দীর্ঘ ছয় মাস পর অবশেষে খোলা হয়েছে কিশোরগঞ্জের ঐতিহাসিক পাগলা মসজিদের দানবাক্স। শনিবার (২৭ জুন) সকাল ৭টায় জেলা প্রশাসক ও পাগলা মসজিদ পরিচালনা কমিটির সভাপতি সোহানা নাসরিনের উপস্থিতিতে মসজিদের ১৩টি দানবাক্স বা সিন্দুক খোলা হয়।
সাধারণত তিন থেকে চার মাস পরপর এই দানবাক্সগুলো খোলা হলেও, এবার দীর্ঘ ছয় মাস পর খোলা হয়েছে। মসজিদ কমিটির সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, প্রতিবার দানবাক্স খোলার পরই দানের পরিমাণ আগের রেকর্ডকে ছাড়িয়ে যায়। এবার দীর্ঘ সময় পর বাক্সগুলো খোলায় আগের সব রেকর্ড ভেঙে নতুন ইতিহাস তৈরি হওয়ার অপেক্ষা করা হচ্ছে।
সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, ১৩টি দানবাক্স থেকে মোট ৪৩ বস্তা টাকা পাওয়া গেছে। বাক্সগুলো খোলার পর টাকাগুলো বস্তাবন্দী করে মসজিদের দোতলায় নেওয়া হয়েছে এবং কিছুক্ষণের মধ্যেই শুরু হবে টাকা গণনার মূল কাজ। দানবাক্স খোলা ও টাকা গণনার এই পুরো প্রক্রিয়াটি যেন সুষ্ঠু, স্বচ্ছ এবং শান্তিপূর্ণভাবে সম্পন্ন হয়, সে লক্ষ্যে মসজিদ প্রাঙ্গণ ও এর আশেপাশে বিপুল সংখ্যক আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য মোতায়েন করা হয়েছে।
এর আগে সর্বশেষ গত বছরের ২৭ ডিসেম্বর দানবাক্সগুলো খোলা হয়েছিল। সে সময় ১৩টি সিন্দুক থেকে ৩৫ বস্তা টাকা পাওয়া গিয়েছিল, যা গণনা শেষে রেকর্ড ১১ কোটি ৭৮ লাখ ৪৮ হাজার ৫৩৮ টাকা দাঁড়ায়। টাকার পাশাপাশি সেবারও বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা ও স্বর্ণালংকার পাওয়া গিয়েছিল। এবার বস্তার সংখ্যা আরও ৮টি বেশি হওয়ায় টাকার অংক আগের সব রেকর্ড ছাড়িয়ে যাবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
ঐতিহাসিক এই পাগলা মসজিদটি জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সব মানুষের কাছে এক সার্বজনীন পবিত্র ধর্মীয় কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত। স্থানীয় ও দূর-দূরান্ত থেকে আসা মানুষের মাঝে এক দৃঢ় বিশ্বাস রয়েছে যে, একনিষ্ঠ নিয়তে এই মসজিদে কোনো কিছু দান করলে মনের বাসনা পূরণ হয়। এই বিশ্বাসের কারণে মানুষ রোগমুক্তি, উচ্চ শিক্ষা, সন্তান লাভ কিংবা ব্যবসায়িক সাফল্যের মতো বিভিন্ন নিয়তে এখানে মানত করে থাকেন। দান হিসেবে কেবল টাকা-পয়সাই নয়, মানুষজন এখানে প্রচুর পরিমাণে স্বর্ণালংকার, বৈদেশিক মুদ্রা এবং হাঁস-মুরগি বা গবাদি প্রাণীর মতো বিভিন্ন পণ্যসামগ্রীও দান করে যান।
লোকমুখে প্রচলিত আছে, আড়াইশো বছর আগে এক পাগলবেশী আধ্যাত্মিক সাধক নরসুন্দা নদীর বুকে মাদুরে ভেসে এসে এই মসজিদের স্থানে অবস্থান নিয়েছিলেন। পরবর্তীতে তাকে কেন্দ্র করেই ভক্তদের সমাগম বাড়তে থাকে। সেই আধ্যাত্মিক সাধকের মৃত্যুর পর তার কবরের পাশে এই মসজিদটি নির্মাণ করা হয়, যা কালক্রমে ‘পাগলা মসজিদ’ নামে দেশজুড়ে সুপরিচিতি লাভ করে। কিশোরগঞ্জ সদরের নরসুন্দা নদীর তীরে প্রায় তিন একর ৮৮ শতাংশ জায়গার ওপর অবস্থিত এই ঐতিহাসিক মসজিদটি ১৯৭৯ সালের ১০ মে থেকে সরকারি ওয়াকফ-স্টেটের অধীনে পরিচালিত হয়ে আসছে। দানবাক্স থেকে প্রাপ্ত এই বিপুল অর্থ মসজিদের উন্নয়ন, এতিমখানা পরিচালনা এবং বিভিন্ন জনকল্যাণমূলক ও মানবিক কাজে ব্যয় করা হয়।
সময়ের আলো/কহু