চট্টগ্রামের লোহাগাড়ায় উপজেলা পরিষদের সরকারি কোয়ার্টারে দিনের পর দিন বিনা ভাড়ায় বসবাস করছেন বেশ কিছু সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী। কেউ সপরিবারে, আবার কেউবা ব্যাচেলর হিসেবে এসব কোয়ার্টার দখল করে আছেন। দুই-একজন ছাড়া কোয়ার্টারে বসবাসরত অধিকাংশ বাসিন্দাই সরকারি নিয়ম ভেঙে কোনো বাসা ভাড়া দিচ্ছেন না। অথচ প্রতি বছর বিদ্যুৎ বিল ও রক্ষণাবেক্ষণ বাবদ এসব ভবনের সংস্কার খাতে সরকারের লাখ লাখ টাকা খরচ হচ্ছে।
নিয়ম অনুযায়ী, সরকারি সব কর্মকর্তা-কর্মচারীকে তাদের মূল বেতনের সঙ্গে বেসিক অনুযায়ী বাসা ভাড়ার জন্য অতিরিক্ত অর্থ (বাড়ি ভাড়া ভাতা) দেওয়া হয়। কিন্তু লোহাগাড়ায় কোয়ার্টারে থেকেও ভাড়া না দেওয়ায় সরকার প্রতি মাসে বিপুল অঙ্কের রাজস্ব আয় থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। এই বকেয়া আবাসন ভাড়া আদায়ের জন্য অভিযুক্তদের কয়েক দফায় লিখিত নোটিশ দেওয়া হলেও তারা কোনো তোয়াক্কা করছেন না। উল্টো স্থানীয় গণমাধ্যমকর্মীদের অনুসন্ধানের খবর জানাজানি হলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ তড়িঘড়ি করে ভবনগুলো ‘পরিত্যক্ত’ ঘোষণা করার তোড়জোড় শুরু করেছে বলে একাধিক সূত্রে জানা গেছে।
উপজেলা বিআরডিবির ‘বেলি’ ও ‘চামেলি’ নামে দুটি আবাসিক ভবনে আটটি ইউনিট রয়েছে। এর মধ্যে চারটি ইউনিটের মোট বকেয়া ভাড়ার পরিমাণ প্রায় ৫ লাখ ৮৫ হাজার ৩৮৬ টাকা। বকেয়া থাকা কর্মকর্তাদের তালিকা নিচে দেওয়া হলো-
উপজেলা পল্লী সঞ্চয় ব্যাংক কর্মকর্তা শাহিন আক্তারের বকেয়া ১ লাখ ৪৫ হাজার ১০০ টাকা। পল্লী সঞ্চয় ব্যাংক কর্মকর্তা লিপিনা চাকমার বকেয়া ১ লাখ ২ হাজার ৮৮৬ টাকা। পল্লী সঞ্চয় ব্যাংক কর্মকর্তা ফারজানা আক্তারের বকেয়া ৭২ হাজার ৮০০ টাকা। পল্লী জীবিকায়ন প্রকল্পের মাঠ কর্মকর্তা রোজিনা বেগমের বকেয়া প্রায় ১ লাখ টাকা। ইউএনও অফিস ইলিয়াছ রুবেল ও তার ভাই সোহেল (উপজেলা প্রকৌশলী অফিস) দুজনের যৌথ বকেয়া প্রায় ১ লাখ ৩৫ হাজার টাকা।
উল্লেখ্য, বিআরডিবি’র বকেয়া ভাড়া পরিশোধ না করেই ইতোমধ্যে শাহিন আক্তার ও রোজিনা বেগম সরকারি বাসা ছেড়ে অন্যত্র চলে গেছেন।
এলজিইডি উপজেলা প্রকৌশল অফিসের কোয়ার্টার, এলজিইডির অধীনে থাকা ৫টি আবাসিক ভবনে উপজেলার বিভিন্ন অফিসের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা বাস করছেন। এই ভবনগুলোতেও একটি বিরাট অঙ্কের আবাসন ভাড়া বকেয়া রয়েছে। এই কোয়ার্টারগুলো যাদের নামে বরাদ্দ রয়েছে-লোহাগাড়া সহকারী কমিশনার-ভূমি মং এছেন। উপজেলা সহকারী প্রশাসনিক কর্মকর্তা ফয়সাল আমির। উপজেলা সহকারী শিক্ষা কর্মকর্তা মো. আবু জাফর।
এছাড়া উপজেলা কৃষি অফিস, মহিলা বিষয়ক অফিস, নির্বাচন অফিস, এলজিইডি অফিসের দেলোয়ার হোসেন ও শিশির কুমার, পল্লী সঞ্চয় ব্যাংকের ননী বালা ত্রিপুরা, মহিলা আনসার সদস্য, ইউএনও'র ড্রাইভার নাজিম উদ্দিন, শিক্ষক মো. আবদুল গফুর, পজীপ বিআরডিবির সুপ্তি বড়ুয়া ও আফসানা। এমনকি উপজেলা চেয়ারম্যানের বাংলোতে প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা এবং উপজেলা আনসার ক্যাম্পের সদস্যরাও অবস্থান করছেন।
লোহাগাড়া বিআরডিবির সহকারী পল্লী উন্নয়ন কর্মকর্তা মো. জালাল উদ্দিন বলেন, ইতোমধ্যে বকেয়া বাসা ভাড়া আদায়ের জন্য অভিযুক্তদের তিন দফায় লিখিত নোটিশ দেওয়া হয়েছে। সর্বশেষ গত ১৩ এপ্রিল তাদের ১০ কর্মদিবসের মধ্যে বকেয়া পরিশোধের আলটিমেটাম দেওয়া হয়। বিষয়টি আমরা তাদের সংশ্লিষ্ট ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদেরও লিখিতভাবে অবহিত করেছি।
অন্যদিকে, এলজিইডি ভবনের বকেয়া ভাড়া ও অবস্থানের সুনির্দিষ্ট তথ্য জানতে চাইলে উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) মো. বায়েজীদ-বিন-আখন্দ প্রথমে এক সপ্তাহ পর তথ্য দেওয়ার কথা বলেন। তবে এক সপ্তাহ পর পুনরায় যোগাযোগ করা হলে তিনি তথ্য দিতে গড়িমসি করেন এবং তথ্য অধিকার আইনে আবেদন করার পরামর্শ দিয়ে বিষয়টি এড়িয়ে যান। সংশ্লিষ্ট মহলের ধারণা, কর্তৃপক্ষের চরম উদাসীনতা ও যোগসাজশের কারণেই বিপুল অঙ্কের এই আবাসন ভাড়া আদায় প্রক্রিয়া ঝুলে আছে।
লোহাগাড়া উপজেলা দুর্নীতি প্রতিরোধ কমিটির সভাপতি অধ্যাপক মোহাম্মদ শফিক বলেন, সরকারি বিধি মোতাবেক যাদের আবাসন ভাড়া বকেয়া রয়েছে, তাদের কাছ থেকে নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে কঠোরভাবে ভাড়া আদায় করা উচিত।
সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন)-এর চট্টগ্রাম জেলা কমিটির সভাপতি প্রফেসর সিকান্দার খান এই প্রবণতার তীব্র নিন্দা জানিয়ে বলেন, সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীরা সরকারি কোয়ার্টারে থাকবেন, এটাই স্বাভাবিক। তবে তাদের অবশ্যই নির্দিষ্ট হারে ভাড়া পরিশোধ করতে হবে। এভাবে দীর্ঘদিন আবাসন ভাড়া বকেয়া রাখার অপসংস্কৃতি দেশে সুশাসন প্রতিষ্ঠার পথে একটি অন্যতম প্রধান অন্তরায়।
সময়ের আলো/জোই