মাদকমুক্ত সমাজ গঠনে ইসলামের নির্দেশনা

ইসলামের আলো ডেস্ক

ইসলাম

মাদক আধুনিক সভ্যতার অন্যতম ভয়াবহ সামাজিক ব্যাধি। এটি শুধু একজন মানুষের মস্তিষ্ক, লিভার, হৃদ্‌যন্ত্র ও মানসিক সুস্থতাকেই ধ্বংস করে না,

2026-06-27T10:01:47+00:00
2026-06-27T10:01:47+00:00
 
  শনিবার, ২৭ জুন ২০২৬,
১৩ আষাঢ় ১৪৩৩
শনিবার, ২৭ জুন ২০২৬
ইসলাম
মাদকমুক্ত সমাজ গঠনে ইসলামের নির্দেশনা
ইসলামের আলো ডেস্ক
প্রকাশ: শনিবার, ২৭ জুন, ২০২৬, ১০:০১ এএম 
পবিত্র কোরআন। ছবি : সংগৃহীত
মাদক আধুনিক সভ্যতার অন্যতম ভয়াবহ সামাজিক ব্যাধি। এটি শুধু একজন মানুষের মস্তিষ্ক, লিভার, হৃদ্‌যন্ত্র ও মানসিক সুস্থতাকেই ধ্বংস করে না, বরং তার নৈতিকতা, বিবেক-বুদ্ধি ও আত্মনিয়ন্ত্রণবোধও নষ্ট করে দেয়। ফলে ব্যক্তি যেমন বিপথগামী হয়, তেমনি সমাজে অপরাধ, সহিংসতা, পারিবারিক অশান্তি ও সামাজিক অবক্ষয়ের বিস্তার ঘটে। এ কারণেই ইসলাম মাদককে ‘উম্মুল খাবায়েস’ বা ‘সমস্ত অশ্লীল ও জঘন্য কাজের মূল’ হিসেবে অভিহিত করেছে।

ইসলামের শরিয়তের মৌলিক উদ্দেশ্য (মাকাসিদুশ শরিয়াহ) পাঁচটি—দ্বীন, জীবন, বংশ, সম্পদ ও বুদ্ধি সংরক্ষণ। এর মধ্যে ‘বুদ্ধি বা বিবেক রক্ষা’ একটি গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্য। যেহেতু মাদক মানুষের জ্ঞান-বিবেক ও চিন্তাশক্তিকে ধ্বংস করে, তাই ইসলাম এটিকে কঠোরভাবে হারাম ঘোষণা করেছে।

জাহিলি যুগের আরব সমাজে মদ্যপান ছিল অত্যন্ত প্রচলিত একটি অভ্যাস। মানুষের দীর্ঘদিনের এই আসক্তি একদিনে দূর করা সম্ভব ছিল না। তাই ইসলাম অত্যন্ত প্রজ্ঞা, মনস্তত্ত্ব ও বাস্তবতাকে সামনে রেখে ধাপে ধাপে মদ নিষিদ্ধ করেছে।

প্রথমে মদের ক্ষতিকর দিক মানুষের সামনে তুলে ধরা হয়। আল্লাহ তাআলা বলেন— ‘তারা আপনাকে মদ ও জুয়া সম্পর্কে জিজ্ঞেস করে। বলুন, এতে রয়েছে মহাপাপ এবং মানুষের জন্য কিছু উপকারও আছে; কিন্তু এর পাপ ও ক্ষতি উপকারের তুলনায় অনেক বেশি।’(সুরা বাকারা, আয়াত : ২১৯)

এই আয়াতের মাধ্যমে মানুষের মনে মদের ক্ষতিকর প্রভাব সম্পর্কে সচেতনতা সৃষ্টি করা হয়।


পরবর্তী পর্যায়ে নামাজের সময় মদ্যপান নিষিদ্ধ করা হয়, যাতে মানুষ অন্তত ইবাদতের সময় নেশামুক্ত ও সচেতন থাকে। আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন— ‘হে মুমিনগণ! তোমরা নেশাগ্রস্ত অবস্থায় নামাজের নিকটবর্তী হয়ো না, যতক্ষণ না তোমরা যা বলছ তা বুঝতে পারো।’(সুরা নিসা, আয়াত : ৪৩)

মানুষের মানসিক প্রস্তুতি সম্পূর্ণ হওয়ার পর আল্লাহ তাআলা মদকে চিরতরে হারাম ঘোষণা করেন। তিনি বলেন— ‘হে মুমিনগণ! নিশ্চয়ই মদ, জুয়া, প্রতিমার বেদি ও ভাগ্য নির্ধারণের তির শয়তানের অপবিত্র কাজ। অতএব তোমরা এগুলো থেকে বিরত থাকো, যাতে তোমরা সফলকাম হতে পারো।’(সুরা মায়িদা, আয়াত : ৯০–৯১)

এই ঘোষণার পর সাহাবায়ে কেরাম (রা.) বিনা দ্বিধায় মদ সম্পূর্ণরূপে বর্জন করেন, যা ইসলামের শিক্ষা গ্রহণে তাঁদের আনুগত্যের উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।

ইসলামে শুধু মাদক সেবনই নয়, বরং এর উৎপাদন, পরিবহন, ক্রয়-বিক্রয় ও প্রচার— সমগ্র মাদকচক্রকেই হারাম ঘোষণা করা হয়েছে।

রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন—‌ ‌‌‘প্রত্যেক নেশাজাতীয় বস্তুই মদ, আর প্রত্যেক মদই হারাম।’(সুনানে নাসায়ি)

অন্য এক হাদিসে রাসুলুল্লাহ (সা.) মাদকের সঙ্গে সম্পৃক্ত দশ শ্রেণির মানুষের ওপর লানত করেছেন। তারা হলো—

১. প্রস্তুতকারী
২. যার জন্য প্রস্তুত করা হয়
৩. সেবনকারী
৪. বহনকারী
৫. যার কাছে বহন করা হয়
৬. পরিবেশনকারী
৭. বিক্রেতা
৮. বিক্রির অর্থ ভোগকারী
৯. ক্রেতা
১০. যার জন্য ক্রয় করা হয়
(তিরমিজি)

এ থেকে স্পষ্ট হয় যে, ইসলাম মাদকের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট প্রতিটি কার্যক্রমকেই অপরাধ হিসেবে বিবেচনা করেছে।

মাদকমুক্ত সমাজ গঠনে ইসলামের নির্দেশনা

মাদকমুক্ত সমাজ প্রতিষ্ঠার জন্য ইসলাম ব্যক্তি, পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্র—সবার ওপরই দায়িত্ব অর্পণ করেছে।

১. আত্মিক ও ধর্মীয় অনুশাসন
আল্লাহভীতি, পরকালীন জবাবদিহির অনুভূতি এবং নিয়মিত ইবাদত মানুষের অন্তরে আত্মসংযম সৃষ্টি করে। ধর্মীয় মূল্যবোধ দৃঢ় হলে মাদকের প্রতি আকর্ষণ অনেকাংশে দূর হয়ে যায়।

২. পারিবারিক ও সামাজিক প্রতিরোধ
পরিবারকে সন্তানের বন্ধু নির্বাচন, চলাফেরা এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারের বিষয়ে সচেতন থাকতে হবে। অসৎ সঙ্গ, কুপ্রচার ও মাদকসংস্কৃতি থেকে সন্তানদের রক্ষা করতে হবে।

৩. কঠোর আইন ও শাস্তির প্রয়োগ
মাদক উৎপাদন, চোরাচালান, বিক্রয় ও প্রচারে জড়িত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি গ্রহণ করতে হবে। কার্যকর আইন প্রয়োগ ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির মাধ্যমে সমাজে মাদকের বিস্তার রোধ করা সম্ভব।

৪. যুবসমাজের কর্মসংস্থান ও সচেতনতামূলক কার্যক্রম
বেকারত্ব, হতাশা ও উদ্দেশ্যহীন জীবন অনেক সময় তরুণদের মাদকের দিকে ঠেলে দেয়। তাই কর্মসংস্থান সৃষ্টি, কারিগরি প্রশিক্ষণ, খেলাধুলা, সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড ও সমাজসেবায় যুবসমাজকে সম্পৃক্ত করতে হবে। পাশাপাশি আলেম, শিক্ষক, বুদ্ধিজীবী, সাংবাদিক ও সামাজিক সংগঠনগুলোকে নিয়মিত সচেতনতামূলক কার্যক্রম পরিচালনা করতে হবে।


অন্যান্য অনেক অপরাধ থেকে মানুষ সহজেই তওবা করে ফিরে আসতে পারে, কিন্তু মাদক এমন এক ভয়ংকর অভিশাপ, যা ধীরে ধীরে মানুষকে নিজের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে নেয় এবং তার আত্মশক্তিকে দুর্বল করে দেয়। তাই মাদক বর্জনের সিদ্ধান্ত একজন মানুষের জীবনের অন্যতম শ্রেষ্ঠ বিজয়।

একটি সুস্থ, নিরাপদ, নৈতিক ও সমৃদ্ধ সমাজ গড়তে ব্যক্তি, পরিবার, সমাজ এবং রাষ্ট্র—সবার সম্মিলিত উদ্যোগ অপরিহার্য। ইসলামের নির্দেশনা অনুসরণ করে যদি আমরা মাদকমুক্ত সমাজ গঠনে আন্তরিকভাবে এগিয়ে আসি, তবে একটি সুন্দর, সচেতন ও সম্ভাবনাময় ভবিষ্যৎ নির্মাণ করা সম্ভব।

সময়ের আলো/এসএকে


  বিষয়:   মাদক  সমাজ  গঠন  ইসলাম  নির্দেশনা 


Loading...
Loading...
ইসলাম- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: