প্রতিদিনই খবর আসছে হাম বা হামের লক্ষণ নিয়ে শিশুরা মারা যাচ্ছে। হাসপাতালের শিশু ওয়ার্ডে বাড়ছে হাম আক্রান্ত শিশুর চাপ। অন্যদিকে প্রতিদিনই আসছে মৃত্যুর খবর। দেশব্যাপী হামের জরুরি টিকা দেওয়ার পরও মৃত্যু থামছে না। হামের উপসর্গ নিয়ে আরও ৯ শিশুর মৃত্যু হয়েছে। একই সময়ে হাম ও হামের উপসর্গ নিয়ে আক্রান্ত হয়েছে ৯৪৫ শিশু।
স্বাস্থ্য অধিদফতরের সর্বশেষ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত ১৫ মার্চ থেকে দেশে হামের উপসর্গ নিয়ে ৬০৫ শিশুর মৃত্যু হয়েছে। একই সময়ে নিশ্চিতভাবে হামে আক্রান্ত হয়ে মারা গেছে আরও ৯৩ শিশু। সব মিলিয়ে হাম ও হামের উপসর্গজনিত মৃত্যুর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৬৯৮ জনে। এমন পরিস্থিতিতে বড় প্রশ্ন তৈরি হয়েছে দেশব্যাপী জরুরি টিকাদান কর্মসূচির পরও কেন থামছে না সংক্রমণ ও মৃত্যু?
স্বাস্থ্য বিভাগের কর্মকর্তারা বলছেন, টিকা দেওয়ার কারণে পরিস্থিতির অবনতি ঠেকানো সম্ভব হয়েছে। তবে জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কয়েক বছরের জমে থাকা টিকাবঞ্চিত শিশু, দেরিতে রোগ শনাক্ত, অপুষ্টি এবং ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় ভাইরাস ছড়িয়ে পড়ার কারণে সংকট দীর্ঘ হচ্ছে।
স্বাস্থ্য বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের শুরু থেকেই দেশে হামের সংক্রমণ বাড়তে শুরু করে। মার্চ মাসে পরিস্থিতি স্পষ্ট আকার নেয়। প্রথমে কয়েকটি জেলা ও উপজেলায় সংক্রমণ দেখা গেলেও পরে তা বিভিন্ন এলাকায় ছড়িয়ে পড়ে। এখন পর্যন্ত সন্দেহজনক হাম রোগীর সংখ্যা ৯৬ হাজার ৬৫৩ জন। এর মধ্যে ১১ হাজার ৪৪২ জনের শরীরে পরীক্ষায় হাম শনাক্ত হয়েছে।
স্বাস্থ্য অধিদফতরের তথ্য অনুযায়ী, ৮০ হাজারের বেশি রোগী হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়েছে। তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সরকারি হিসাবের বাইরে থাকা রোগীর সংখ্যা আরও বেশি হতে পারে। কারণ অনেক পরিবার হাসপাতালে না এসে স্থানীয় চিকিৎসক বা ফার্মেসির পরামর্শে চিকিৎসা নেয়।
হাম এমন একটি রোগ যার প্রকৃত চিত্র বুঝতে হাসপাতালভিত্তিক তথ্যের পাশাপাশি মাঠ পর্যায়ের নজরদারি জরুরি। বিশেষজ্ঞদের মতে, বর্তমান প্রাদুর্ভাবের অন্যতম কারণ হলো ‘ইমিউনিটি গ্যাপ’। অর্থাৎ একটি নির্দিষ্ট সময় ধরে অনেক শিশু হামের টিকার আওতার বাইরে থেকে গেছে। এই শিশুরাই এখন ভাইরাসের সংস্পর্শে এসে আক্রান্ত হচ্ছে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, নিয়মিত টিকাদান কর্মসূচি থেকে বাদ পড়া শিশুর সংখ্যা বছর বছর জমতে থাকলে একসময় বড় ধরনের প্রাদুর্ভাবের ঝুঁকি তৈরি হয়। কোনো বছর টিকা না পাওয়া শিশুর সংখ্যা কম হলেও, কয়েক বছর ধরে এই সংখ্যা বাড়তে থাকলে ভাইরাসের জন্য একটি বড় জনগোষ্ঠী অরক্ষিত হয়ে পড়ে।
স্বাস্থ্য অধিদফতরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক অধ্যাপক ফোয়ারা তাসনিম বলেন, টিকা দেওয়ার সুফল পাওয়া যাচ্ছে। টিকা দেওয়া না হলে আক্রান্ত ও মৃত্যুর সংখ্যা আরও বেশি হতে পারত।
চিকিৎসকদের মতে, হামের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো দেরিতে শনাক্ত হওয়া। শুরুতে সাধারণত জ্বর, সর্দি, কাশি ও চোখ লাল হওয়ার মতো উপসর্গ দেখা দেয়। অনেক পরিবার এটিকে সাধারণ ঠান্ডাজনিত সমস্যা মনে করে। পরে শরীরে ফুসকুড়ি উঠলে বিষয়টি পরিষ্কার হয়।
হাম শনাক্ত হওয়ার আগের কয়েক দিনেই আক্রান্ত শিশু অন্যদের সংক্রমিত করতে পারে। বর্তমান প্রাদুর্ভাবে কম বয়সি শিশুরা বেশি আক্রান্ত হচ্ছে। বিশেষ করে যারা এখনও নিয়মিত টিকা পাওয়ার বয়সে পৌঁছায়নি, তাদের ঝুঁকি বেশি। এই বয়সি শিশুদের সুরক্ষা অনেকটাই নির্ভর করে পরিবারের অন্য সদস্য ও আশপাশের মানুষের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতার ওপর। কোনো এলাকায় টিকার হার কম হলে নবজাতক ও ছোট শিশুরা সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে পড়ে।
হাম নিজে যেমন ভয়ংকর, তেমনি এটি শিশুর শরীরকে দুর্বল করে দেয়। হামের কারণে নিউমোনিয়া, ডায়রিয়া, অপুষ্টি, চোখের সমস্যা এবং মস্তিষ্কে প্রদাহের মতো জটিলতা দেখা দিতে পারে। অপুষ্ট শিশুদের ক্ষেত্রে এই ঝুঁকি আরও বেশি। হাম আক্রান্ত শিশুর সংখ্যা বাড়ায় অনেক হাসপাতালের শিশু বিভাগে চাপ তৈরি হয়েছে। একসঙ্গে বেশি রোগী এলে বেড, চিকিৎসক, নার্স এবং আইসোলেশন সুবিধার ওপর চাপ পড়ে।
বাংলাদেশের সাম্প্রতিক ইতিহাসে হামে এত আক্রান্ত ও মৃত্যুর ঘটনা ঘটেনি। দেশব্যাপী শিশুদের টিকা দেওয়ার পরও কেন হামের সংক্রমণ ও মৃত্যু থামছে না, তা নিয়ে স্বাস্থ্য বিভাগের কাছ থেকে স্পষ্ট ব্যাখ্যা পাওয়া যাচ্ছে না। বিপরীতে কোন বয়সি মানুষ হামে বেশি আক্রান্ত হচ্ছে, টিকা পাওয়ার পরও শিশুরা হামে আক্রান্ত হচ্ছে কি না, যেসব শিশু মারা গেছে তারা হামের টিকা পেয়েছিল কি না, এ ধরনের তথ্য স্বাস্থ্য অধিদফতর প্রকাশ করছে না।
দেশে হাম শনাক্তের পরীক্ষা হয় শুধু জনস্বাস্থ্য প্রতিষ্ঠানের ল্যাবরেটরিতে। ল্যাবরেটরির কর্মকর্তারা জানান, ২০২৪ সালে দেশে ২৪৫ জন এবং ২০২৫ সালে ১২৫ জন হামের রোগী শনাক্ত হয়েছিল; কিন্তু গত বছর ডিসেম্বর থেকে দেশে হাম বেড়ে যাওয়ার কিছু লক্ষণ দেখা যায়। এরপর এ বছরের জানুয়ারি ও ফেব্রুয়ারি মাসে রোগী শনাক্ত বেশি হতে থাকে। তবে হামের প্রাদুর্ভাব দেখা দেয় মার্চ মাস থেকে। জনস্বাস্থ্য প্রতিষ্ঠানের ল্যাবরেটরির কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, প্রাথমিকভাবে ১৮ জেলার ৩০টি উপজেলায় এই প্রাদুর্ভাব দেখা দেয়।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বলেছে, সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচির (ইপিআই) নিয়মিত টিকা কার্যক্রম থেকে প্রতি বছর কিছু শিশু বাদ পড়ে যায়। বাদ পড়া শিশুদের ক্রমপুঞ্জীভূত সংখ্যা বাড়তে থাকে। এই বাদ পড়া শিশুর মোট সংখ্যা এক বছরে জন্ম নেওয়া শিশুদের সমান বা বেশি হলে হাম বা হামের মতো সংক্রামক রোগের প্রাদুর্ভাব দেখা দেওয়ার ঝুঁকি থাকে। বাংলাদেশ সেই পরিস্থিতির মুখে পড়েছিল।
জনস্বাস্থ্যবিদ মুশতাক হোসেন বলেন, হামের প্রাদুর্ভাবের সময় রোগটির উপসর্গ নিয়ে যারা হাসপাতালে আসছে, তারা সবাই হামের রোগী। উপসর্গ নিয়ে যাদের মৃত্যু হচ্ছে, তা হামেই মৃত্যু। প্রকৃত সংখ্যা আরও বেশি। হামে আক্রান্ত অনেকে চিকিৎসকদের ব্যক্তিগত চেম্বারে পরামর্শ নেয়, অনেকে চিকিৎসকের কাছে বা হাসপাতালেই যায় না। তাদের হিসাব সরকারি পরিসংখ্যানে নেই।
সময়ের আলো/প্রিন্ট/কেএইচও