ওয়াশিংটনে স্বাক্ষরিত ইসরায়েল-লেবানন ঐতিহাসিক ‘ফ্রেমওয়ার্ক চুক্তি’র কয়েক ঘণ্টার মাথায় মধ্যপ্রাচ্যে নতুন করে গৃহযুদ্ধ ও রক্তক্ষয়ী সংঘাতের আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। মার্কিন মধ্যস্থতায় হওয়া এই চুক্তিকে ‘অবমাননাকর, লজ্জাজনক এবং বৈরুতের সার্বভৌমত্ব বিসর্জন’ আখ্যা দিয়ে তা সরাসরি প্রত্যাখ্যান করেছে হিজবুল্লাহ। সংগঠনের প্রধান নঈম কাসেম স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন, হিজবুল্লাহর অস্ত্র সমর্পণ করার কোনো প্রশ্নই আসে না এবং মাঠের লড়াই অব্যাহত থাকবে।
এদিকে চুক্তি সইয়ের পর শনিবারই দক্ষিণ লেবাননে ইসরায়েলি বিমান হামলায় ১ জন নিহত ও ২ জন আহত হয়েছেন, যা চুক্তি-পরবর্তী প্রথম প্রাণহানির ঘটনা। হিজবুল্লাহ সমর্থকদের বিক্ষোভে বৈরুতসহ পুরো লেবানন এখন উত্তাল।
গত শুক্রবার ওয়াশিংটনে মার্কিন মধ্যস্থতায় লেবানন ও ইসরায়েলের মধ্যে এই ফ্রেমওয়ার্ক চুক্তি সই হয়। চুক্তির মূল শর্ত অনুযায়ী— দক্ষিণ লেবানন থেকে ইসরায়েলি সেনা প্রত্যাহারের বিষয়টি হিজবুল্লাহর সম্পূর্ণ নিরস্ত্রীকরণের (অস্ত্র সমর্পণ) সাথে জুড়ে দেওয়া হয়েছে।
শনিবার এক কড়া বিবৃতিতে হিজবুল্লাহ প্রধান নঈম কাসেম বলেন, দখলদারিত্বের অবসান ঘটাতে আমরা মাঠের প্রতিরোধ লড়াই চালিয়ে যাব। কঠিন পরিস্থিতিতেও আমরা মাঠ ছেড়ে যাইনি, আর এখনো যাব না। এই চুক্তি সইয়ের মাধ্যমে লেবানন সরকার আগামী বহু বছরের জন্য ইসরায়েলি দখলদারিত্বকে বৈধতা দিল, যা ভবিষ্যতে এই ভূমিকে জায়নবাদী রাষ্ট্রের অংশ করে নেওয়ার পথ সুগম করবে।
হিজবুল্লাহর সংসদ সদস্য হাসান ফাদলাল্লাহ আরও চরম হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছেন, লেবানন সেনাবাহিনী যদি ওয়াশিংটনের এই চুক্তি জোর করে বাস্তবায়ন করতে চায়, তবে দেশে ‘গৃহযুদ্ধ’ বেঁধে যাবে।
চুক্তির খবর ছড়িয়ে পড়তেই শুক্রবার রাত থেকে রাজধানী বৈরুতের রাস্তায় নেমে আসেন হাজার হাজার হিজবুল্লাহ সমর্থক। তারা শহরের বিভিন্ন সড়ক ও বিমানবন্দরের দিকে যাওয়ার মূল রাস্তায় টায়ার জ্বালিয়ে অবরোধ সৃষ্টি করেন।
পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে লেবানন সেনাবাহিনী দেশবাসীকে দায়িত্বশীল আচরণ করার আহ্বান জানিয়েছে। সেনা কমান্ড এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, আইনশৃঙ্খলার কোনো অবনতি বা নাগরিক শান্তি বিঘ্নিত করার চেষ্টা সহ্য করা হবে না। এরই মধ্যে বিক্ষোভকারীদের দমনে এবং দাঙ্গাবাজদের চিহ্নিত করে আইনি ব্যবস্থা নিতে নিরাপত্তা বাহিনীকে নির্দেশ দিয়েছেন পাবলিক প্রসিকিউটর বিচারক আহমাদ রামি আল-হাজ।
চুক্তিতে কাগজে-কলমে শান্তির কথা বলা হলেও, বাস্তব চিত্র সম্পূর্ণ ভিন্ন। আল-জাজিরার লেবানন প্রতিনিধি জিনা খোদর জানিয়েছেন, চুক্তির মূল টেক্সটে ইসরায়েলি সেনা ‘প্রত্যাহার’ শব্দটিই নেই। এটি মূলত দুই দেশের মধ্যে এক ধরনের পরোক্ষ সম্পর্ক স্বাভাবিকীকরণের পথ।
তাছাড়া ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু এবং অর্থমন্ত্রী বেজালেল স্মোট্রিচ ইঙ্গিত দিয়েছেন, হিজবুল্লাহ অস্ত্র সমর্পণ করলেও সুরক্ষার স্বার্থে ইসরায়েলি বাহিনী লেবাননে থেকে যেতে পারে। ইসরায়েলের প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইসরায়েল কাটজ ইতিমধ্যে দেশটির বাহিনীকে দক্ষিণ লেবাননের তথাকথিত ‘নিরাপত্তা জোনে’ দীর্ঘমেয়াদে অবস্থানের প্রস্তুতি নেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন।
এই চুক্তিকে কেন্দ্র করে লেবাননের রাজনৈতিক মহল দুই ভাগে বিভক্ত হয়ে পড়েছে। দেশটির সাবেক বিচারমন্ত্রী ও বর্তমান সংসদ সদস্য আশরাফ রিফি চুক্তির প্রশংসা করে বলেছেন, লেবানন অবশেষে একটি স্বাধীন রাষ্ট্রের মতো আচরণ করছে। লেবাননের সিদ্ধান্ত আর ইরানের এজেন্ডার কাছে জিম্মি থাকতে পারে না। ফ্রি প্যাট্রিয়টিক মুভমেন্টের নেতা জিবরান বাসিলও চুক্তিটি ইতিবাচকভাবে নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন।
তবে সাবেক মার্কিন কূটনীতিক নাবিল খুরি আল-জাজিরাকে বলেন, এই চুক্তিটি পুরোপুরি ইসরায়েলের স্বার্থরক্ষা করেছে, কিন্তু লেবাননের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তার জন্য এটি অত্যন্ত বিপজ্জনক এবং আত্মঘাতী।
সময়ের আলো/কহু