ক্যানসার রোগীর আশার প্রকল্পে দীর্ঘশ্বাস

আদিল সরকার

জাতীয়

দেশে ক্যানসার রোগ আতঙ্কের এক দীর্ঘ নাম। যে রোগ থেকে মধ্য-নিম্নবিত্তদের সহজলভ্য ও কম ব্যয়ে চিকিৎসাসেবা দিতে ছয় বছর আগে

2026-06-26T05:55:43+00:00
2026-06-26T05:55:43+00:00
 
  শুক্রবার, ২৬ জুন ২০২৬,
১২ আষাঢ় ১৪৩৩
শুক্রবার, ২৬ জুন ২০২৬
জাতীয়
ক্যানসার রোগীর আশার প্রকল্পে দীর্ঘশ্বাস
আদিল সরকার
প্রকাশ: শুক্রবার, ২৬ জুন, ২০২৬, ৫:৫৫ এএম 
সংগৃহীত ছবি
দেশে ক্যানসার রোগ আতঙ্কের এক দীর্ঘ নাম। যে রোগ থেকে মধ্য-নিম্নবিত্তদের সহজলভ্য ও কম ব্যয়ে চিকিৎসাসেবা দিতে ছয় বছর আগে নেওয়া হয়েছিল প্রায় আড়াই হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে এক বৃহৎ প্রকল্প। পরে প্রকল্পটির পরিধি বাড়িয়ে যোগ করা হয় হৃদরোগ এবং কিডনি ইউনিটও। 

ফলে প্রকল্পটিতে বাড়ানো হয় আরও প্রায় এক হাজার কোটি টাকারও বেশি অর্থ। তবে প্রায় সাত বছর পেরিয়ে গেলেও প্রকল্পটির পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়ন এখনও অনেক দূরে। শুধু ভবন নির্মাণকাজে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করলেও চিকিৎসা যন্ত্রপাতি, আসবাবপত্র, জনবল ও সেবা প্রস্তুতির ক্ষেত্রে কার্যত নেই কোনো দৃশ্যমান অগ্রগতি। ফলে আর কত বছর পর হাসপাতালগুলো থেকে সেবা পাওয়া যাবে তা যেন প্রায় অনিশ্চিত। অন্যদিকে হাসপাতালগুলোর নির্মাণাধীন ভবনসহ পুরো প্রক্রিয়ার নানা বিষয় নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।  

আইএমইডির তথ্য অনুযায়ী, বহুল আলোচিত ‘৮টি বিভাগীয় শহরে পূর্ণাঙ্গ ক্যানসার, হৃদরোগ এবং কিডনি চিকিৎসাকেন্দ্র স্থাপন’ প্রকল্পটি ২০১৯ সালের অক্টোবরে একনেকে অনুমোদন পায়। যার মূল ব্যয় ছিল ২ হাজার ৩৮৮ কোটি ৩৯ লাখ টাকা। প্রকল্পটির বাস্তবায়নকাল নির্ধারণ করা হয়েছিল জুলাই ২০১৯ থেকে জুন ২০২২ পর্যন্ত। 

কিন্তু নির্ধারিত সময়ে কাজ শেষ না হওয়ায় দুই দফা মেয়াদ বৃদ্ধি ও সংশোধনের পর প্রকল্প ব্যয় বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩ হাজার ৪৩৩ কোটি টাকারও বেশি। অর্থাৎ ব্যয় বেড়েছে প্রায় ৪৯.৫১ শতাংশ। একই সঙ্গে প্রকল্পের সময়সীমা মূল মেয়াদের তুলনায় ৪৮ মাস বৃদ্ধি পেয়েছে। এখন আবার ২০২৮ সাল পর্যন্ত সময় বাড়ানোর প্রস্তাব করা হয়েছে, ফলে মোট সময় বৃদ্ধি দাঁড়াবে ৭২ মাস।

এ ছাড়া বর্তমান অগ্রগতি বিবেচনায় ২০২৮ সালের মধ্যেও নির্মাণকাজ শেষ করে প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি সংগ্রহ, জনবল নিয়োগ এবং চিকিৎসা কার্যক্রম চালু করা কতটা সম্ভব- তা নিয়ে সমীক্ষা প্রতিবেদনে প্রশ্ন তোলা হয়েছে। এ ছাড়া প্রকল্পের অন্যতম বড় দুর্বলতা হিসেবে উঠে এসেছে পরিকল্পনার পরিবর্তন। 

জানা যায়, শুরুতে প্রকল্পটি ছিল ১০০ শয্যার ক্যানসার চিকিৎসাকেন্দ্র নির্মাণ প্রকল্প। পরে এর সঙ্গে হৃদরোগ ও কিডনি চিকিৎসা ইউনিটও যুক্ত করা হয়। একই সঙ্গে শয্যা সংখ্যা বৃদ্ধি করে ভবনের নকশা পুনর্বিন্যাস করতে হয়। ফলে প্রকল্পের পরিধি ব্যাপকভাবে বেড়ে যায় এবং নতুন করে ডিজাইন পরিবর্তনের প্রয়োজন পড়ে।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রকল্পটি প্রণয়নের আগে সম্ভাব্যতা সমীক্ষা (ফিজিবিলিটি স্টাডি) করা হলেও শুরুতেই কেন তিনটি রোগের সমন্বিত চিকিৎসাকেন্দ্র পরিকল্পনায় রাখা হয়নি সেটি প্রশ্নবিদ্ধ। এ কারণে স্বাস্থ্য অধিদফতরের পরিকল্পনা সেলের সক্ষমতা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছে সমীক্ষা দল।

জানা যায়, মার্চ ২০২৬ পর্যন্ত প্রকল্পের আর্থিক অগ্রগতি মাত্র ৩০.৮১ শতাংশ হলেও নির্মাণকাজের বাস্তব অগ্রগতি ৮১.৪৩ শতাংশ। তবে এই অগ্রগতি শুধু ভবন নির্মাণেই সীমাবদ্ধ। প্রকল্পের মূল তিনটি উপাদানের মধ্যে ভৌত নির্মাণ ছাড়া চিকিৎসা যন্ত্রপাতি ও আসবাবপত্র সংগ্রহে কার্যত কোনো অগ্রগতি হয়নি।

তবে আটটি হাসপাতালের মধ্যে সবচেয়ে এগিয়ে রয়েছে সিলেটের এমএজি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, যেখানে নির্মাণ অগ্রগতি ৯৭ শতাংশ। সবচেয়ে পিছিয়ে ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, যেখানে অগ্রগতি মাত্র ৫৩ শতাংশ।

অন্যদিকে কোভিড-১৯ মহামারি, রাজনৈতিক পটপরিবর্তন, সময়মতো অর্থ বরাদ্দ না পাওয়া, ঠিকাদারের ধীরগতি, ঠিকাদার পরিবর্তন এবং ব্যবস্থাপনাগত দুর্বলতা প্রকল্প বিলম্বের কারণ হিসেবে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। সমীক্ষায় আরও উদ্বেগজনক তথ্য উঠে এসেছে প্রকল্প ব্যবস্থাপনা নিয়ে। 

নিয়ম অনুযায়ী প্রতি তিন মাস অন্তর প্রকল্প বাস্তবায়ন কমিটি (পিআইসি) ও প্রকল্প স্টিয়ারিং কমিটির (পিএসসি) সভা হওয়ার কথা। জুলাই ২০১৯ থেকে মার্চ ২০২৬ পর্যন্ত ৮১ মাসে মোট ২৭টি সভা হওয়ার কথা থাকলেও অনুষ্ঠিত হয়েছে মাত্র ৩টি পিআইসি এবং ১১টি পিএসসি সভা।

এ ছাড়া সরেজমিন পরিদর্শনেও বিভিন্ন নির্মাণগত ত্রুটিও চিহ্নিত হয়েছে হাসপাতালগুলোতে। রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে টাইলস বসানোর পর গ্রাউটিং বা জয়েন্ট কাটার মতো কাজ দেখা গেছে, যা ভবিষ্যতে পানি প্রবেশ, ফাটল এবং টাইলস ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। 

একই হাসপাতালে দেয়ালে ব্যবহৃত ব্লকের মান ও আকৃতি নিয়েও প্রশ্ন তুলেছে সমীক্ষা দল। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নিম্নমানের বা অসমান ব্লক ব্যবহার করলে দেয়ালের শক্তি কমে যায় এবং প্লাস্টারিংয়ে সমস্যা দেখা দেয়। পরিদর্শনের সময় বিভিন্ন ভবনে ঢালাই শেষে অতিরিক্ত রড কেটে না ফেলার ঘটনাও ধরা পড়ে। 

বিশেষজ্ঞদের মতে, এসব রডে মরিচা ধরে ভবিষ্যতে কাঠামোগত ক্ষতির ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। পাশাপাশি ঢালাইয়ে কোল্ড জয়েন্ট বা নির্মাণ জয়েন্ট এবং নিম্নমানের ফিনিশিংয়ের ঘটনাও চিহ্নিত হয়েছে, যা ভবিষ্যতে ফাটল ও পানি চুইয়ে পড়ার কারণ হতে পারে।

প্রকল্পের নকশা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছে পরিবীক্ষণ দল। প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, কিছু ক্ষেত্রে মেঝে ও দেয়ালে ব্যয়বহুল গ্রানাইট পাথর, ফলস ওয়াল এবং ফলস ব্রিক টাইলস ব্যবহার করা হয়েছে, যা সরকারি অর্থ ব্যয়ের যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি করে। 

এ ছাড়া গণপূর্ত অধিদফতর ও স্বাস্থ্য অধিদফতরের মধ্যে সমন্বয়হীনতা, প্রকল্প পরিচালক বারবার পরিবর্তন, সিদ্ধান্ত গ্রহণে বিলম্ব এবং প্রয়োজনীয় জনবল সৃষ্টিতে ধীরগতিকে প্রকল্প বাস্তবায়নের অন্যতম অন্তরায় হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।

তবে ৮২ মাস অতিক্রান্ত হলে এখনও চিকিৎসা যন্ত্রপাতি ক্রয়ের উদ্যোগ শুরু না হওয়া সবচেয়ে বড় উদ্বেগের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। ফলে বৈশ্বিক বাজারে ডলারের মূল্যবৃদ্ধি এবং সরঞ্জাম আমদানির অনিশ্চয়তা ভবিষ্যতে ব্যয় আরও বাড়িয়ে দিতে পারে বলে আশঙ্কা করা হয়েছে। 

তবে সব সীমাবদ্ধতার মধ্যেও প্রকল্পটি চালু হলে সরকারি পর্যায়ে ক্যানসার, হৃদরোগ ও কিডনি চিকিৎসায় নতুন যুগের সূচনা হবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। এতে বিদেশে চিকিৎসা নিতে যাওয়া রোগীর সংখ্যা কমবে, বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয় হবে এবং বিভাগীয় পর্যায়ে বিশেষায়িত চিকিৎসাসেবা সম্প্রসারিত হবে বলে আশা করা হচ্ছে।

কিন্তু ভবন নির্মাণ শেষ হওয়ার আগেই যেখানে সময়সীমা তিন দফায় বাড়াতে হচ্ছে, সেখানে চিকিৎসা যন্ত্রপাতি স্থাপন, জনবল নিয়োগ এবং পূর্ণাঙ্গ সেবা চালু করতে আর কত বছর অপেক্ষা করতে হবে- সেই প্রশ্ন যেন থেকেই যাচ্ছে। প্রকল্পটির সার্বিক বিষয়ে জানতে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের স্বাস্থ্যসেবা বিভাগস্থ পরিকল্পনা অনুবিভাগের অতিরিক্ত সচিব শাহ ইমাম আলী রেজা সময়ের আলোকে বলেন, এই মুহূর্তে এ বিষয়ে আমি কোনো তথ্য দিতে পারব না। তবে প্রতিবেদককে অফিসে গিয়ে দেখা করে তথ্য নেওয়ার কথা জানান তিনি। 

এ ছাড়া বিষয়টি নিয়ে জানতে স্বাস্থ্য শিক্ষা ও পরিবার কল্যাণ বিভাগস্থ উন্নয়ন অনুবিভাগের পরিকল্পনা অধিশাখার যুগ্মসচিব ড. সৈয়দা সালমা বেগমকে ফোন করা হলে তিনি সাংবাদিক পরিচয় শুনে কল কেটে দেন।

সময়ের আলো/প্রিন্ট/কেএইচও


  বিষয়:   ক্যানসার রোগী  প্রকল্প 


Loading...
Loading...
জাতীয়- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: