নেইমার জুনিয়রের গল্পটা কখনোই শুধু ফুটবলের নয়। এটি বারবার পড়ে গিয়ে উঠে দাঁড়ানোর গল্প, সমালোচনার মুখে দাঁড়িয়ে নিজেকে প্রমাণ করার গল্প, আর অসম্ভবকে সম্ভব করে ফের আলোয় ফিরে আসার গল্প। তাই স্কটল্যান্ডের বিপক্ষে ম্যাচের আগে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নেইমার সিনিয়র (নেইমারের বাবা) যখন পুরোনো একটি ভিডিও আবার শেয়ার করলেন, সেটি শুধু একটি ভিডিও ছিল না, ছিল ছেলের প্রতি এক নীরব বার্তা।
গত বছর কিংস লিগের ফাইনালের আগে বাবার কাছ থেকে শোনা কথাগুলো সতীর্থদের শুনিয়েছিলেন নেইমার, ‘দৌড়াও, নিজেকে নিংড়ে দাও। এমনভাবে দৌড়াও, যেন এটাই তোমার জীবনের শেষ দিন।’ এক বছর পর সেই কথাগুলো যেন নতুন অর্থ নিয়ে ফিরে এসেছে। মিয়ামিতে ব্রাজিল-স্কটল্যান্ড ম্যাচের আগে বার্তাটি যেন এবার সরাসরি নেইমারের প্রতিই ছুড়ে দেওয়া। সবকিছু উজাড় করে দাও, নিজের সর্বস্ব দিয়ে লড়ো। কারণ এমন মুহূর্ত জীবনে বারবার আসে না।
৩৪ বছর বয়সি নেইমারের জন্য এই বিশ্বকাপটা এমনিতেই বিশেষ। ২০২৩ সালের অক্টোবরে বিশ্বকাপ বাছাইপর্বে চোটে পড়ার পর দীর্ঘ সময় জাতীয় দলের বাইরে ছিলেন তিনি। এরপর শুরু হয় অনিশ্চয়তা, পুনর্বাসন আর অপেক্ষার এক কঠিন অধ্যায়। অনেকেই বিশ্বাস করতেন না যে তিনি আবারও ব্রাজিলের জার্সিতে ফিরতে পারবেন, অন্তত বিশ্বকাপের মঞ্চে তো নয়ই।
কার্লো আনচেলত্তি ব্রাজিলের দায়িত্ব নেওয়ার পর সবচেয়ে বড় প্রশ্নগুলোর একটি ছিল, নেইমার কি বিশ্বকাপ দলে থাকবেন? ব্রাজিলজুড়ে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু ছিলেন তিনি। শেষ পর্যন্ত সেই প্রশ্নের উত্তর দিয়েছেন ইতালিয়ান কোচ নিজেই। শুধু দলে রাখেননি, স্কটল্যান্ড ম্যাচ দিয়েই তাকে ফিরিয়ে এনেছেন জাতীয় দলের জার্সিতে।
ম্যাচের ৭৬তম মিনিটে বদলির বোর্ডে যখন ১০ নম্বর জার্সির নাম উঠল, তখন স্টেডিয়ামে এক অন্যরকম আবহ তৈরি হয়। গোল করা মাতেউস কুনিয়ার মুখেও ছিল শিশুসুলভ উচ্ছ্বাস। মাঠ ছাড়ার আগে তিনি ছুটে গিয়ে জড়িয়ে ধরেন নেইমারকে। যেন পুরো ব্রাজিলের অনুভূতিটাই প্রকাশ করছিলেন তিনি।
প্রায় ৯৮১ দিন পর ব্রাজিলের জার্সিতে মাঠে নামলেন দেশের ইতিহাসের সর্বোচ্চ গোলদাতা। মাত্র কুড়ি মিনিটের কিছু বেশি সময় খেলেও নিজের উপস্থিতি বুঝিয়ে দিলেন। কয়েকটি আক্রমণ গড়ে দিলেন, কর্নার থেকে সুযোগ তৈরি করলেন, বল পায়ে নিয়ে দেখালেন সেই পুরোনো আত্মবিশ্বাসের ঝলক।
ভিনিসিয়ুস জুনিয়র পরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লিখেছিলেন, ‘আমাদের আইডলের প্রত্যাবর্তন।’
২০১৪ বিশ্বকাপে হুয়ান জুনিগার ভয়ংকর ট্যাকল থেকে শুরু করে একের পর এক গুরুতর চোট। ছয়বার বড় ধরনের ইনজুরির ধাক্কা সামলাতে হয়েছে তাকে। অনেক ফুটবলারের ক্যারিয়ার এত দিন আগেই শেষ হয়ে যেত। কিন্তু নেইমার বারবার ফিরে এসেছেন। তার এই ফেরায় মুগ্ধ হয়েছেন ফরাসি কিংবদন্তি থিয়েরি অঁরি।
তিনি বলেন, ‘নেইমারের মাঠে নামার মুহূর্তেই ম্যাচটা বদলে গেল। বিশ্বসেরা খেলোয়াড়রা এমনই। ম্যাচে নিজের প্রভাব রাখতে তাদের পুরো ৯০ মিনিট মাঠে থাকার প্রয়োজন হয় না।’
গ্যালারিতে বসে ছিলেন নেইমারের মেয়ে মাভি, সঙ্গী ব্রুনা বিয়ানকার্দি এবং ব্রাজিলের কিংবদন্তি রোনালদো নাজারিও, রোনালদিনহো, কাফু ও রবার্তো কার্লোস।
সবার সামনে নিজের প্রত্যাবর্তনের গল্প লিখে শেষ বাঁশি বাজার পর আবেগ ধরে রাখতে পারেননি নেইমার। চোখের কোণে জমে থাকা অশ্রু যেন বলে দিচ্ছিল, এই পথটা মোটেও সহজ ছিল না।
সমালোচনাও কম সহ্য করতে হয়নি তাকে। অনেকে প্রশ্ন তুলেছিলেন, পুরোপুরি ফিট না হওয়া একজন খেলোয়াড়কে কেন বিশ্বকাপ দলে নেওয়া হবে? কিন্তু আনচেলত্তি তার ওপর আস্থা রেখেছেন।
ব্রাজিল কোচের ভাষায়, ‘তার বয়স ৩৪ ছুঁয়েছে, অথচ ফুটবল খেলার প্রতি তার তাড়না ও ভালোবাসা এখনও যেকোনো কিশোরের মতো।’
আর নেইমারের নিজের অনুভূতিটাও ছিল আবেগে ভরা। তিনি বলেন, ‘বিশ্বকাপে খেলা আর জাতীয় দলে ফিরে এই জার্সি গায়ে জড়ানোই ছিল আমার একমাত্র লক্ষ্য। ব্রাজিলের জার্সিটা পরতে আমি মনেপ্রাণে ভালোবাসি।’
এখন সামনে নতুন লড়াই। এই বিশ্বকাপে লিওনেল মেসি, হালান্ড, কি এমবাপেরা গোলের পর গোল করে আলো ছড়াচ্ছেন। নেইমার কি সেই উৎসবে যোগ দিতে পারবেন?
উত্তরটা হয়তো সময়ই দেবে। তবে একটি বিষয়ে বাজি ধরা যায়- নেইমার এবার নিজেকে নিংড়ে দেবেন। কারণ তার বাবার সেই কথাগুলো হয়তো এখনও কানে বাজছে, ‘দৌড়াও, নিজেকে নিংড়ে দাও। এমনভাবে দৌড়াও, যেন এটাই তোমার জীবনের শেষ দিন।’
সময়ের আলো/প্রিন্ট/কেএইচও