পরকীয়ার ভয়াবহ পরিণতি

মুফতি আনিসুর রহমান রিজভি

ইসলাম

মানবসভ্যতার ইতিহাসে পরিবারকে সমাজের মৌলিক ভিত্তি হিসেবে গণ্য করা হয়েছে। একটি সুস্থ, স্থিতিশীল ও নৈতিক সমাজ গঠনের মূল কেন্দ্রবিন্দু হলো

2026-06-28T10:38:50+00:00
2026-06-28T10:38:50+00:00
 
  রবিবার, ২৮ জুন ২০২৬,
১৪ আষাঢ় ১৪৩৩
রবিবার, ২৮ জুন ২০২৬
ইসলাম
পরকীয়ার ভয়াবহ পরিণতি
মুফতি আনিসুর রহমান রিজভি
প্রকাশ: রোববার, ২৮ জুন, ২০২৬, ১০:৩৮ এএম 
সংগৃহীত ছবি
মানবসভ্যতার ইতিহাসে পরিবারকে সমাজের মৌলিক ভিত্তি হিসেবে গণ্য করা হয়েছে। একটি সুস্থ, স্থিতিশীল ও নৈতিক সমাজ গঠনের মূল কেন্দ্রবিন্দু হলো পরিবার। আর এই পারিবারিক কাঠামোকে ধ্বংস করে দেয় এমন মারাত্মক অপরাধগুলোর মধ্যে অন্যতম হলো পরকীয়া বা ব্যভিচার। বর্তমান বিশ্বে প্রযুক্তির ব্যাপক বিস্তার, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অপব্যবহার, অশ্লীল সংস্কৃতির প্রসার এবং ধর্মীয় মূল্যবোধের অবক্ষয়ের ফলে এ অপরাধ উদ্বেগজনক হারে বৃদ্ধি পাচ্ছে। ফলে ভেঙে যাচ্ছে অসংখ্য পরিবার, নষ্ট হচ্ছে সামাজিক শান্তি এবং বিপন্ন হচ্ছে মানবিক মূল্যবোধ। ইসলাম ব্যক্তি, পরিবার ও সমাজজীবনের পবিত্রতা রক্ষার জন্য পরকীয়াকে কঠোরভাবে নিষিদ্ধ করেছে। কুরআন ও সুন্নাহতে এ অপরাধকে শুধু ব্যক্তিগত গুনাহ হিসেবে নয়; বরং সামাজিক বিপর্যয়ের অন্যতম কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।

কুরআনের দৃষ্টিতে পরকীয়া : পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ করেন, ‘ব্যভিচারিণী নারী ও ব্যভিচারী পুরুষ- তাদের প্রত্যেককে একশত বেত্রাঘাত করো’ (সুরা নূর : ২)। এই শাস্তি অবিবাহিত ব্যভিচারীদের জন্য নির্ধারিত। ইসলামের উদ্দেশ্য প্রতিশোধ নয়; বরং সমাজকে নৈতিক অবক্ষয় থেকে রক্ষা করা এবং অপরাধ প্রতিরোধ করা। অন্য আয়াতে আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘তোমরা ব্যভিচারের কাছে যেও না। নিশ্চয়ই এটি অশ্লীল কাজ এবং অত্যন্ত নিকৃষ্ট পথ’ (সুরা বনি ইসরাইল : ৩২)। এখানে বিশেষভাবে লক্ষণীয় যে, আল্লাহ তায়ালা শুধু ব্যভিচার করতে নিষেধ করেননি; বরং এর কাছেও যেতে নিষেধ করেছেন। অর্থাৎ এমন সব কাজ, সম্পর্ক ও পরিবেশ থেকেও দূরে থাকতে নির্দেশ দিয়েছেন, যা মানুষকে ধীরে ধীরে এ পাপের দিকে নিয়ে যায়। আল্লাহ তায়ালা আরও বলেন, ‘যে এসব কাজ করবে, সে শাস্তির সম্মুখীন হবে; কেয়ামতের দিন তার শাস্তি বহুগুণ বৃদ্ধি করা হবে এবং সে সেখানে অপমানিত অবস্থায় অবস্থান করবে’ (সুরা ফুরকান : ৬৮-৬৯)। এসব আয়াত থেকে স্পষ্টভাবে প্রতীয়মান হয় যে, পরকীয়া শুধু পার্থিব অপরাধ নয়; বরং আখেরাতের কঠিন জবাবদিহিতারও কারণ।
আরও পড়ুন

হাদিসের আলোকে পরকীয়ার ভয়াবহতা : রাসুলুল্লাহ (সা.) ব্যভিচারের ভয়াবহতা সম্পর্কে উম্মতকে বারবার সতর্ক করেছেন। তিনি বলেন, ‘ব্যভিচারী যখন ব্যভিচার করে, তখন সে পূর্ণ ঈমানদার অবস্থায় থাকে না’ (বুখারি, হাদিস : ২৪৭৫)। হাদিসটির অর্থ হলো, ব্যভিচার মানুষের ঈমানকে মারাত্মকভাবে দুর্বল করে দেয় এবং তাকে আল্লাহর রহমত থেকে দূরে সরিয়ে দেয়।

অন্য এক হাদিসে রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘যখন কোনো জাতির মধ্যে প্রকাশ্যে অশ্লীলতা ও ব্যভিচার ছড়িয়ে পড়ে, তখন তাদের মধ্যে এমন রোগব্যাধি ও মহামারি বিস্তার লাভ করে, যা পূর্ববর্তী জাতিসমূহের মধ্যে ছিল না’ (ইবনে মাজাহ, হাদিস : ৪০১৯)। এ হাদিস থেকে বোঝা যায় যে, নৈতিক অবক্ষয় শুধু ব্যক্তিগত ক্ষতির কারণ নয়; বরং তা সামগ্রিক সামাজিক দুর্ভোগ ডেকে আনে।

পরকীয়ার সামাজিক বিপর্যয় : পরকীয়া কোনো ব্যক্তিগত বিষয় নয়; এর ক্ষতিকর প্রভাব পুরো সমাজে ছড়িয়ে পড়ে। প্রথমত এটি দাম্পত্য জীবনের বিশ্বাস ও ভালোবাসাকে ধ্বংস করে। স্বামী-স্ত্রীর পারস্পরিক আস্থা নষ্ট হয়ে গেলে পরিবার ভেঙে পড়ে এবং বিচ্ছেদের ঘটনা বৃদ্ধি পায়। দ্বিতীয়ত সন্তানের মানসিক বিকাশ মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। পরিবারে অশান্তি ও বিচ্ছেদের কারণে শিশুরা হতাশা, অনিরাপত্তা ও নৈতিক সংকটে ভোগে। তৃতীয়ত সমাজে অবিশ্বাস, হিংসা, প্রতিশোধ এবং অপরাধপ্রবণতা বৃদ্ধি পায়। অনেক সময় পারিবারিক কলহ হত্যাকাণ্ড ও আত্মহত্যার মতো ভয়াবহ পরিণতির দিকে নিয়ে যায়। চতুর্থত বংশ পরিচয় ও পারিবারিক মূল্যবোধ ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ইসলামে বংশের পবিত্রতা সংরক্ষণকে অত্যন্ত গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। পরকীয়া সেই পবিত্র ব্যবস্থাকে ধ্বংস করে দেয়। 

পঞ্চমত সমাজে অশ্লীলতা ও নৈতিক অবক্ষয়ের সংস্কৃতি ছড়িয়ে পড়ে। যখন ব্যভিচারকে স্বাভাবিক বিষয় হিসেবে উপস্থাপন করা হয়, তখন নতুন প্রজন্মও ধীরে ধীরে তা গ্রহণ করতে শুরু করে।

পরকীয়ার প্রধান কারণ : পরকীয়ার পেছনে বিভিন্ন ধর্মীয়, সামাজিক ও মানসিক কারণ কাজ করে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলোÑ ঈমান ও আল্লাহভীতির অভাব, দৃষ্টি সংযম না করা, অবাধ নারী-পুরুষ মেলামেশা, অশ্লীল চলচ্চিত্র, নাটক ও অনলাইন কনটেন্ট, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অপব্যবহার, দাম্পত্য জীবনে অবহেলা ও পারস্পরিক দূরত্ব, ধর্মীয় ও নৈতিক শিক্ষার অভাব, স্মার্টফোন ও ইন্টারনেটের অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহার। এসব কারণ ধীরে ধীরে মানুষের অন্তরে পাপের প্রতি আকর্ষণ সৃষ্টি করে এবং তাকে পরকীয়ার দিকে ধাবিত করে।

ইসলামের প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা :
ইসলাম শুধু অপরাধের শাস্তি নির্ধারণ করেনি; বরং অপরাধ সংঘটিত হওয়ার আগেই তা প্রতিরোধের কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে। ইসলাম নারী-পুরুষ উভয়কে দৃষ্টি সংযমের নির্দেশ দিয়েছ। পর্দা, শালীনতা ও নৈতিকতা বজায় রাখতে উৎসাহিত করেছে। বৈধ বিবাহকে সহজ করার এবং অবৈধ সম্পর্কের পথ বন্ধ করার নির্দেশ দিয়েছে। একই সঙ্গে ইসলাম নির্জন সাক্ষাৎ, অশ্লীলতা, অবৈধ সম্পর্ক এবং উত্তেজনাপূর্ণ পরিবেশ থেকে দূরে থাকার শিক্ষা দিয়েছে। নিয়মিত নামাজ, কুরআন তেলাওয়াত, জিকির, তাকওয়া এবং আত্মশুদ্ধির চর্চা মানুষকে এ ধরনের পাপ থেকে রক্ষা করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

তওবার দ্বার সর্বদা উন্মুক্ত
ইসলাম মানুষের জন্য হতাশার নয়; বরং আশার বার্তা নিয়ে এসেছে। কেউ যদি এ পাপে জড়িয়ে পড়ে, তবে তার জন্য আন্তরিক তওবার পথ খোলা রয়েছে। আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘যারা তওবা করে, ঈমান আনে এবং সৎকর্ম করে, আল্লাহ তাদের মন্দ কাজগুলোকে নেকিতে পরিবর্তন করে দেন’ (সুরা ফুরকান : ৭০)। অতএব, কোনো ব্যক্তি যদি আন্তরিক অনুশোচনার সঙ্গে আল্লাহর কাছে ফিরে আসে এবং ভবিষ্যতে এ পাপ থেকে বিরত থাকার দৃঢ় সংকল্প গ্রহণ করে, তবে আল্লাহ তায়ালার রহমত থেকে নিরাশ হওয়ার কোনো কারণ নেই। আজ যখন পারিবারিক বন্ধন নানা চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি, তখন আমাদের উচিত ইসলামী মূল্যবোধে ফিরে আসা, আত্মসংযম চর্চা করা, সন্তানদের নৈতিক শিক্ষায় শিক্ষিত করা এবং পারিবারিক সম্পর্ককে আরও সুদৃঢ় করা। তা হলেই আমরা নৈতিক অবক্ষয়মুক্ত, শান্তিপূর্ণ ও কল্যাণময় সমাজ গড়ে তুলতে সক্ষম হব ইনশাআল্লাহ।

প্রভাষক, মাদরাসা-এ তৈয়্যবিয়া ইসলামিয়া সুন্নিয়া ফাযিল (ডিগ্রি), বন্দর, চট্টগ্রাম

এএডি/


  বিষয়:   পরকীয়া  ভয়াবহ  পরিণতি 


Loading...
Loading...
ইসলাম- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: