টানা দেড় বছরের তীব্র সরকারবিরোধী আন্দোলন ও গণবিক্ষোভের মুখে অবশেষে নতি স্বীকার করলেন সার্বিয়ার শক্তিশালী প্রেসিডেন্ট আলেকসান্ডার ভুচিক। শনিবার (২৭ জুন) রাজধানী বেলগ্রেডে এক বিশাল জনসমাবেশে তিনি ঘোষণা করেছেন, আগামী কয়েক সপ্তাহের মধ্যে তিনি রাষ্ট্রপতির পদ থেকে ইস্তফা দেবেন। একই সাথে দেশটিতে আগাম প্রেসিডেন্ট ও সংসদীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে।
১২ বছর ধরে সার্বিয়ার ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে থাকা ভুচিকের এই আকস্মিক ঘোষণা ইউরোপীয় রাজনীতির মঞ্চে এক বিশাল তোলপাড় সৃষ্টি করেছে। ২০০০ সালে যুগোস্লাভিয়ার সাবেক একনায়ক স্লোবোদান মিলোসেভিচের পতনের পর সার্বিয়াতে এত বড় গণআন্দোলন আর দেখা যায়নি। দীর্ঘ দিন ধরে সার্বিয়ায় একচ্ছত্র আধিপত্য বজায় রাখা ভুচিকের পতনের নেপথ্যে রয়েছে ২০২৪ সালের নভেম্বরের একটি মর্মান্তিক দুর্ঘটনা। দেশটির উত্তরাঞ্চলীয় শহর নোভি সাদে একটি রেলওয়ে স্টেশনের ছাদ ধসে ১৬ জন মানুষ নিহত হন।
শিক্ষার্থী, বিরোধী দল এবং মানবাধিকার সংগঠনগুলোর অভিযোগ, এই রাষ্ট্রীয় দুর্ঘটনা কোনো সাধারণ বিপর্যয় ছিল না; বরং এটি ছিল সরকারের ব্যাপক দুর্নীতি ও নিম্নমানের নির্মাণ প্রকল্পের একটি জীবন্ত প্রমাণ। এরপর থেকেই শিক্ষার্থীরা রাজপথে নেমে আসেন এবং গত ১৮ মাস ধরে দুর্নীতিবিরোধী আন্দোলন ও আগাম সাধারণ নির্বাচনের দাবিতে দেশ স্তব্ধ করে দেন।
চলতি দফায় ভুচিকের রাষ্ট্রপতির মেয়াদ ছিল ২০২৭ সালের মাঝামাঝি পর্যন্ত। কিন্তু সময়ের আগেই বিদায়ের ঘোষণা দিয়ে নিজের সমর্থকদের উদ্দেশে ভুচিক বলেনম, আমি আর মাত্র কয়েক সপ্তাহ রাষ্ট্রপতির দায়িত্বে আছি, তারপর পদত্যাগ করব। তবে আসন্ন নির্বাচনে আমাদের বিজয়ী তালিকার নাম হবে ইউনাইটেড সার্বিয়া এবং আমি আমার দল সার্বিয়ান প্রোগ্রেসিভ পার্টিকে জেতাতে সব শক্তি দিয়ে কাজ করব।
ভুচিকের এই ঘোষণাকে আন্দোলনের আংশিক বিজয় হিসেবে দেখছেন আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীরা। ছাত্র-নেতৃত্বাধীন বিরোধী আন্দোলন ‘মুভ-চেঞ্জ’-এর প্রধান সাভো মানোজলোভিচ কড়া ভাষায় বলেছেন, পদত্যাগ এবং আগাম নির্বাচনের ঘোষণা দিয়ে ভুচিক মূলত তার অনিবার্য পতনকে ঠেকাতে চাইছেন। কারণ তিনি ভালো করেই জানেন, ছাত্র আন্দোলন ও সাধারণ মানুষের সমর্থন এখন তার চেয়ে অনেক বেশি।
অন্যদিকে, তপ্ত আবহাওয়ার মধ্যে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে বাস ভর্তি করে আনা সমর্থকদের সামনে ভুচিক অভিযোগ করেছেন, আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীরা দেশকে ধ্বংস করার চেষ্টা করছে এবং তারা বিদেশি শক্তির উসকানিতে কাজ করছে। যদিও আন্দোলনকারীরা এই অভিযোগ সম্পূর্ণ প্রত্যাখ্যান করেছেন।
তবে ওয়ারশ-ভিত্তিক রাজনৈতিক বিশ্লেষক রাদিভোজে গ্রুজিচ বলেন, এটি ভুচিকের রাজনৈতিক জীবনের সমাপ্তি নয়। ক্ষমতা নিজের হাতে রাখতে তিনি তার কোনো বিশ্বস্ত সহযোগীকে রাষ্ট্রপতি পদে বসিয়ে নিজে প্রধানমন্ত্রীর আসনে বসার সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা করছেন। কারণ ভুচিকের এই পদত্যাগ আসলে এক রাজনৈতিক চাল। সার্বিয়ায় রাষ্ট্রপতির পদটি মূলত আনুষ্ঠানিক বা আলংকারিক। আসল ক্ষমতা থাকে প্রধানমন্ত্রীর হাতে। ভুচিক রাষ্ট্রপতি পদ থেকে ইস্তফা দিয়ে আসন্ন আগাম সংসদীয় নির্বাচনে জিতে পুনরায় প্রধানমন্ত্রী হওয়ার ছক কষছেন।