করে মোটরসাইকেল ও সিএনজিচালিত অটোরিকশা উল্টে প্রায়ই দুর্ঘটনা ঘটছে।
সচেতন মহল মনে করছেন, প্রশাসনের এই উদ্যোগ প্রশংসনীয় হলেও তা দ্রুত বাস্তবায়ন করা জরুরি। কেবল স্পিডব্রেকারে রং করাই নয়, বরং আইন অমান্য করে যারা যত্রতত্র এসব মরণফাঁদ তৈরি করেছে, তাদের বিরুদ্ধে সড়ক পরিবহন আইন, ২০১৮-এর ৮২ ধারা অনুযায়ী কঠোর আইনি ব্যবস্থা না নিলে এই সংকট দূর করা সম্ভব হবে না। সচেতন নাগরিক মহলের মতে, স্থানীয় বিভিন্ন ক্লাব, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান বা ব্যক্তি বিশেষ নিজেদের বাড়ির সামনে গাড়ি ধীরে চালানোর অজুহাতে আইনি কর্তৃত্ব ছাড়াই এসব স্পিডব্রেকার বসিয়েছেন।
সময়ের আলো/আরবিএন