বিশ্ব ফুটবলে নতুন যুগের দুই সবচেয়ে বড় তারকা। একজন গোলকে নিজের সবচেয়ে বিশ্বস্ত বন্ধু বানিয়ে ফেলেছেন, অন্যজন গতির ঝড়ে মুহূর্তেই ম্যাচের চিত্র পাল্টে দিতে পারেন। একজন আর্লিং হালান্ড, অন্যজন কিলিয়ান এমবাপে। ক্লাব ফুটবলে বহুবার আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে থাকলেও বিশ্বকাপের মঞ্চে এই প্রথম এত বড় এক লড়াইয়ে মুখোমুখি হচ্ছেন তারা। শুধু ব্যক্তিগত শ্রেষ্ঠত্বের প্রশ্ন নয়; গ্রুপ সেরার লড়াই, গোল্ডেন বুটের দৌড় এবং শিরোপার পথে মানসিক সুবিধা- সবকিছু মিলিয়ে শুক্রবারের ম্যাচটি হয়ে উঠেছে বিশ্বকাপের অন্যতম আকর্ষণ। ফ্রান্স-নরওয়ে ফুটবলযুদ্ধ।
২০২৬ বিশ্বকাপের গ্রুপ ‘আই’-এর শেষ ম্যাচে ম্যাসাচুসেটসের জিলেট স্টেডিয়ামে মুখোমুখি হবে ইউরোপের দুই শক্তিশালী দল ফ্রান্স ও নরওয়ে। দুদলই ইতিমধ্যে শেষ বত্রিশ নিশ্চিত করেছে, তবে গ্রুপ চ্যাম্পিয়ন হওয়ার লড়াইয়ে ম্যাচটির গুরুত্ব কোনো অংশেই কম নয়। বিশ্ব ফুটবলে দুদলের অবস্থান অবশ্য ভিন্ন।
বর্তমান ফিফা র্যাঙ্কিংয়ে ফ্রান্স রয়েছে তৃতীয় স্থানে, আর নরওয়ে ৩১তম। তবে র্যাঙ্কিংয়ের পার্থক্য মাঠের পারফরম্যান্সে এখন পর্যন্ত দেখা যায়নি। দুদলই প্রথম দুই ম্যাচে পূর্ণ ছয় পয়েন্ট সংগ্রহ করে দুর্দান্ত ছন্দে রয়েছে।
ফ্রান্স শুরুটা করেছিল সেনেগালের বিপক্ষে ৩-১ গোলের জয় দিয়ে। সেই ম্যাচে জোড়া গোল করেন অধিনায়ক এমবাপে, আর একটি গোল আসে ব্র্যাডলি বারকোলার পা থেকে। দ্বিতীয় ম্যাচে ইরাককে ৩-০ গোলে হারিয়ে দিদিয়ের দেশমের দল জানিয়ে দিয়েছে, কেন তাদের আবারও বিশ্বকাপের অন্যতম শিরোপাপ্রত্যাশী ধরা হচ্ছে।
অন্যদিকে ২৮ বছর পর বিশ্বকাপে ফিরে রীতিমতো রূপকথার গল্প লিখছে নরওয়ে। প্রথম ম্যাচে ইরাককে ৪-১ গোলে বিধ্বস্ত করে ভাইকিংরা, যেখানে জোড়া গোল করেন হালান্ড। এরপর সেনেগালের বিপক্ষে ৩-২ ব্যবধানে জয় তুলে নিয়ে শেষ ষোলো নিশ্চিত করে স্টালে সোলবাক্কেনের শিষ্যরা।
এই ম্যাচের সবচেয়ে বড় আকর্ষণ অবশ্যই এমবাপে ও হালান্ডের দ্বৈরথ। টুর্নামেন্টে দুজনই এখন পর্যন্ত চারটি করে গোল করেছেন এবং যৌথভাবে সর্বোচ্চ গোলদাতাদের তালিকায় রয়েছেন। এমবাপের গতি, ড্রিবলিং ও গোল করার সহজাত ক্ষমতা ফ্রান্সকে দিয়েছে বাড়তি ধার।
অন্যদিকে হালান্ডের শারীরিক শক্তি, বক্সের ভেতরে উপস্থিতি এবং যেকোনো সুযোগকে গোলে পরিণত করার ক্ষমতা নরওয়ের সবচেয়ে বড় অস্ত্র। দলীয় শক্তির বিচারে অবশ্য ফ্রান্স এগিয়ে। উইলিয়াম সালিবা, অরেলিয়াঁ শুয়ামেনি, থিও হার্নান্দেজ, বারকোলা ও ওসমান দেম্বেলের মতো বিশ্বমানের ফুটবলারদের নিয়ে তাদের স্কোয়াড অনেক বেশি ভারসাম্যপূর্ণ।
তবে নরওয়েরও আছে মার্টিন ওডেগার্ডের সৃজনশীলতা, আলেক্সান্ডার সোরলথের আক্রমণভাগের উপস্থিতি এবং ভয়ংকর দ্রুতগতির কাউন্টার অ্যাটাক। গ্রুপ সেরা হতে নরওয়ের জয়ের বিকল্প নেই, অন্যদিকে ড্র করলেই শীর্ষস্থান নিশ্চিত হবে ফ্রান্সের। কিন্তু সব সমীকরণের বাইরে জিলেট স্টেডিয়ামের রাতটি হয়তো মনে রাখা হবে অন্য কারণে- এটি হতে পারে বিশ্ব ফুটবলের দুই মহাতারকা হালান্ড ও এমবাপের আরেকটি স্মরণীয় অধ্যায়ের সূচনা।
এদিকে গ্রুপের অন্য ম্যাচে শেষ বত্রিশের আশা বাঁচিয়ে রাখতে টরেন্টো স্টেডিয়ামে মুখোমুখি হচ্ছে আফ্রিকার প্রতিনিধি সেনেগাল ও এশিয়ার দল ইরাক। দুদলই প্রথম দুই ম্যাচে হার দেখেছে, ফলে এই ম্যাচটি কার্যত পরিণত হয়েছে বাঁচা-মরার লড়াইয়ে। যে দল জিতবে, তাদের সামনে শেষ ক্ষীণ হলেও সম্ভাবনা জেগে থাকবে; হারলেই বিশ্বকাপ থেকে বিদায় প্রায় নিশ্চিত।
সেনেগাল বিশ্বকাপ শুরু করেছিল কঠিন পরীক্ষার মধ্য দিয়ে। প্রথম ম্যাচে শক্তিশালী ফ্রান্সের বিপক্ষে লড়াই করেও ৩-১ গোলে হারে আফ্রিকার দলটি। ম্যাচে আক্রমণাত্মক ফুটবল খেললেও ফরাসিদের অভিজ্ঞতা ও কার্যকর ফিনিশিংয়ের সামনে টিকতে পারেনি তারা। দ্বিতীয় ম্যাচে নরওয়ের বিপক্ষে আরও হতাশাজনক পরাজয় বরণ করে সেনেগাল। দারুণ প্রতিদ্বন্দ্বিতা গড়ে দুটি গোল করলেও শেষ পর্যন্ত ৩-২ ব্যবধানে হেরে যায় তারা। দুই ম্যাচে পাঁচ গোল হজম করায় তাদের রক্ষণভাগ নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
অন্যদিকে ইরাকের বিশ্বকাপ যাত্রাও এখন পর্যন্ত হতাশার। প্রথম ম্যাচে আর্লিং হালান্ডের নরওয়ের কাছে ৪-১ গোলের বড় ব্যবধানে হারতে হয় মধ্যপ্রাচ্যের দলটিকে। এরপর দ্বিতীয় ম্যাচে বিশ্বচ্যাম্পিয়ন ফ্রান্সের বিপক্ষে রক্ষণাত্মক কৌশল নিয়েও সফল হতে পারেনি তারা, ৩-০ ব্যবধানে হেরে টানা দ্বিতীয় পরাজয় বরণ করে। দুই ম্যাচে মাত্র একটি গোল করতে পেরেছে ইরাক, আর হজম করেছে সাতটি।
তবে দুদলের জন্যই এই ম্যাচে কিছু ইতিবাচক দিক রয়েছে। সেনেগালের আক্রমণভাগ অন্তত গোল করার সক্ষমতা দেখিয়েছে, অন্যদিকে ইরাক চাইবে নিজেদের রক্ষণকে আরও গোছানো করে পাল্টা আক্রমণে সুযোগ কাজে লাগাতে।
কাগজে-কলমে সেনেগাল কিছুটা এগিয়ে থাকলেও বিশ্বকাপের মঞ্চে চাপের ম্যাচে যেকোনো কিছুই ঘটতে পারে। তাই দুদলের লড়াইয়ে জমজমাট এক ম্যাচের প্রত্যাশা করতেই পারে ফুটবলপ্রেমীরা।
সময়ের আলো/প্রিন্ট/কেএইচও