উচ্চশিক্ষার উদ্দেশ্যে ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে বাংলাদেশ থেকে চীনে এসেছিলেন তৌফিক আহমাদ স্পর্শ। ভর্তি হন জিনান প্রদেশের শানডং ইউনিভার্সিটি অব টেকনোলজিতে। চলতি বছরের ৩১ মে চীনে এক মর্মান্তিক দুর্ঘটনায় মারা যান এই শিক্ষার্থী। তার মরদেহ বাংলাদেশে পাঠাতে বেশ বেগ পেতে হয়েছে তার সহপাঠীদের। পরিবারকেও পড়তে হয় অর্থনৈতিক ও কূটনীতিক বিড়ম্বনায়। সহপাঠীরা বিভিন্নভাবে টাকা উঠিয়ে তৌফিক আহমাদের মরদেহ বাংলাদেশে পাঠান। মরদেহ প্রেরণ প্রক্রিয়ায় খরচ হয় প্রায় ৩০ লাখ টাকা।
তৌফিক আহমাদ স্পর্শের মতো এমন পরিস্থিতির শিকার হয়েছেন চীনে পড়তে আসা অনেক শিক্ষার্থীর পরিবার। সবার গল্পই প্রায় কাছাকাছি।উচ্চশিক্ষার আশায় বাংলাদেশ থেকে প্রতি বছর উল্লেখযোগ্য সংখ্যক শিক্ষার্থী স্কলারশিপ নিয়ে চীনে আসেন। কেউ অনার্স আবার কেউ বা এমফিল, পিএইচডি অথবা রিসার্চ করার জন্য আসেন। বর্তমানে ত্রিশ হাজারের মতো শিক্ষার্থী চীনের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করছেন। কিন্তু তাদের কেউ দুর্ঘটনার শিকার হলে কিংবা মারা গেলে মরদেহ বাংলাদেশে পাঠাতে বেশ অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক ঝক্কি পোহাতে হয়।
বুধবার চীনের বেইজিংয়ে কথা হয় তৌফিক আহমাদ স্পর্শের খালাতো ভাই আসিবুর রহমান সিয়ামের সঙ্গে। সমবয়সি সিয়াম পড়ছেন চীনের হেনান প্রদেশের ঝেংঝ ইউনিভার্সিটি অব টেকনোলজিতে।
তিনি ওই সময়ের মর্মান্তিক ঘটনার বর্ণনা দিয়ে সময়ের আলোকে বলেন, আমার খালাতো ভাই স্পর্শ গত ৩১ মে রাত ১০টার দিকে চীনে এক মর্মান্তিক মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় প্রাণ হারান। ওই দুর্ঘটনায় তার সঙ্গে থাকা আরও এক বাংলাদেশি শিক্ষার্থী গুরুতর আহত হন। তার গ্রামের বাড়ি শেরপুর সদরে কিন্তু তার পরিবার থাকে রাজধানীর কচুক্ষেত-ভাষানটেক এলাকায়। তার মরদেহ দেশে পৌঁছাতে সময় লাগে তিন সপ্তাহ। খরচ পড়ে প্রায় ৩০ লাখ টাকা।
সিয়াম বলেন, আমাদের লোকজন কিছুটা পরিচিত ছিল। কাগজপত্র সব ঠিকঠাক ছিল। তারপরও এত টাকা ও এত সময় লেগেছিল মরদেহ দেশে পাঠাতে। পরিবার থেকে কয়েক লাখ টাকা আর বাকিটা ম্যানেজ করেছিলাম চায়নায় বাংলাদেশি কমিউনিটির কাছ থেকে। আমাদের স্টুডেন্ট অ্যাসোসিয়েশনও কিছু কিছু টাকা দিয়ে সহায়তা করেছে। আর যাদের লোকজন পরিচিত থাকে না কিংবা আর্থিক অবস্থা ভালো না তাদের জন্য পরিস্থিতি আরও দুর্বিষহ হয়ে ওঠে। কখনো কখনো মরদেহ পাঠাতে দেড় মাসও লাগে। সব ফ্যামিলির তো সব খরচ বহন করার সামর্থ্য থাকে না।
এ জন্য বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয় থেকে যদি একটা জোরালো উদ্যোগ নেওয়া হতো তা হলে প্রবাসী শিক্ষার্থীরা উপকৃত হতো। আমরা তো দেশের উন্নয়নের লক্ষ্যেই চীনে উচ্চশিক্ষার জন্য আসছি। শুধু চীন নয়, যেকোনো প্রবাসী শিক্ষার্থীর জন্য সরকারের উচিত কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া। আর দূতাবাসকে আরও মানবিক ও সহজ করে গড়ে তোলা। চট্টগ্রামের রাঙ্গুনিয়ার আলাউদ্দিন এইচএসসি শেষ করেই স্কলারশিপ নিয়ে চীনে চলে আসেন। অনার্স করেছেন হুনান ইউনির্ভাসিটিতে। এখন শাআনশি প্রদেশের চাংআন বিশ্ববিদ্যালয়ে মাস্টার্সে অধ্যয়নরত।
২০১৯ সালের শেষ দিকে আলাউদ্দিন চীনে আসেন। সময়ের আলোকে তিনি জানান, চীনের প্রায় সব প্রদেশেই বাংলাদেশি শিক্ষার্থীরা পড়াশোনা করছেন। সবার আর্থিক অবস্থা কিন্তু এক নয়। অনেক মধ্যবিত্ত ঘরের ছেলেরা চীনে উচ্চশিক্ষা নিতে আসেন।
তিনি বলেন, স্কলারশিপের ওপর আমাদের খরচ নির্ভর করে। এত খরচ করে উচ্চশিক্ষা নিতে এসে কেউ দুর্ঘটনার শিকার হলে বাংলাদেশের দূতাবাস কিংবা সরকারের তরফ থেকে কোনো সহায়তা পাওয়া যায় না। এই শিক্ষার্থী বলেন, অন্য দেশের দূতাবাসের মতো বাংলাদেশের দূতাবাস এতটা হেল্পফুল নয়। এম্বাসির সঙ্গে সবসময় যোগাযোগ করা যায় না। তারা ফোনও ধরেন না।
কেউ মারা গেলে মরদেহ দেশে নিতেই লাগে বাংলাদেশি টাকায় ৪০ লাখ। সম্পূর্ণ নিজ খরচে মরদেহ পাঠাতে হয়। অথচ শ্রমজীবী প্রবাসীদের বেলায় সরকার অনেক সহায়তা করে। তারা মারা গেলে দাফন কাজ পর্যন্ত সরকার বহন করে। আর আমরা চাঁদা তুলে ফান্ড কালেক্ট করি। কিছু পরিবার টাকার অভাবে মরদেহ বাংলাদেশে নিতে পারে না।
২০২৩ সালে স্টুডেন্ট ভিসায় যশোরের মতিহার থেকে চীনে আসেন সাকিব আহমেদ শাহীল। তিনি জিয়াংসু প্রদেশের ইয়াংজু ইউনির্ভাসিটিতে ব্যাচেলর ডিগ্রি করছেন। গতকাল বেইজিংয়ে একটি হোটেলে কথা হয় তার সঙ্গে।
এই শিক্ষার্থী সময়ের আলোকে বলেন, চীনে প্রচুর মোটরসাইকেল দুর্ঘটনা ঘটে। বাংলাদেশের কোনো শিক্ষার্থী মারা গেলে অনেক বিড়ম্বনায় পড়তে হয় মরদেহ দেশে পাঠাতে। অনেক সময় ৩০-৪০ লাখ টাকা পর্যন্ত লাগে। সম্প্রতি একটি ঘটনায় আমরা বিভিন্ন ব্যবসায়ীসহ অ্যাসোসিয়েশনের কাছ থেকে হেল্প নিয়েছি। আমরা এ নিয়ে প্রবাসী কল্যাণ প্রতিমন্ত্রী নুরুল হক নুরের সঙ্গেও কথা বলেছিলাম। তিনি আমাদের সরকারের উদ্যোগ নেওয়ার ব্যাপারে আশ্বস্ত করেছেন। এম্বাসিও আমাদের পর্যাপ্ত হেল্প করে না।
চায়নায় ব্যবসা করেন বাংলাদেশি সাখাওয়াত হোসেন কাকন। তিনিও বেইজিংয়ের একটি হোটেলের সামনে দাঁড়িয়ে বলেন, স্টুডেন্ট মারা গেলে বাংলাদেশে মরদেহ পাঠানো অনেক ব্যয়বহুল। স্টুডেন্টের বৈধতা থাকলে কিছু কম খরচ পড়ে। আর কাগজপত্র ঠিক না থাকলে আরও জটিলতা। খরচের ক্ষেত্রে সরকার কিংবা দূতাবাস কোনো সহায়তা করে না।
পঞ্চাশের কাছাকাছি বয়সের গোলজার হোসেন সাগর চীনে থাকেন দুই যুগ ধরে। তার বাড়ি গাজীপুরের কালীগঞ্জে। বেইজিংয়ের ডংচাং এলাকায় রেস্তোরাঁর ব্যবসা করেন। গতকাল রাতে তার সানতোর রেস্তোরাঁয় এই প্রতিবেদককে বলেন, আমাদের দেশের শিক্ষার্থীরা ভবিষ্যতের সম্পদ। তাদের বিষয়ে সরকারের আরও মনোযোগ দেওয়া উচিত। মারা যাওয়ার পর এত ভোগান্তি মোটেও কাম্য নয়। আশা করি সরকার প্রবাসী শিক্ষার্থীদের জন্য আলাদা একটা সেল খুলবে। যাতে তাদের সমস্যাগুলো লাঘব হয়।
এ প্রসঙ্গে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র শহিদুল করিম সময়ের আলোকে বলেন, বিষয়টি সমাধান করতে সপ্তাহখানেক আগে বাংলাদেশ সরকারের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের মধ্যে যৌথসভা অনুষ্ঠিত হয়েছে। সেখানে দুই মন্ত্রণালয় মিলে একটি উপায় বের করার চেষ্টা করছে, প্রবাসী শিক্ষার্থীরা মারা গেলে কীভাবে সহায়তা করা যায়। সরকারি খরচে যাতে মরদেহ পাঠানো যায় সেই চেষ্টা চলছে। আশা করি একটা উদ্যোগ দ্রুতই নেওয়া হবে।
চায়নায় অবস্থিত বাংলাদেশি দূতাবাস শিক্ষার্থীদের মরদেহ পাঠাতে পূর্ণাঙ্গ সহায়তা করে কি না? জবাবে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র বলেন, আমরা যথাসময়ে যথেষ্ট তথ্য-উপাত্ত পেলে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার চেষ্টা করি। কিন্তু আমাদের দূতাবাসে নিহতের ঘটনাটি সঠিক সময়ে পৌঁছাতে হবে।
প্রায় একই কথা শোনান প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান প্রতিমন্ত্রী নূরুল হক নুর। সময়ের আলোকে তিনি বলেন, আমরা উদ্যোগ নিচ্ছি কীভাবে শিক্ষার্থীদের সহযোগিতা করা যায়। আমরা বিভিন্ন পর্যায়ে এ নিয়ে আলাপ করছি।
সময়ের আলো/প্রিন্ট/কেএইচও