যে বিশ্বকাপ ছিল শুধুই ম্যারাডোনার

ক্রীড়া ডেস্ক

খেলা

বিশ্বকাপের এক একটি আসর থাকে একটি দলের, কিছু আসর থাকে একটি প্রজন্মের। আর কিছু বিশ্বকাপ চিরকাল একজন মানুষের নামে লেখা

2026-06-23T05:40:37+00:00
2026-06-23T05:40:37+00:00
 
  মঙ্গলবার, ২৩ জুন ২০২৬,
৯ আষাঢ় ১৪৩৩
মঙ্গলবার, ২৩ জুন ২০২৬
খেলা
যে বিশ্বকাপ ছিল শুধুই ম্যারাডোনার
ক্রীড়া ডেস্ক
প্রকাশ: মঙ্গলবার, ২৩ জুন, ২০২৬, ৫:৪০ এএম 
ফুটবল ইতিহাসের সবচেয়ে বিতর্কিত গোল এবং সবচেয়ে বিস্ময়কর গোলগুলোর একটি। সংগৃহীত ছবি
বিশ্বকাপের এক একটি আসর থাকে একটি দলের, কিছু আসর থাকে একটি প্রজন্মের। আর কিছু বিশ্বকাপ চিরকাল একজন মানুষের নামে লেখা থাকে। ১৯৮৬ সালের মেক্সিকো বিশ্বকাপ ছিল ঠিক তেমনই এক মহাকাব্য, যার প্রতিটি পৃষ্ঠা, প্রতিটি বাঁক আর প্রতিটি বিস্ময়ের কেন্দ্রে ছিলেন ডিয়েগো আরমান্দো ম্যারাডোনা। তিনি একই ম্যাচে ফুটবলকে যেমন স্বর্গীয় সৌন্দর্যের উচ্চতায় নিয়ে গেছেন, তেমনি বিতর্কের অন্ধকারেও ডুবিয়েছেন। যা নিয়ে এখনও হয় তীব্র আলোচনা-সমালোচনা। ইংল্যান্ডের বিপক্ষে মাত্র চার মিনিটের ব্যবধানে তিনি উপহার দিয়েছিলেন ফুটবল ইতিহাসের সবচেয়ে বিতর্কিত গোল এবং সবচেয়ে বিস্ময়কর গোলগুলোর একটি। একটিতে ছিল ‘ঈশ্বরের হাত’, অন্যটিতে যেন ছিল ঈশ্বর প্রদত্ত পায়ের জাদু। সেই ম্যাচই ম্যারাডোনাকে শুধু বিশ্বকাপজয়ী নায়ক নয়, ফুটবল নামের শিল্পের সবচেয়ে রহস্যময়, সবচেয়ে আলোচিত এবং সবচেয়ে অমর চরিত্রে পরিণত করেছিল।

সেই ম্যাচ নিয়ে ফুটবল লেখক ব্রায়ান গ্ল্যানভিলে লিখেছিলেন, ‘এটি চিরকাল ম্যারাডোনার বিশ্বকাপ হিসেবেই স্মরণীয় থাকবে। এমন একসময়ে, যখন রক্ষণাত্মক ফুটবলেই ছিল প্রাধান্য, ম্যারাডোনা প্রমাণ করেছিলেন যে প্রতিভাবান একজন ফুটবলার একাই সব বাধা অতিক্রম করতে পারেন।’

মেক্সিকোয় আর্জেন্টিনা সাতটি ম্যাচ খেলেছিল। তবে সবচেয়ে স্মরণীয় ছিল পঞ্চম ম্যাচটি, কোয়ার্টার ফাইনালে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে লড়াই। এই ম্যাচটি শুধু ফুটবলীয় প্রতিদ্বন্দ্বিতার ছিল না। এর পেছনে ছিল ১৯৮২ সালের ৭৪ দিনের রক্তক্ষয়ী ফকল্যান্ডস যুদ্ধ, যা আর্জেন্টিনা ও যুক্তরাজ্যের মানুষের মনে তীব্র ক্ষত তৈরি করেছিল। লেখক পল হাওয়ার্ড লিখেছিলেন, ‘টেলিভিশনে প্রচারিত যুদ্ধের ভয়াবহ দৃশ্য দুই দেশের মানুষের চেতনাকে গভীরভাবে নাড়া দিয়েছিল।’ বহু বছর পর নিজের আত্মজীবনীতে ম্যারাডোনা লিখেছিলেন, ‘ম্যাচের আগে আমরা বলেছিলাম, ফুটবলের সঙ্গে মালভিনাস যুদ্ধের কোনো সম্পর্ক নেই। কিন্তু আমরা জানতাম, সেখানে অনেক আর্জেন্টাইন তরুণ প্রাণ হারিয়েছে।’


মেক্সিকো সিটির এস্তেতাদিও আজতেকাতে প্রায় ১ লাখ ১৫ হাজার দর্শকের সামনে অনুষ্ঠিত সেই ম্যাচ চিরস্মরণীয় হয়ে আছে দুটি গোলের জন্য, যা যেন ম্যারাডোনার পুরো জীবনকেই প্রতিফলিত করে। ৫১তম মিনিটে তিনি ইংল্যান্ড গোলরক্ষক পিটার শিটনের মাথার ওপর দিয়ে হাত দিয়ে বল জালে পাঠান। পরে এই গোলের নাম হয়ে যায় ‘হ্যান্ড অব গড’। কারও কাছে এটি ছিল স্পষ্ট প্রতারণা, আবার কারও কাছে ছিল অবিশ্বাস্য চাতুর্যের এক নিদর্শন।

কিন্তু মাত্র চার মিনিট পর যা ঘটল, তা ফুটবল ইতিহাসের সবচেয়ে সুন্দর দৃশ্যগুলোর একটি। নিজেদের অর্ধ থেকে বল পেয়ে ম্যারাডোনা একে একে ইংল্যান্ডের ডিফেন্ডারদের কাটিয়ে এগিয়ে যান। তার পায়ের সঙ্গে বলের সম্পর্ক যেন ছিল অলৌকিক। কয়েক সেকেন্ডের সেই দৌড়ে তিনি পুরো ইংল্যান্ড রক্ষণভাগকে ধ্বংসস্তূপে পরিণত করে গোল করেন।

সেই মুহূর্তে বিবিসি রেডিও ধারাভাষ্যকার ব্রায়ন বাটলার বলেছিলেন, ‘ম্যারাডোনা ছোট্ট এক ঈগলের মতো ঘুরে দাঁড়ালেন, বিপদ থেকে বেরিয়ে এলেন। তিনি বুচারকে পেছনে ফেললেন, ফেনউইককে মৃতের মতো ফেলে গেলেন...তারপর গোল! এ কারণেই ম্যারাডোনা বিশ্বের সেরা খেলোয়াড়। তিনি ইংল্যান্ডের রক্ষণভাগকে কবর দিয়ে দিলেন!’

গ্রে লিকার পরে ইংল্যান্ডের হয়ে একটি গোল শোধ করলেও তাতে ফল বদলায়নি। আর্জেন্টিনা ২-১ ব্যবধানে জিতে সেমিফাইনালে উঠে যায়। সেখানে বেলজিয়ামকে হারিয়ে ফাইনালে পৌঁছায় তারা।

ফাইনালে ওয়েস্ট জার্মানির বিপক্ষে ম্যারাডোনাকে কঠোরভাবে মার্ক করা হয়েছিল। তবু তিনি জয়সূচক গোলের পাস বাড়িয়ে দেন জর্জ বুরুচাগাকে, যা আর্জেন্টিনাকে দ্বিতীয়বারের মতো বিশ্বকাপ শিরোপা এনে দেয়।

সেই বিশ্বকাপে থাকা ইংল্যান্ডের কোচ ববি রবসন পরে বলেছিলেন, ‘ম্যারাডোনা না থাকলে আর্জেন্টিনার বিশ্বকাপ জয়ের কোনো সম্ভাবনাই ছিল না। তিনি এতটাই মহান ছিলেন।’

১৯৮৬ সালের বিশ্বকাপ তাই কেবল একটি টুর্নামেন্ট নয়, এক মানুষের অসম্ভব প্রতিভার উপাখ্যান। সেখানে ছিল জাদু, বিতর্ক, প্রতারণা, প্রতিভা, আবেগ আর অমরত্ব। আর সেই উপাখ্যানের কেন্দ্রবিন্দুতে ছিলেন একজনই, ডিয়েগো আরমান্দো ম্যারাডোনা। ফুটবল ইতিহাসে যার মতো করে আর কেউ কখনো বিশ্বকাপকে নিজের করে নিতে পারেননি।

সময়ের আলো / আরবিএন 



  বিষয়:   ম্যারাডোনা  বিশ্বকাপ 


Loading...
Loading...
খেলা- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: