বিশ্বমঞ্চে চারবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন জার্মানির দাপট, অন্যপ্রান্তে দক্ষিণ আমেরিকার উদীয়মান শক্তি ইকুয়েডরের লড়াকু মানসিকতা। দুই ভিন্ন ফুটবল সংস্কৃতি, দুই ভিন্ন ইতিহাস মুখোমুখি হচ্ছে বিশ্বকাপে। নিউ জার্সির মেটলাইফ স্টেডিয়ামে ২০২৬ বিশ্বকাপের ‘ই’ গ্রুপের শেষ ম্যাচে যখন জার্মানি ও ইকুয়েডর মাঠে নামবে, তখন এক দলের লক্ষ্য হবে শতভাগ সাফল্যে গ্রুপপর্ব শেষ করা, অন্য দলের সামনে বাঁচা-মরার লড়াইয়ের কঠিন বাস্তবতা।
বিশ্বকাপের ইতিহাসে জার্মানি মানেই সাফল্যের আরেক নাম। চারটি শিরোপা, আটটি ফাইনাল এবং অসংখ্য স্মরণীয় রাতের সাক্ষী। অন্যদিকে ইকুয়েডরের বিশ্বকাপ ইতিহাস তুলনামূলকভাবে ছোট, তবে নিজেদের সীমাবদ্ধতা ছাপিয়ে লড়াই করে যাওয়ার গল্পে ভরা। এবারও সেই গল্পের আরেকটি অধ্যায় লেখার অপেক্ষায় রয়েছে লা ত্রি। তবে তাদের সামনে দাঁড়িয়ে আছে টুর্নামেন্টের অন্যতম ভয়ংকর দল জার্মানি।
দুই ম্যাচেই জয় তুলে নিয়ে ইতিমধ্যে নকআউট পর্ব নিশ্চিত করেছে জুলিয়ান নাগেলসম্যানের শিষ্যরা। প্রথম ম্যাচে কুরাসাওকে ৭-১ গোলে বিধ্বস্ত করে নিজেদের আক্রমণভাগের শক্তি দেখিয়েছে। এরপর দ্বিতীয় ম্যাচে আইভরি কোস্টের বিপক্ষে পিছিয়ে পড়েও ২-১ গোলের নাটকীয় জয় তুলে নেয় জার্মানরা। বদলি হিসেবে নেমে জোড়া গোল করে নায়ক বনে যান ডেনিজ উনদাভ। এই বিশ্বকাপে ইতিমধ্যে তিন গোল ও দুই অ্যাসিস্ট করে পাঁচটি গোলে সরাসরি অবদান রেখেছেন এই স্টুটগার্ট ফরোয়ার্ড।
টানা ১১ ম্যাচ জিতে দুর্দান্ত ফর্মে রয়েছে জার্মানি। আর একটি জয় পেলেই তারা ১৯৭৯-৮০ সালের পর প্রথমবার টানা ১২ ম্যাচ জয়ের কীর্তি স্পর্শ করবে। একই সঙ্গে ২০০৬ সালের পর প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপের গ্রুপপর্ব শতভাগ জয় দিয়ে শেষ করার সুযোগও রয়েছে তাদের সামনে।
অন্যদিকে ইকুয়েডরের শুরুটা ছিল হতাশাজনক। প্রথম ম্যাচে আইভরি কোস্টের কাছে শেষ মুহূর্তের গোলে ১-০ ব্যবধানে হারের পর কুরাসাওয়ের বিপক্ষে শট নিয়েও গোলের দেখা পায়নি। গোলশূন্য ড্রয়ে থেমে যাওয়া সেই ম্যাচের পর দুই ম্যাচে মাত্র এক পয়েন্ট নিয়ে বিদায়ের দ্বারপ্রান্তে দাঁড়িয়ে আছে সেবাস্তিয়ান বেকাসেসের দল।
শক্তিমত্তার দিক থেকে জার্মানি অনেকটাই এগিয়ে। অভিজ্ঞতা, স্কোয়াডের গভীরতা, মিডফিল্ডের নিয়ন্ত্রণ এবং আক্রমণের বৈচিত্র্য- সবকিছুতেই চারবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়নদের শ্রেষ্ঠত্ব স্পষ্ট। তবে ইকুয়েডরের শক্তি তাদের সুশৃঙ্খল রক্ষণ ও মাঝমাঠের লড়াকু মানসিকতা। অধিনায়ক এননার ভ্যালেন্সিয়া ও চেলসি মিডফিল্ডার মইসেস কাইসেদোর ওপরই নির্ভর করছে দক্ষিণ আমেরিকার দলটির ভাগ্য। ফিফা র্যাঙ্কিংয়েও এগিয়ে জার্মানরা। মুসিয়ালাদের অবস্থান ১০-এ আর ইকুয়েডর রয়েছে ২৩তম অবস্থানে। হেড-টু-হেড লড়াইয়েও এগিয়ে জার্মানি। সবশেষ দুই দেখায় জয় নিয়ে ফিরেছে ম্যানুয়াল নয়্যাররা।
কাগজে-কলমে জার্মানিই স্পষ্ট ফেবারিট। কিন্তু বিশ্বকাপের ইতিহাস বারবার প্রমাণ করেছে, বেঁচে থাকার লড়াইয়ে নামা দলগুলো কখনোই সহজ প্রতিপক্ষ নয়। তাই মেটলাইফ স্টেডিয়ামে জার্মানির সামনে শুধু আরেকটি জয় নয়, অপেক্ষা করছে নিজেদের শ্রেষ্ঠত্ব আবারও প্রমাণ করার পরীক্ষা। গ্রুপ ‘ই’তে আরেক ম্যাচে ফিলাডেলফিয়া স্টেডিয়ামে মুখোমুখি হবে আফ্রিকার শক্তিশালী দল আইভরি কোস্ট ও ক্যারিবীয় অঞ্চলের প্রতিনিধি কুরাসাও। দুদলের সামনেই রয়েছে নকআউট পর্বে উঠার সুযোগ, তবে সেই স্বপ্ন পূরণ করতে হলে এই ম্যাচে জয়ের বিকল্প নেই।
ফিফা র্যাঙ্কিংয়ে আইভরি কোস্ট বর্তমানে ৩৩তম স্থানে, আর কুরাসাও রয়েছে ৮২-তে। র্যাঙ্কিং, অভিজ্ঞতা ও আন্তর্জাতিক সাফল্যের বিচারে এগিয়ে আফ্রিকান দলটি। তবে এবারের বিশ্বকাপে কুরাসাওয়ের লড়াকু মানসিকতা তাদের সহজ প্রতিপক্ষ হতে দিচ্ছে না। প্রথম ম্যাচে ইকুয়েডরের বিপক্ষে দারুণ একটি জয় তুলে নেয় আইভরি কোস্ট। ম্যাচের শেষ মুহূর্তে করা একমাত্র গোল তাদের এনে দেয় গুরুত্বপূর্ণ তিন পয়েন্ট। তবে দ্বিতীয় ম্যাচে জার্মানির বিপক্ষে প্রায় চমক দেখিয়েই ফেলেছিল তারা। এগিয়ে থেকেও শেষ পর্যন্ত ২-১ ব্যবধানে হারতে হয়, যদিও পুরো ম্যাচে শৃঙ্খলাবদ্ধ ফুটবল খেলেছে দলটি। দুই ম্যাচে তিন পয়েন্ট নিয়ে তারা বর্তমানে গ্রুপের দ্বিতীয় স্থানে।
অন্যদিকে কুরাসাওয়ের বিশ্বকাপ অভিযান শুরু হয়েছিল দুঃস্বপ্নের মতো। প্রথম ম্যাচে জার্মানির কাছে ৭-১ গোলের বড় ব্যবধানে হারে তারা। কিন্তু সেই ধাক্কা সামলে দ্বিতীয় ম্যাচে ঘুরে দাঁড়ায় ক্যারিবীয় দলটি। ইকুয়েডরের বিপক্ষে গোলশূন্য ড্র করে তারা নিজেদের সম্ভাবনা বাঁচিয়ে রাখে। গোলরক্ষক এলোয় রুম একের পর এক দুর্দান্ত সেভ করে দলের নায়ক বনে যান।
শক্তিমত্তার দিক থেকে আইভরি কোস্টের সবচেয়ে বড় অস্ত্র তাদের শারীরিক সামর্থ্য, গতি এবং পাল্টা আক্রমণ। ইউরোপের বিভিন্ন লিগে খেলা বেশ কয়েকজন ফুটবলার নিয়ে গড়া দলটি যেকোনো প্রতিপক্ষকে ভোগাতে সক্ষম। আক্রমণে সেবাস্তিয়ান হালার ও মিডফিল্ডে ফ্রাঙ্ক কেসির অভিজ্ঞতা দলটিকে বাড়তি শক্তি জোগায়। রক্ষণে ওডিলন কসুনু ও ইভান এনডিকারাও নির্ভরতার প্রতীক।
কুরাসাওয়ের সবচেয়ে বড় ভরসা তাদের দলীয় সংহতি। তারকা খেলোয়াড়ের সংখ্যা কম হলেও সংগঠিত ফুটবল খেলতে পারদর্শী তারা। গোলরক্ষক এলোয় রুম, মিডফিল্ডার জুনিনহো বাকুনা এবং ফরোয়ার্ড রাঙ্গেলো ইয়াঙ্গা দলের গুরুত্বপূর্ণ সদস্য। বিশেষ করে রুমের ফর্ম কুরাসাওকে স্বপ্ন দেখাচ্ছে। কাগজে-কলমে আইভরি কোস্টই এই ম্যাচের ফেবারিট। তবে বিশ্বকাপে চাপে থাকা দলগুলো প্রায়ই চমক দেখায়। তাই কুরাসাওকে হালকাভাবে নেওয়ার সুযোগ নেই আফ্রিকার প্রতিনিধিদের। নকআউটের টিকেট নিশ্চিত করতে হলে দুদলকেই নিজেদের সেরাটা উজাড় করে দিতে হবে এই মহাগুরুত্বপূর্ণ লড়াইয়ে।
মুখোমুখি
জার্মানি-ইকুয়েডর
আইভরি কোস্ট-কুরাসাও
রাত ২টায়
সময়ের আলো/আআ