১৯ বছরে ৪ হাজার তালবীজ বুনেছেন তাজ উল ইসলাম

রানা আহমেদ

ফিচার

ভোরের আলো ফোটার সঙ্গে সঙ্গে কেরানীগঞ্জের কোন্ডা ইউনিয়নের রাস্তা ধরে হাঁটলে চোখে পড়ে একের পর এক মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে

2026-06-23T17:02:01+00:00
2026-06-23T17:02:01+00:00
 
  মঙ্গলবার, ২৩ জুন ২০২৬,
৯ আষাঢ় ১৪৩৩
মঙ্গলবার, ২৩ জুন ২০২৬
ফিচার
১৯ বছরে ৪ হাজার তালবীজ বুনেছেন তাজ উল ইসলাম
রানা আহমেদ
প্রকাশ: মঙ্গলবার, ২৩ জুন, ২০২৬, ৫:০২ পিএম 
মো. তাজ-উল ইসলাম চৌধুরী। ছবি : সময়ের আলো
ভোরের আলো ফোটার সঙ্গে সঙ্গে কেরানীগঞ্জের কোন্ডা ইউনিয়নের রাস্তা ধরে হাঁটলে চোখে পড়ে একের পর এক মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে থাকা তালগাছ। পথের দুই পাশে সবুজের এই দীর্ঘ সারি যেন নিঃশব্দে বলে যায় একজন মানুষের দীর্ঘদিনের শ্রম, ধৈর্য ও প্রকৃতির প্রতি ভালোবাসার গল্প, যিনি ১৯ বছরে ৪ হাজার তালবীজ বুনেছেন।

সেই মানুষটির নাম মো. তাজ-উল ইসলাম চৌধুরী। পেশায় স্কুল শিক্ষক। তিনি কেরানীগঞ্জ উপজেলার কোন্ডা ইউনিয়নের ব্রাহ্মণগাঁও এলাকার বাসিন্দা। ছাত্রাবস্থায় ১৯৯৮ সালে নিজ এলাকায় তিনি প্রতিষ্ঠা করেন নূতন কুঁড়ি স্কুল। তবে শুধু শিক্ষকতা পেশায় সীমাবদ্ধ থাকেননি তাজ-উল ইসলাম। শিক্ষকতার পাশাপাশি নিয়মিত বিভিন্ন ধরনের ফলদ, বনজ ও ঔষধি গাছের চারা রোপণ করেন তিনি। তবে তিনি সবচেয়ে বেশি রোপণ করেছেন তাল বীজ। এমনকি মৌসুম অনুযায়ী গাছের চারা রোপণে জনসাধারণকে উদ্বুদ্ধ করতে নানা ধরনের ক্যাম্পেইনও করে থাকেন এই শিক্ষক। 


২০০৮ সাল থেকে তিনি তাল বীজ রোপণ করা শুরু করেন। ২০২৫ সাল পর্যন্ত প্রায় ১৯ বছরে ৪ হাজার তাল বীজ রোপণ করেছেন। নিজের উদ্যোগে তালবীজ সংগ্রহ করে রাস্তার ধারে, খোলা জমিতে ও বিভিন্ন উপযুক্ত স্থানে বুনে চলেছেন। কোনো প্রকল্পের অংশ হিসেবে নয়, কোনো প্রাতিষ্ঠানিক সহায়তা ছাড়াই; শুধুই পরিবেশের প্রতি দায়বদ্ধতা থেকে। 

তাজ-উল ইসলাম বলেন, ‘একসময় গ্রামাঞ্চলে প্রচুর তালগাছ দেখা যেত। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সেই সংখ্যা কমতে থাকে। তালগাছের পরিবেশগত গুরুত্ব এবং বজ্রপাত প্রতিরোধে এর ভূমিকা সম্পর্কে জানার পর আমি নতুন করে তালগাছ ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ নিই।’

তার লাগানো ৪ হাজার বীজ থেকে বর্তমানে এলাকায় ছোট-বড় মিলিয়ে প্রায় চার শতাধিক তালগাছ মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে। অনেক গাছ ইতোমধ্যে পূর্ণতা পেয়েছে, কিছু গাছে ধরেছে ফলও। স্থানীয়দের কাছে এসব গাছ এখন শুধু গাছ নয়, একজন মানুষের নিষ্ঠা ও ভালোবাসার জীবন্ত স্মারক।


স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, তাজ-উল ইসলামের এই উদ্যোগ তাদেরও অনুপ্রাণিত করেছে। তার দেখাদেখি অনেকেই নিজ নিজ এলাকায় গাছ লাগাতে শুরু করেছেন। ফলে ধীরে ধীরে বদলাচ্ছে এলাকার পরিবেশ ও প্রাকৃতিক দৃশ্যপট।

গ্রামের প্রবীণ বাসিন্দাদের ভাষ্য, কয়েক বছর আগেও অনেক রাস্তার পাশে তেমন কোনো গাছ ছিল না। এখন তালগাছের সারি পথচারীদের ছায়া দেয়, বাড়িয়েছে সৌন্দর্য, একইসঙ্গে ফিরিয়ে এনেছে গ্রামের চিরচেনা আবহ।

কোন্ডা ইউনিয়ন পরিষদের সচিব মোহাম্মদ ইফতেখারুল ইসলাম বলেন, ‘এই উদ্যোগ সত্যিই প্রশংসার দাবিদার। তিনি দীর্ঘদিন ধরে ব্যক্তিগত প্রচেষ্টায় তালবীজ রোপণ করে পরিবেশ সংরক্ষণে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখে চলেছেন। কোন্ডা ইউনিয়ন পরিষদ প্রাঙ্গণেও তার লাগানো বেশ কয়েকটি তালগাছ রয়েছে, যেগুলো এখন বড় হয়েছে এবং নিয়মিত ফল দিচ্ছে। তালগাছ শুধু পরিবেশের সৌন্দর্য বৃদ্ধি করে না, এটি বজ্রপাতের ঝুঁকি কমাতেও সহায়ক ভূমিকা রাখে। একজন শিক্ষক হিসেবে তিনি যেমন শিক্ষার্থীদের জ্ঞান দিচ্ছেন, তেমনি সমাজকে পরিবেশ রক্ষারও শিক্ষা দিচ্ছেন। আমরা মনে করি, তার এই উদ্যোগ অন্যদের জন্যও অনুকরণীয়।’


স্থানীয় বাসিন্দা মো. আনোয়ার হোসেন বলেন, ‘আমি প্রতিদিন এই রাস্তা দিয়ে চলাচল করি। কয়েক বছর আগেও এখানে এত গাছপালা ছিল না। এখন রাস্তার দুই পাশে সারি সারি তালগাছ দেখতে খুবই ভালোলাগে। গরমের সময় এসব গাছের ছায়ায় কিছুটা স্বস্তি পাওয়া যায়। সবচেয়ে ভালো বিষয় হলো, একজন মানুষ নিজের উদ্যোগে এতগুলো গাছ লাগিয়ে এলাকাকে সবুজ করে তুলেছেন। তার মতো আরও মানুষ এগিয়ে এলে আমাদের পরিবেশ অনেক সুন্দর ও নিরাপদ হবে।’

তাজ-উল ইসলাম বলেন, ‘আমার সবচেয়ে বড় আনন্দ হয় যখন দেখি মানুষ আমার লাগানো গাছের ছায়ায় দাঁড়িয়ে বিশ্রাম নিচ্ছে। গাছে ফল এলে মনে হয়, আমার শ্রম সার্থক হয়েছে।’

পুরস্কার বা স্বীকৃতির চেয়ে প্রকৃতির প্রতি দায়বদ্ধতাকেই বড় করে দেখেন এই শিক্ষক। তার বিশ্বাস, পরিবেশ রক্ষার জন্য সব সময় বড় কোনো উদ্যোগের প্রয়োজন হয় না। একজন মানুষও চাইলে একটি জনপদের চেহারা বদলে দিতে পারেন। কেরানীগঞ্জের কোন্ডা ইউনিয়নের পথঘাটে দাঁড়িয়ে থাকা শত শত তালগাছ যেন সেই বিশ্বাসেরই নীরব সাক্ষী। একজন শিক্ষকের হাতে বপন করা বীজ আজ শুধু গাছে পরিণত হয়নি, ছড়িয়ে দিয়েছে পরিবেশ সচেতনতার এক অনুকরণীয় বার্তা।

সময়ের আলো/মহু


  বিষয়:   তালবীজ  তাজ উল ইসলাম  তাল  তালগাছ  কেরানীগঞ্জ 


Loading...
Loading...
ফিচার- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: