অবিরাম বর্ষণ এবং অপরিকল্পিত মাছের ঘের নির্মাণের ফলে সৃষ্ট স্থায়ী জলাবদ্ধতায় নড়াইলে বিস্তীর্ণ মাঠের আউশ ধান পুরোপুরি বিনষ্টের অভিযোগ করেছেন চাষীরা। তাদের অভিযোগ পানি নিষ্কাশনের স্বাভাবিক খাল আটকে ঘের তৈরি এবং সংরক্ষণের অভাবে খাল-নালা ভরাট হয়ে যাওয়ায় সৃষ্ট এই কৃত্রিম জলাবদ্ধতা কৃষকদের ঠেলে দিয়েছে চরম লোকসানে। এতে জেলা জুড়ে চাষীদের ক্ষতির পরিমাণ কয়েক কোটি টাকা ছাড়িয়ে যাবে বলে দাবি করছেন ভুক্তভোগীরা।
সরেজমিনে লোহাগড়া উপজেলার লক্ষ্মীপাশা ইউনিয়নের আমাদার বিল, আন্ধারকোটা বিল, কুচিয়াবাড়ির বিলসহ জেলার বিভিন্ন বিল ও ডোবা ঘুরে দেখা গেছে হৃদয়বিদারক দৃশ্য। বিলের অনেক জায়গায় এখন কোমর থেকে বুকসমান পানি। চোখের সীমানা জুড়ে ফসলের মাঠগুলোতে ধানের বদলে শোভা পাচ্ছে শাপলা, শালুক ও নানা জাতের জলজ আগাছা। ফসলশূন্য ক্ষেতে হাঁসের দলকে ঘুরে বেড়াতে দেখা যায়।
এই প্রতিবেদকের সাথে কথা হয় একাধিক কৃষকের। তারা জানান, অপেক্ষাকৃত নিচু জমিগুলোতে পানি-সহনশীল স্থানীয় জাতের ‘রাতুল আউশ’ চাষের জন্য খুবই উপযোগী। কোমর বা বুকসমান পানিতেও এই জাতের ধান টিকে থাকে এবং পানি বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে তাল মিলিয়ে বেড়ে ওঠে। বিগত কয়েক বছর সহনীয় বৃষ্টিপাতের কারণে ধীরে ধীরে পানি বৃদ্ধি পাওয়ায় রাতুল আউশের বাম্পার ফলন হয়েছিল। গত মৌসুমে আশাতীত ফলন ও ভালো দাম পাওয়ায় এবারও চাষিরা ব্যাপক উৎসাহে রাতুল আউশ আবাদে নেমেছিলেন।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, লক্ষ্মীপাশা, বাঁশগ্রাম, নলদী, কোটাকোল, কলাবাড়িয়া, বাঐসোনা, পহরডাঙ্গা, খাশিয়াল, মাইজপাড়া ও সেখহাটীসহ জেলার বিভিন্ন ইউনিয়নের অর্ধশতাধিক বিলের নিচু জমিতে বিপুল পরিমাণে আউশ ধানের চাষ করা হয়। কিন্তু জুলাইয়ের মাঝামাঝি থেকে শুরু হওয়া অঝোর ধারার বৃষ্টিতে সেই আশার ধান জলমগ্ন হয়ে পড়ে। এতদিন ধরে পানি জমে থাকায় ধানের সব গাছ পচে নষ্ট হয়ে গেছে।
চাষিদের মতে, বর্ষার জমে থাকা বাড়ত পানি দ্রুত নিষ্কাশন করা গেলে এই মহাবিপদ থেকে কিছুটা রক্ষা পাওয়া যেত। জলাবদ্ধতা নিরসনে অপরিকল্পিতভাবে গড়ে ওঠা ঘের-বেড়ি উচ্ছেদ, অবরুদ্ধ খাল-নালা পুনরুদ্ধার এবং বিলের সঙ্গে নদীর সংযোগ স্থাপনকারী সব খাল পুনঃখননের জোর দাবি জানিয়েছেন তারা।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের তথ্য অনুযায়ী, চলতি মৌসুমে জেলায় ৯ হাজার ১০৭ হেক্টর জমিতে আউশ আবাদ হয়েছে। অতিবর্ষণে ক্ষয়ক্ষতি সীমিত বলে কৃষি বিভাগ দাবি করলেও চাষীরা তা সরাসরি প্রত্যাখ্যান করেছেন। কৃষকদের দাবি, বিলের উপরিভাগের সামান্য ফসল বাঁচলেও নিচু এলাকার বেশিরভাগ ফসলই পুরো নষ্ট হয়ে গেছে, যার কারণে ক্ষতির পরিমাণ কয়েক কোটি টাকায় দাঁড়াবে।
বিলের স্থায়ী জলাবদ্ধতাকে চাষাবাদের জন্য বড় হুমকি হিসেবে স্বীকার করে নড়াইল কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের উপ-পরিচালক মুহাম্মদ আরিফুর রহমান জানান, জলাবদ্ধতা নিরসনে এবং হারিয়ে যাওয়া খাল-নালা উদ্ধারে কৃষি বিভাগ সরকারের অন্যান্য সংশ্লিষ্ট দফতরের সঙ্গে সমন্বয় সাধনের মাধ্যমে কাজ শুরু করেছে।
সময়ের আলো/আতা