মাঠে ১২০ মিনিটের রক্তক্ষয়ী লড়াইয়েও যখন ফয়সালা হয় না, তখন ফুটবল ম্যাচ গড়ায় পেনাল্টি শুটআউটে। আর এই টাইব্রেকার মানেই স্নায়ুর চরম পরীক্ষা, যেখানে দক্ষতার পাশাপাশি ভাগ্য বা কয়েন টস একটা বড় ভূমিকা পালন করে। তবে এবার টাইব্রেকারের এই ভাগ্যনির্ধারণী নিয়মেই এক যুগান্তকারী পরিবর্তন আনতে যাচ্ছে বিশ্ব ফুটবলের নিয়ন্ত্রক সংস্থা ফিফা। সবকিছু ঠিকঠাক থাকলে আগামী ২৮ জুন শুরু হতে যাওয়া বিশ্বকাপের নকআউট পর্ব থেকেই দেখা যেতে পারে নতুন এই নিয়ম। টুর্নামেন্ট চলাকালীনই এমন বড় পরিবর্তনের সম্ভাবনা নিয়ে এখন ফুটবল বিশ্বে জোর আলোচনা চলছে।
বর্তমান নিয়ম অনুযায়ী, টাইব্রেকার শুরুর আগে রেফারিকে দুবার কয়েন টস করতে হয়। প্রথম টসে বিজয়ী দল বেছে নেয় তারা আগে শট নেবে নাকি পরে। আর দ্বিতীয় টসে নির্ধারিত হয় মাঠের কোন প্রান্তের গোলপোস্টে শট নেওয়া হবে। সমস্যাটা মূলত এখানেই। বর্তমান নিয়মে কোনো দল যদি চরম দুর্ভাগা হয়, তবে তারা পরপর দুটি টসেই হেরে যেতে পারে। আর তখনই তৈরি হয় চরম এক অসমতা। একদিকে যেমন তারা আগে শট নেওয়ার মনস্তাত্ত্বিক সুবিধা থেকে বঞ্চিত হয়, অন্যদিকে প্রতিপক্ষের গ্যালারির সামনে শট নেওয়ার বাড়তি চাপও মাথায় চেপে বসে।
একেবারে তরতাজা এক উদাহরণ দেওয়া যাক। গত মাসেই উয়েফা চ্যাম্পিয়নস লিগের ফাইনালে এই নির্মম ভাগ্যের শিকার হয়েছিল ইংলিশ ক্লাব আর্সেনাল। পিএসজির বিপক্ষে দুটি টসেই হেরে বসে তারা। একদিকে আগে শট নেওয়ার সুযোগ হাতছাড়া, অন্যদিকে পিএসজি সমর্থকদের গ্যালারির সামনে শট নেওয়ার মানসিক চাপ, সব মিলিয়ে টাইব্রেকার শুরুর আগেই যেন মানসিকভাবে পিছিয়ে পড়ে গানার্সরা। শেষ পর্যন্ত ম্যাচটিতে হেরে শিরোপাও খোয়াতে হয় তাদের। এ ধরনের পরিস্থিতি এড়াতেই পরিবর্তনের কথা ভাবছে ফিফা। ব্রিটিশ গণমাধ্যম দ্য টাইমস জানিয়েছে, এ নিয়ে ইতিমধ্যে ফুটবলের আইন প্রণয়ন সংস্থা ইন্টারন্যাশনাল ফুটবল অ্যাসোসিয়েশন বোর্ডের সঙ্গে আলোচনা করেছে তারা।
কোনো একটি দল যেন দুটি সুবিধাই একচেটিয়া লুফে নিতে না পারে, সেজন্যই ফিফার এই নতুন ভাবনা। প্রস্তাবিত নতুন নিয়ম অনুযায়ী, কয়েন টস হবে মাত্র একবার। টসে যে দল জিতবে, তারা দুটি সুবিধার মধ্যে কেবল একটি বেছে নেওয়ার সুযোগ পাবে। হয় তারা আগে শট নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেবে, নয়তো নিজেদের সমর্থকদের গ্যালারির সামনের গোলপোস্টটি বেছে নেবে। বিজয়ী দল যেটি ছেড়ে দেবে, টসে হারা দল স্বয়ংক্রিয়ভাবে সেই সুবিধাটি পেয়ে যাবে। অর্থাৎ, কেউ আর খালি হাতে ফিরবে না।
ফুটবলীয় গবেষণায় দেখা গেছে, টাইব্রেকারে যারা আগে শট নেয়, তাদের জেতার সম্ভাবনা তুলনামূলক অনেক বেশি থাকে। এর কারণ, প্রথমে গোল করে প্রতিপক্ষকে সারাক্ষণ একটা মনস্তাত্ত্বিক চাপের মুখে রাখা যায়। আবার উল্টোদিকে, নিজেদের চেনা গ্যালারি আর সমর্থকদের গগনবিদারী চিৎকার ফুটবলারদের আত্মবিশ্বাস বাড়াতে দারুণ টনিক হিসেবে কাজ করে। ফিফা মনে করছে, দুটি সুবিধাই যখন এক দল পেয়ে যায়, তখন খেলা শুরুর আগেই অপর দলটির পিঠ দেয়ালে ঠেকে যায়। এই বৈষম্য দূর করতেই এক টস নীতি নিয়ে আসা হচ্ছে।
অবশ্য কাগজের কলমের হিসাব আর মাঠের আবেগ সবসময় এক রেখায় চলে না। টস জিতলেই যে ম্যাচ জেতা যায় না, তার সবচেয়ে বড় উদাহরণ ২০২২ কাতার বিশ্বকাপের ফাইনাল। সেবার টাইব্রেকারে আগে শট নেওয়ার এবং নিজেদের পছন্দের গোলপোস্ট বেছে নেওয়ার, দুটি সুবিধাই পেয়েছিল ফ্রান্স। কিন্তু শেষ পর্যন্ত টাইব্রেকার জিতে শেষ হাসি হেসেছিল আর্জেন্টিনাই। ফুটবল রোমাঞ্চের এই নতুন নিয়ম শেষ পর্যন্ত বাস্তবায়িত হবে কি না, তা জানা যাবে আগামী দু-এক দিনের মধ্যেই।
সময়ের আলো/আরবিএন