৯ মাস পরও অপূর্ণ জাকসুর নির্বাচনি প্রতিশ্রুতি, প্রশ্নের মুখে ইশতেহার বাস্তবায়ন

হাবিবুর রহমান সাগর, জাবি প্রতিনিধি

শিক্ষা

দীর্ঘ ৩৩ বছর পর জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় শিক্ষার্থী সংসদ (জাকসু) নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ায় শিক্ষার্থীদের মধ্যে তৈরি হয়েছিল ব্যাপক উৎসাহ ও

2026-06-24T23:23:14+00:00
2026-06-24T23:23:14+00:00
 
  বৃহস্পতিবার, ২৫ জুন ২০২৬,
১১ আষাঢ় ১৪৩৩
বৃহস্পতিবার, ২৫ জুন ২০২৬
শিক্ষা
৯ মাস পরও অপূর্ণ জাকসুর নির্বাচনি প্রতিশ্রুতি, প্রশ্নের মুখে ইশতেহার বাস্তবায়ন
হাবিবুর রহমান সাগর, জাবি প্রতিনিধি
প্রকাশ: বুধবার, ২৪ জুন, ২০২৬, ১১:২৩ পিএম 
সংগৃহীত ছবি
দীর্ঘ ৩৩ বছর পর জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় শিক্ষার্থী সংসদ (জাকসু) নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ায় শিক্ষার্থীদের মধ্যে তৈরি হয়েছিল ব্যাপক উৎসাহ ও প্রত্যাশা। নির্বাচনের আগে বিভিন্ন প্যানেলের ঘোষিত ইশতেহারে শিক্ষার্থী কল্যাণ, একাডেমিক সংস্কার, পরিবহন সুবিধা, আবাসন, স্বাস্থ্যসেবা, পরিবেশ সংরক্ষণ এবং প্রশাসনিক আধুনিকায়নের নানা প্রতিশ্রুতি উঠে আসায় অনেকেই মনে করেছিলেন, জাকসুর মাধ্যমে ক্যাম্পাসে ইতিবাচক পরিবর্তনের নতুন অধ্যায় শুরু হবে। কিন্তু দায়িত্ব গ্রহণের প্রায় নয় মাস পর সেই প্রত্যাশার সঙ্গে বাস্তবতার ব্যবধান নিয়ে শিক্ষার্থীদের মধ্যে বাড়ছে অসন্তোষ ও প্রশ্ন।

গত বছরের ১১ সেপ্টেম্বর অনুষ্ঠিত জাকসু নির্বাচনে ২৫টি পদের মধ্যে ২০টিতে বিজয়ী হয় ছাত্রশিবির-সমর্থিত সমন্বিত শিক্ষার্থী জোট। নির্বাচনি প্রচারণায় তারা ‘৫ ইয়েস’ স্লোগানের মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের সামনে একগুচ্ছ প্রতিশ্রুতি তুলে ধরে। এর মধ্যে ছিল ডাইনিং ভর্তুকি চালু, পরিবহন ব্যবস্থার উন্নয়ন, প্রশাসনিক কার্যক্রমে অটোমেশন, শিক্ষার্থীদের জন্য উন্নত স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিতকরণ, মা শিক্ষার্থীদের জন্য ব্রেস্ট ফিডিং কর্নার স্থাপন, পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য রক্ষা এবং নিরাপদ ক্যাম্পাস গড়ে তোলা।

অন্যদিকে, বর্তমান ভিপি আব্দুর রশিদ জিতুর নেতৃত্বাধীন স্বতন্ত্র শিক্ষার্থী সম্মিলনও নির্বাচনি ইশতেহারে একাডেমিক ও প্রশাসনিক সংস্কারের নানা অঙ্গীকার করেছিল। তাদের প্রতিশ্রুতির মধ্যে ছিল লেজুড়বৃত্তিক ছাত্ররাজনীতি বন্ধ, শিক্ষক মূল্যায়ন ব্যবস্থা চালু, খাতা পুনর্মূল্যায়নের সুযোগ, গবেষণা সহায়তা বৃদ্ধি, শিক্ষার্থী কল্যাণ তহবিল গঠন, স্মার্ট আইডি কার্ড প্রবর্তন, ক্যাম্পাসজুড়ে ফ্রি ওয়াই-ফাই জোন, সাংস্কৃতিক অবকাঠামো সম্প্রসারণ এবং বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিক্ষার্থীদের জন্য সুবিধা নিশ্চিত করা।

তবে শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, নির্বাচনের সময় ঘোষিত অধিকাংশ প্রতিশ্রুতির দৃশ্যমান বাস্তবায়ন এখনো দেখা যায়নি। বহুল আলোচিত ডাইনিং ভর্তুকি কার্যকর হয়নি। ক্যাম্পাসের দীর্ঘদিনের পরিবহন সংকটও পুরোপুরি কাটেনি। শিক্ষার্থীদের যাতায়াত সহজ করতে বাস ট্র্যাকিং অ্যাপ চালুর কথা বলা হলেও সেটি এখনো বাস্তব রূপ পায়নি। স্বাস্থ্যসেবার উন্নয়নের প্রতিশ্রুতি থাকলেও পূর্ণাঙ্গ চিকিৎসা ব্যবস্থা, স্বাস্থ্যবীমা কিংবা আধুনিক ডিসপেনসারি গড়ে ওঠেনি।

গণিত বিভাগের শিক্ষার্থী আল আমিন বলেন, নির্বাচনের আগে বিভিন্ন প্যানেলের ইশতেহার দেখে মনে হয়েছিল জাকসু শিক্ষার্থীদের নিত্যদিনের সমস্যাগুলো সমাধানে কার্যকর ভূমিকা রাখবে। কিন্তু নয় মাস পর এসে দেখা যাচ্ছে অধিকাংশ প্রতিশ্রুতি কাগজেই সীমাবদ্ধ রয়েছে।


শিক্ষার্থীদের একাংশের মতে, গত নয় মাসে জাকসুর দৃশ্যমান কার্যক্রমের মধ্যে রয়েছে কয়েকটি সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, প্রশিক্ষণ কর্মশালা, বটতলায় ওয়াশরুম স্থাপনের উদ্যোগ, কিছু সড়ক প্রশস্তকরণ এবং ফুটপাত নির্মাণসংক্রান্ত অনুমোদন। এসব উদ্যোগকে ইতিবাচক হিসেবে দেখলেও অনেকের মত, নির্বাচনি ইশতেহারে উল্লিখিত বড় বড় অঙ্গীকারের তুলনায় এগুলোর প্রভাব সীমিত।

একাডেমিক খাতেও প্রতিশ্রুতি ও বাস্তবতার মধ্যে ফারাকের অভিযোগ রয়েছে। শিক্ষক মূল্যায়ন ব্যবস্থা, খাতা পুনর্মূল্যায়ন নীতিমালা, গবেষণা অনুদান সম্প্রসারণ, বৃত্তির পরিমাণ বৃদ্ধি কিংবা আন্তর্জাতিক মানের ক্রীড়া প্রশিক্ষক নিয়োগের মতো বিষয়গুলোতে এখনো উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি দৃশ্যমান নয়। একইভাবে স্মার্ট আইডি কার্ড, ডিজিটাল সেবা সম্প্রসারণ এবং ক্যাম্পাসব্যাপী ফ্রি ওয়াই-ফাই সুবিধাও বাস্তবায়নের অপেক্ষায় রয়েছে।

পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণের প্রশ্নেও জাকসুর ভূমিকা নিয়ে আলোচনা রয়েছে। নির্বাচনি ইশতেহারে ক্যাম্পাসের জন্য একটি পূর্ণাঙ্গ ইকোলজিক্যাল মাস্টারপ্ল্যান প্রণয়ন এবং জীববৈচিত্র্য রক্ষার অঙ্গীকার করা হয়েছিল। কিন্তু সম্প্রতি বিশ্ববিদ্যালয়ের লেক ইজারা দেওয়ার সিদ্ধান্তকে ঘিরে শিক্ষার্থীদের মধ্যে সমালোচনা তৈরি হয়েছে। অনেকের দাবি, পরিবেশ রক্ষার প্রতিশ্রুতির সঙ্গে এমন সিদ্ধান্ত সাংঘর্ষিক। পাশাপাশি ক্যাম্পাসে উচ্চক্ষমতার কৃত্রিম আলোর ব্যবহার অতিথি পাখি ও অন্যান্য বন্যপ্রাণীর স্বাভাবিক জীবনচক্রে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে বলেও উদ্বেগ প্রকাশ করছেন পরিবেশসচেতন শিক্ষার্থীরা।

আবাসন ও শিক্ষার্থীসেবার ক্ষেত্রেও রয়েছে নানা প্রশ্ন। নতুন আবাসিক হলে এখনো ডাইনিং চালু না হওয়ায় শিক্ষার্থীরা ভোগান্তিতে রয়েছেন। যদিও বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাফেটেরিয়ায় তিন বেলা খাবার সরবরাহের ব্যবস্থা চালু হয়েছে, তবুও ডিজিটাল কুপন ব্যবস্থা, ২৪ ঘণ্টার অ্যাম্বুলেন্স সেবা, স্বাস্থ্যবীমা ও জরুরি চিকিৎসা সুবিধার মতো প্রতিশ্রুতিগুলো এখনো বাস্তবায়িত হয়নি।

বিশ্ববিদ্যালয়ের কয়েকজন শিক্ষক নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, নির্বাচনের সময় দেওয়া কিছু প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের জন্য যে পরিমাণ অর্থ, প্রশাসনিক অনুমোদন ও নীতিগত সমর্থন প্রয়োজন, তার সঙ্গে ইশতেহারের অনেক অঙ্গীকারের সামঞ্জস্য ছিল না। ফলে শুরু থেকেই কিছু প্রতিশ্রুতির বাস্তবায়ন নিয়ে সংশয় ছিল।

তবে জাকসুর নেতারা দাবি করছেন, অনেক কাজই প্রক্রিয়াধীন রয়েছে এবং সব ব্যর্থতার দায় জাকসুর নয়। জাকসুর পরিবেশ ও প্রকৃতি সংরক্ষণবিষয়ক সম্পাদক শাফায়াত মীর বলেন, লেক ইজারা না দেওয়া এবং পরিবেশবান্ধব আলোকব্যবস্থা নিশ্চিত করার জন্য আমরা প্রশাসনের কাছে সুপারিশ করেছি। বিশ্ববিদ্যালয়ের ভবিষ্যৎ মাস্টারপ্ল্যানে পরিবেশগত বিষয়গুলো অন্তর্ভুক্ত করার বিষয়েও আমরা কাজ করছি। তবে প্রশাসনিক জটিলতায় অনেক উদ্যোগ কাঙ্ক্ষিত গতিতে এগোয়নি।

সাধারণ সম্পাদক (জিএস) মাজহারুল ইসলাম বলেন, ইশতেহারের বেশ কিছু বিষয় ইতোমধ্যে বাস্তবায়ন হয়েছে এবং আরও কিছু উদ্যোগ চলমান রয়েছে। প্রশাসনের সহযোগিতা পেলে বাকি প্রতিশ্রুতিগুলো বাস্তবায়নে আমরা কাজ চালিয়ে যাব।

অন্যদিকে জাকসুর ভিপি আব্দুর রশিদ জিতুর বক্তব্য জানতে যোগাযোগ করা হলে তিনি তাৎক্ষণিক মন্তব্য করতে অপারগতা প্রকাশ করেন। তিনি জানান, বর্তমানে বিদেশ সফরে থাকায় দেশে ফিরে বিষয়টি নিয়ে বিস্তারিত কথা বলবেন।

জাকসু নির্বাচনের মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের যে প্রত্যাশার জন্ম হয়েছিল, নয় মাস পর এসে সেই প্রত্যাশার বড় একটি অংশ এখনো অপূর্ণ। ফলে শিক্ষার্থীদের মধ্যে প্রশ্ন জোরালো হচ্ছে-নির্বাচনি ইশতেহার কি বাস্তবসম্মত কর্মপরিকল্পনা ছিল, নাকি ভোটারদের আকৃষ্ট করার রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি? আগামী মাসগুলোতে জাকসু কতটা দৃশ্যমানভাবে নিজেদের অঙ্গীকার বাস্তবায়ন করতে পারে, সেটিই এখন শিক্ষার্থীদের নজরে।

সময়ের আলো/আরবিএন 



  বিষয়:   জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়  কেন্দ্রীয় শিক্ষার্থী সংসদ  জাকসু 


Loading...
Loading...
শিক্ষা- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: