জন্ম থেকেই শারীরিক প্রতিবন্ধী। নিজে চলাফেরা করতে পারেন না। কথাও বলেন অস্পষ্ট। তারপরও থেমে নেই জয় হালদার (১৯)। অদম্য ইচ্ছাশক্তিকে কাজে লাগিয়ে এলাকায় সাড়া ফেলে দিয়েছেন তিনি। পা দিয়ে স্মার্টফোন চালিয়ে সাইবার, ডিজিটাল মার্কেটিং, ফ্রিল্যান্সিং প্ল্যাটফর্মগুলো আয়ত্তে নিয়ে এসেছেন। তার ইচ্ছে, কর্মদক্ষতার মাধ্যমে সংসারের হাল ধরা।
প্রতিবন্ধী জয় হালদার গোপালগঞ্জের কোটালীপাড়ার রামশীল ইউনিয়নের রাজাপুর গ্রামের দরিদ্র কৃষক পরিবারের সন্তান। তিন ভাই বোনের মধ্য জয় সবার বড়। কোনো প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা নেই তার। তবু তিনি বড় স্বপ্ন দেখেন। তার দাবি, একটি ল্যাপটপ ও ভালো মানের স্মার্টফোন হলে ডিজিটাল মার্কেটিং ও ফ্রিল্যান্সিংয়ের মাধ্যমে স্বাবলম্বী হতে পারতেন।
ভাঙা ভাঙা কণ্ঠে জয় বলেন,‘মানুষ চিরদিন বেঁচে থাকে না। আমার মা-বাবাও একসময় বেঁচে থাকবেন না। তখন আমার কী হবে? আমাকে কে দেখাশোনা করবে? এই চিন্তা থেকে আমি কিছু করতে চাই। আমি কারও বোঝা হতে চাই না।’
পা দিয়ে ফোন চালিয়ে অনেক কাজ করতে পারেন জয় হালদার।
তিনি আরও বলেন, ‘একটি ল্যাপটপ ও স্মার্ট মোবাইল ফোনের জন্য অনেক আগেই আমি জেলা প্রশাসক ও উপজেলা নির্বাহী স্যারের কাছে হোয়াটসঅ্যাপে আবেদন পাঠিয়েছিলাম। কিন্তু তারা আমার সেই আবেদন সাড়া দেননি। তাই আমি আপনাদের (সাংবাদিকদের) মাধ্যমে প্রধানমন্ত্রী ও এস এম জিলানী স্যারের কাছে আমার দাবি জানাচ্ছি।’
জয় হালদারের বাবা সুশীল হালদার বলেন, ‘জয় বেশিরভাগ সময় ঘরে একা থাকে। তাই সে সময় কাটানোর জন্য আমার কাছে একটি মোবাইল ফোন চায়। ৭ বছর আগে আমি ওকে ১২ হাজার টাকা দিয়ে একটি স্মার্ট মোবাইল ফোন কিনে দেই। পা দিয়ে মোবাইল চালাতে চালাতে ও এখন বিশ্বের সকল খবর রাখছে। মোবাইল দিয়ে ইংরেজি ও বাংলাও লিখতে পারে।’
তিনি আরও বলেন, ‘আমাদের এলাকার সবাই ওকে দিয়ে বিকাশ, নগদ একাউন্ট খুলিয়ে নেয়। এলাকার মানুষদের জমির পরচা উঠানোর আবেদন করে দেয়। তা ছাড়া অনেকের বিধবা বা বয়স্ক ভাতার আবেদনও জয় করে দিয়েছে।’
জয়ের মা বীভা হালদার বলেন, ‘আমি আমার ছেলেকে পরিবারের বোঝা মনে করি না। প্রতিদিনই ওর কাছে বিভিন্ন শ্রেণির মানুষ মোবাইল ও ল্যাপটপের কাজ শিখতে আসে। ও তাদের কাজ করে দেয়। এতে আমাদের খুব ভালোলাগে।’
তবে দুঃখ করে বীভা হালদার বলেন, ‘জয় এখন অনেক বড় হয়ে গেছে। ও যখন বাথরুমে যায়, তখন ঘরের বাইরে নিয়ে যেতে হয়। এতে আমার খুব কষ্ট হয়। তাই ঘরের সঙ্গে যদি একটা বাথরুম করতে পারতাম, তা হলে কষ্টটা একটু কম হতো।’
রাজাপুর গ্রামের বিশিষ্ট লেখক ও নাট্যকার আকাশ রঞ্জন বলেন, ‘জয় হালদার আমাদের গ্রামের গর্ব। ওর মতো বিরল প্রতিভার মানুষ আমি আগে কখনও দেখিনি। ওর এই মেধা আমাদের কাজে লাগানো উচিত।’
উপজেলা নির্বাহী অফিসার সাগুফতা হক বলেন, ‘আমি কিছু দিন আগে হোয়াটসঅ্যাপে জয় হালদারের একটি আবেদন পেয়েছি। এই আবেদনের মাধ্যমে সে আমার কাছে একটি ল্যাপটপ ও স্মার্ট মোবাইল ফোন দাবি করেছিল। আমি ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে তার আবেদন রক্ষা করার চেষ্টা করব।’