সংস্কারের নামে রাস্তা ও কালভার্ট খুঁড়ে ফেলে রাখা হয়েছে দীর্ঘ দুই বছর। এর মধ্যে নতুন করে কোনো কাজ না হওয়ায় বর্ষার শুরুতেই সড়কটি যেন একেকটি ডোবায় পরিণত হয়েছে। ফলে চরম দুর্ভোগে পড়েছেন চট্টগ্রামের রাঙ্গুনিয়া উপজেলার পোমরা ইউনিয়ন ও রাঙ্গুনিয়া পৌরসভার সীমান্তবর্তী উত্তর নোয়াগাঁও এলাকার প্রায় ৫০০ পরিবারের ৪ থেকে ৫ হাজার মানুষ। যাতায়াত ব্যবস্থা সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ায় স্থবির হয়ে পড়েছে ওই অঞ্চলের মানুষের দৈনন্দিন জীবনযাত্রা।
এলজিইডি রাঙ্গুনিয়া কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, প্রায় ২০ কোটি টাকা ব্যয়ে ৯ কিলোমিটার সড়ক পাকা করা ও ছয়টি কালভার্ট নির্মাণের কাজ শুরু হয়েছিল। এর অংশ হিসেবে শান্তিরহাট-গুইয়াতলা সড়কের উত্তর নোয়াগাঁও এলাকার প্রায় এক কিলোমিটার সড়কটি দুই বছর আগে সংস্কারের উদ্যোগ নেয় সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ। সেই লক্ষ্যে রাস্তাটির পুরোনো পিচ ও খোয়া তুলে বড় বড় গর্ত করে খনন করা হয়। কিন্তু খননকাজ শেষ করার পরপরই ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান কাজ বন্ধ করে দেয়। এর মধ্যে রক্তছড়ি ছড়ার ওপর একটি গুরুত্বপূর্ণ কালভার্টের কাজ মাঝপথে অসম্পূর্ণ ফেলে রাখা হয়েছে দীর্ঘ ৮ মাস ধরে। চলতি ২০২৬ সালের জুন মাসেই প্রকল্পটির মেয়াদ শেষ হওয়ার কথা থাকলেও কাজের অগ্রগতি অত্যন্ত হতাশাজনক।
সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, একদিকে রাঙ্গুনিয়া পৌরসভার ১ নং ওয়ার্ড, অন্যদিকে পোমরা ইউনিয়নের ৯ নং ওয়ার্ড। এই দুই ওয়ার্ডের বাসিন্দাদের যাতায়াতের একমাত্র সড়কের সীমান্তে খালের ওপর কালভার্টের কাজ অসম্পূর্ণ ফেলে রেখেছে ঠিকাদার। স্থানীয় বাসিন্দারা বাধ্য হয়ে কালভার্টের একপাশে কাঠের তক্তার একটি বিপজ্জনক ফ্রেম লাগিয়ে চরম ঝুঁকি নিয়ে চলাচল করছেন। স্কুল-কলেজের কোমলমতি শিক্ষার্থীদেরও প্রতিদিন এই ‘মৃত্যুফাঁদ’ পেরিয়ে যাতায়াত করতে দেখা গেছে।
স্থানীয়রা আক্ষেপ করে বলেন, এলাকায় কেউ মারা গেলেও অসম্পূর্ণ কালভার্টটির কারণে লাশবাহী খাটিয়া এপার থেকে ওপারে আল্লামা রূমি মাদরাসার মাঠে জানাজার জন্য আনার কোনো উপায় থাকে না।
এই একটিমাত্র কালভার্টের অসম্পূর্ণ কাজের কারণে সবচেয়ে বড় প্রতিবন্ধকতার মুখে পড়েছে হুইলচেয়ারে চলাচল করা স্থানীয় শারীরিক প্রতিবন্ধী মাদরাসার শিক্ষার্থী রিফাত হাসান। সে পোমরা নঈমীয়া তৈয়্যবিয়া সিনিয়র ফাজিল মাদরাসার শিক্ষার্থী। গত আট মাস ধরে সে ঠিকমতো মাদরাসায় যেতে পারছে না। আগামীকাল ২৫ জুন তার চূড়ান্ত পরীক্ষা শুরু হওয়ার কথা। কিন্তু রাস্তা ও কালভার্টের এই ভয়াবহ অবস্থার কারণে সে কীভাবে পরীক্ষা কেন্দ্রে পৌঁছাবে, সেই চিন্তায় দিন কাটছে রিফাত ও তার পরিবারের। একইভাবে কোনো মুমূর্ষু বা গর্ভবতী রোগীকে জরুরি ভিত্তিতে হাসপাতালে নেওয়ার মতো কোনো পরিস্থিতিও বর্তমানে এই এলাকায় নেই।
স্থানীয় বাসিন্দারা সড়কে কাজের মান নিয়ে চরম অনিয়মের অভিযোগ তুলেছেন। ভুক্তভোগীদের দাবির কথা তুলে ধরে স্থানীয় অনার্স পড়ুয়া শিক্ষার্থী আরফাতুল ইসলাম নয়ন বলেন, সড়কটি খুঁড়ে ভেতরের ভালো মাটি ঠিকাদার চড়া দামে বাইরে বিক্রি করে দিয়েছে। পরবর্তীতে বালু দিয়ে গর্ত ভরাট করার কথা থাকলেও, তার বদলে ভরাট করা হয়েছে নরম পাহাড়ি মাটি দিয়ে। ফলে সামান্য বৃষ্টি হলেই পুরো সড়কটি এখন হাঁটু সমান কাদার নরককুণ্ডে পরিণত হয়। বর্তমানে রিকশা, ভ্যান বা অন্য কোনো যানবাহন চলাচল সম্পূর্ণ বন্ধ রয়েছে।
স্থানীয় প্রবীণ বাসিন্দা মুহাম্মদ আজিজ উদ্দিন ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, কোনো বিকল্প রাস্তা না রেখেই মূল সড়কটি কেটে ফেলা হয়েছে। ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের চরম উদাসীনতা এবং স্থানীয় প্রশাসনের নজরদারির অভাবে আমাদের হাজার হাজার মানুষকে এই অবরুদ্ধ জীবন পার করতে হচ্ছে।
মাদরাসার প্রধান শিক্ষক আবদুল মাবুদ জানান, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সামনে এমন বিপজ্জনক অবস্থা শিক্ষার্থীদের জন্য অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ এবং এটি অভিভাবকদের চরম উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
কাজের ধীরগতির বিষয়ে জানতে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ‘এ আলী এন্টারপ্রাইজ’ সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে যোগাযোগ করার চেষ্টা করা হলেও তাদের কাউকে পাওয়া যায়নি।
তবে এই বিষয়ে এলজিইডি রাঙ্গুনিয়া উপজেলা প্রকৌশলী রেজাউল করিম বলেন, কাজ শেষ করার জন্য ঠিকাদারকে কঠোর তাগিদ দেওয়া হয়েছে। কাজের অগ্রগতি বিবেচনা করে আগামী বছরের মার্চ পর্যন্ত মেয়াদ বাড়ানোর আবেদন করেছে তারা। প্রতিষ্ঠানটির অভ্যন্তরীণ কিছু জটিলতার কারণে মাঝখানে কাজ বন্ধ ছিল। এখন কাজ পুরোদমে শুরু করছে প্রতিষ্ঠানটি। কালভার্টের দুই পাশে মাটি ভরাট করে যাতায়াতের ব্যবস্থা করা হবে দুয়েকদিনের মধ্যেই। আশাকরি শীঘ্রই কাজটি শেষ হবে।
এদিকে স্থানীয় বাসিন্দারা সড়কে দাঁড়িয়ে এই দুর্ভোগের তীব্র প্রতিবাদ জানান এবং রাঙ্গুনিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. নাজমুল হাসানকে মৌখিকভাবে অভিযোগ করেন।
এ সময় স্থানীয়দের দুর্ভোগের কথা শুনে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে ইউএনও মো. নাজমুল হাসান বলেন, বিষয়টি আমি খতিয়ে দেখছি। জনভোগান্তি দূর করতে এবং প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীসহ সাধারণ মানুষের যাতায়াত নির্বিঘ্ন করতে যাতে দ্রুততম সময়ের মধ্যে সড়ক ও কালভার্টের অবশিষ্ট কাজটি বাস্তবায়ন করা যায়, সেই লক্ষ্যে প্রয়োজনীয় ও কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে।
সময়ের আলো/জোই