জুলাই গণঅভ্যুত্থানের চেতনা ‘বিক্রি করে’ কারও কারও জীবনযাত্রা বদলে গেছে বলে সংসদে মন্তব্য করেছেন ময়মনসিংহ-১০ আসনের বিএনপির সংসদ সদস্য মোহাম্মদ আখতারুজ্জামান।
বৃহস্পতিবার জাতীয় সংসদে প্রস্তাবিত বাজেটের ওপর সাধারণ আলোচনায় অংশ নিয়ে তিনি বলেন, জুলাই তো বিক্রি করার বিষয় না। যারা জুলাই চেতনা বিক্রি করেন, তাদের প্রতি একটি অনুরোধ জানাব, অনেকেই রিকশায় চড়তেন, এখন প্রাডো গাড়িতে চড়েন আর জুলাই চেতনা বিক্রি করেন।
বিএনপির এই সংসদ সদস্য বলেন, আমরা জুলাই যুদ্ধ করেছি। আমি নিজেও করেছি। আমাদের এখানে যারা আছেন, অনেকেই জুলাই যুদ্ধ করেছেন, আমাদের সন্তানরা করেছেন। কিন্তু অনেকেই জুলাই চেতনা বিক্রি করেন মাননীয় স্পিকার, আমরা জুলাই চেতনা বিক্রি করি না। আমরা জুলাইকে ধারণ করি।
তিনি আরও বলেন, আমি অনুরোধ করব, তারা আগে কীসে চড়তেন এখন কীসে চড়েন? কোন বাসায় থাকেন তারা, মাঝেমধ্যে লাইভ করেন, লাইভ করলে এই জাতি দেখত, তারা আগে কোথায় ছিলেন, এখন পরিবর্তনটা কেমন হয়েছে?
বাজেটের প্রশংসা করে আখতারুজ্জামান বলেন, বাজেট পেশের আগে মানুষ উৎকণ্ঠায় থাকত কোন জিনিসের দাম বাড়বে। এবার অর্থমন্ত্রী একের পর এক পণ্যের শুল্ক ও ভ্যাট কমানোর ঘোষণা দিয়েছেন। নিত্যপ্রয়োজনীয় ৬০টি দ্রব্যের দাম কমানো হয়েছে। দাম বেড়েছে দুটি জিনিসের- সিগারেট ও মদের।
বিরোধীদের সমালোচনা করে তিনি বলেন, তারা বলেন, চানাচুর মার্কা বাজেট। আমরা শুনেছি, চানাচুর বাচ্চারা খায়। আবার বড়রাও খায়, কখন? অন্য কিছু খাওয়ার পরে নাকি চানাচুর খায়। সে জন্য মন খারাপ কি না আমি জানি না।
ময়মনসিংহ-৭ আসনের বিএনপির সংসদ সদস্য মোহাম্মদ মাহবুবুর রহমান বলেন, আওয়ামী লীগ তিনটা প্রজন্মকে ‘ইনজুর্ড’ করেছে। একটা হচ্ছে স্কুল, আরেকটা কলেজ, আরেকটা ইউনিভার্সিটি। এটা হলো নিরাপদ সড়ক, কোটা আন্দোলন; পরে হাসিনা খেদাও আন্দোলন। এই তিনটা জেনারেশন আগামী ৫০ বছর জীবিত থাকা অবস্থায় আওয়ামী লীগের বোধহয় ফিরে আসার সম্ভাবনা ক্ষীণ।
বাজেটকে ‘অসাধারণ’ আখ্যা দিয়ে মাহবুবুর রহমান শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ বাড়ানোর প্রশংসা করেন। হার্টের স্টেন্ট, কিডনি ডায়ালাইসিসের রিএজেন্টসহ স্বাস্থ্যসংশ্লিষ্ট খরচ কমানোর উদ্যোগ সাধারণ মানুষের জন্য গুরুত্বপূর্ণ বলেও মন্তব্য করেন তিনি। তবে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের ওপর কর নিয়ে আপত্তি জানিয়ে তিনি বলেন, বিশ্ববিদ্যালয় ট্রাস্টি বোর্ড পরিচালিত অলাভজনক প্রতিষ্ঠান; তাই এ ধরনের প্রতিষ্ঠানের ওপর কর থাকা উচিত নয়।
‘বড় ঋণখেলাপিদের ছাড়, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের ওপর কর’ : ঢাকা-১৬ আসনের জামায়াতের সংসদ সদস্য মো. আব্দুল বাতেন বলেন, বড় বড় ঋণখেলাপিদের ছাড় দিয়ে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের ওপর করের বোঝা চাপানো হলে তা কতটা সুফল দেবে, এটি প্রশ্নের বিষয়। ভ্যাটের প্রভাব ধনী ও দরিদ্রের ওপর সমানভাবে পড়ে। কিন্তু সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হন সাধারণ মানুষ ও দরিদ্র শ্রেণির মানুষ।
আব্দুল বাতেন মনে করেন, এই বাজেটে মধ্যবিত্ত এবং নিম্নআয়ের মানুষের জন্য খুব একটা ‘ভালো খবর’ নেই। পটুয়াখালী-২ আসনের জামায়াতে ইসলামীর সংসদ সদস্য শফিকুল ইসলাম মাসুদ বলেন, বাজেটের সাফল্য আসলে এখানে টেবিল চাপড়ানোর ওপর নির্ভর করে না। বাজেটের সাফল্য নির্ভর করে আমাদের মাঠপর্যায়ে যারা আছেন, বাজারবাসী আছেন, সেখানকার লোকদের মুখের হাসিতে। বাজেট উপস্থাপনার ধরন নিয়েও সমালোচনা করেন তিনি।
তার ভাষ্য, আধুনিক বিশ্বে বাজেট উপস্থাপনায় ইনফোগ্রাফিক, ভিজ্যুয়াল ড্যাশবোর্ড, তুলনামূলক চার্ট, সহজ টেবিল ও নাগরিক সংস্করণ থাকে। কিন্তু বাংলাদেশে বাজেট প্রণয়নে নাগরিক তো দূরের কথা, সংসদ সদস্যদেরও ভূমিকা রাখার সুযোগ কম। আদ-দ্বীন হাসপাতালের লাইসেন্স বাতিল হওয়ার প্রসঙ্গ তুলে তিনি বলেন, ছয় শিশুর মৃত্যুর ঘটনা ‘নিঃসন্দেহে দুর্ভাগ্যজনক’। কিন্তু সে ঘটনায় হাসপাতালের লাইসেন্স বাতিল করা হয়েছে। তাহলে ৩০০ শিশু হামে মারা গেল, আমাদের স্বাস্থ্যমন্ত্রী পদত্যাগের চিন্তা করেছেন কি না?
চট্টগ্রাম-১৬ আসনের সংসদ সদস্য মোহাম্মদ জহিরুল ইসলাম ক্যানসার রোগের আগাম শনাক্তকরণে উপজেলা পর্যায়ে স্ক্রিনিং মেশিন দেওয়ার দাবি জানিয়ে বলেন, দেশে বছরে দেড় লাখ থেকে দুই লাখ মানুষ ক্যানসারে আক্রান্ত হন; অধিকাংশ রোগী দেরিতে শনাক্ত হন। পরিবারগুলোকে পাঁচ থেকে ২০ লাখ টাকা পর্যন্ত নিজের পকেট থেকে খরচ করতে হয়। তার প্রস্তাব, ক্যানসার রোগের জন্য ৫ হাজার কোটি টাকার তহবিল গঠন করা হোক এবং প্রতিটি উপজেলায় আগাম শনাক্তকরণের মেশিন বাধ্যতামূলক করা হোক।
সপ্তাহের শেষে বিমানের টিকেটের দাম বেড়ে যাওয়ায় ক্ষোভ : দেশে কার্যরত চারটি মোবাইল ফোন কোম্পানির কাছে সরকারের ১৩ হাজার ৪০০ কোটি টাকা রাজস্ব পাওনা রয়েছে বলে জাতীয় সংসদে জানিয়েছেন সংসদ সদস্য জয়নুল আবদিন ফারুক। একই সঙ্গে মোবাইল ইন্টারনেটের মেয়াদ শেষ হলে অব্যবহৃত ডাটা কেটে নেওয়া এবং সপ্তাহের শেষ দিকে বিমানের টিকেটের দাম অস্বাভাবিক বৃদ্ধির প্রতিবাদ জানিয়েছেন তিনি।
বৃহস্পতিবার জাতীয় সংসদে পয়েন্ট অব অর্ডারে দাঁড়িয়ে তিনি বলেন, বুধবার ডাক ও টেলিযোগাযোগ মন্ত্রীর দেওয়া তথ্যে আমরা জেনেছি, চারটি টেলিফোন কোম্পানির কাছে সরকারের ১৩ হাজার ৪০০ কোটি টাকা পাওনা রয়েছে। একটি উন্নয়নশীল দেশে এটি বিশাল অঙ্কের রাজস্ব। গ্রামীণফোন, বাংলালিংক, রবি ও সরকারি প্রতিষ্ঠান টেলিটকের কাছে এই টাকা পাওনা।
জনস্বার্থসংশ্লিষ্ট আরও একটি বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করে তিনি বলেন, আমরা সাধারণ মানুষ এক মাসের জন্য হয়তো ১০০০ টাকার ইন্টারনেট কিনলাম। কিন্তু মাস শেষে দেখা গেল ৪০০ বা ৫০০ টাকার ইন্টারনেট অব্যবহৃত রয়ে গেছে। নিয়ম অনুযায়ী মেয়াদ শেষ হলে সেই টাকা বা ডাটা অটোমেটিক্যালি কোম্পানিগুলোর পকেটে চলে যায়। এটা জনগণের সঙ্গে এক ধরনের অন্যায়। এই টাকা কেন তারা নিয়ে যাবে?
বিমানের টিকেটের দাম নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করে এই সংসদ সদস্য বলেন, বৃহস্পতিবার ও শুক্রবার যারা যাতায়াত করেন, তাদের পকেট কাটা হচ্ছে। অন্যদিন যে টিকেটের দাম ২৮০০ বা ৩০০০ টাকা, বৃহস্পতিবার সেটি হয়ে যায় ১০ হাজার টাকা। এই বিষয়গুলো দেখা দরকার।
জয়নুল আবদিন ফারুকের এই বক্তব্যের সঙ্গে একমত পোষণ করেন বিরোধীদলীয় সংসদ সদস্য মুজিবুর রহমান বলেন, বিমানের টিকেটের ওপর যে জুলুম চলছে, সে বিষয়ে আমি আগেও নোটিস দিয়েছিলাম। কিন্তু কোনো সমাধান হয়নি। এটি আলোচনার যোগ্য একটি বিষয়। মানুষের ওপর এই জুলুম বন্ধ হওয়া উচিত।
মুজিবুর রহমান আরও বলেন, শুধু টেলিফোন কোম্পানি নয়, সাবেক অনেক সংসদ সদস্যের কাছেও টেলিফোন বিল ও বাড়ি ভাড়া বাবদ অনেক টাকা পাওনা রয়েছে। এই জাতীয় সম্পদগুলো উদ্ধারে সংসদকে কার্যকর ভূমিকা নিতে হবে। কেউ মারা যাওয়ার আগে যেন এই ঋণের বোঝা নিয়ে না যান, সে ব্যবস্থা করা উচিত।
সংসদ সদস্যদের বক্তব্যেও পরিপ্রেক্ষিতে ডেপুটি স্পিকার কায়সার কামাল বলেন, আপনারা জনস্বার্থসংশ্লিষ্ট যে বিষয় তুললেন, সেগুলোর জন্য যথাযথ বিধি মেনে নোটিস দিন। নোটিস দিলে আমরা অবশ্যই সংসদে এগুলো নিয়ে বিস্তারিত আলোচনার সুযোগ দেব।
দেশকে আরও এক লাখ কোটি টাকার ঋণের জালে বেঁধেছে সরকার : আখতার বর্তমান সরকার ক্ষমতা গ্রহণের মাত্র চার মাসের মধ্যে দেশকে আরও এক লাখ কোটি টাকার ঋণের জালে বেঁধে ফেলেছে বলে দাবি করেছেন রংপুর-৪ আসনের এনসিপির সংসদ সদস্য আখতার হোসেন। প্রস্তাবিত বাজেটের ওপর সাধারণ আলোচনায় অংশ নিয়ে তিনি বলেন, সরকার দায়িত্ব গ্রহণের সময় দেশের মোট ঋণের পরিমাণ ছিল প্রায় ২৩ লাখ কোটি টাকা। কিন্তু মাত্র চার মাসে তা বেড়ে ২৪ লাখ কোটি টাকায় পৌঁছেছে। অর্থাৎ এই সময়ের মধ্যে দেশকে আরও এক লাখ কোটি টাকার ঋণের বোঝা বহন করতে হয়েছে।
তিনি বলেন, আওয়ামী লীগ সরকারের সময় প্রকাশিত শ্বেতপত্রে ২৪০ বিলিয়ন ডলার বা প্রায় ৩০ লাখ কোটি টাকা বিদেশে পাচারের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। এত বিপুল অর্থ পাচারের ফলে দেশের অর্থনীতি কার্যত একটি খালি পাত্রে পরিণত হয়েছে। খেলাপি ঋণের প্রসঙ্গ টেনে আখতার হোসেন বলেন, দেশের বিপুল পরিমাণ অর্থ খেলাপি ঋণ হিসেবে আটকে রয়েছে।
এমনকি এই সংসদের দুজন সদস্য এখনও শপথ নিতে পারেননি, কারণ তারা খেলাপি ঋণ সংক্রান্ত মামলায় আদালতে জটিলতার মধ্যে রয়েছেন। এ বিষয়ে সরকারি দলের পক্ষ থেকে এখন পর্যন্ত কোনো ব্যাখ্যা পাওয়া যায়নি। খেলাপি ঋণের এই পরিস্থিতি দেশের অর্থনীতিকে পঙ্গুত্বের দিকে ঠেলে দিয়েছে।
সময়ের আলো/প্রিন্ট/কেএইচও