ময়মনসিংহের ত্রিশাল উপজেলার বালিপাড়া ইউনিয়নের বালিপাড়া গ্রামের একটি পরিবারের চার সদস্য জন্মগতভাবে বাকপ্রতিবন্ধী। কথা বলতে না পারলেও জীবনযুদ্ধ থেমে নেই তাদের। চরম দারিদ্র্য আর নানা সীমাবদ্ধতার মধ্যেও ভিক্ষাবৃত্তি নয়, পরিশ্রম করেই পরিবার চালানোর চেষ্টা করছেন পরিবারের বড় ছেলে শামীম মিয়া (৩৮)।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, শামীম মিয়া জন্ম থেকেই বাক-প্রতিবন্ধী। পরবর্তীতে তার ছোট ভাই সুমন মিয়া ও ছোট বোন সাকিনও একই সমস্যায় আক্রান্ত হন। পরে সাকিনের ছেলে সাজ্জাদ মিয়াও জন্মগতভাবে বাক-প্রতিবন্ধী হয়ে জন্ম নেয়। ফলে বর্তমানে একই পরিবারের চারজন বাক-প্রতিবন্ধী সদস্য মানবেতর জীবনযাপন করছেন।
শামীম মিয়ার সংসারে দুই মেয়ে ও এক ছেলে রয়েছে। অপরদিকে সুমন মিয়ার সংসারে দুই ছেলে ও দুই মেয়ে। বাক-প্রতিবন্ধী হওয়ায় সাকিনের দাম্পত্য জীবন টেকেনি। স্বামীর সংসার থেকে ফিরে এসে তিনি এখন ছেলে সাজ্জাদকে নিয়ে বাবার বাড়িতেই বসবাস করছেন।
পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম সদস্য শামীম মিয়া। বাক-প্রতিবন্ধী হলেও তিনি ভিক্ষাবৃত্তিকে বেছে নেননি। একটি ভাড়া দোকানে চা স্টল দিয়ে কাজ করে যে আয় হয়, তা দিয়েই পরিবারের খরচ চালানোর চেষ্টা করেন। তবে সীমিত আয়ে সংসারের প্রয়োজন মেটাতে প্রতিনিয়ত হিমশিম খেতে হচ্ছে তাকে। নিজেদের থাকার জন্য একটি ঘর ছাড়া উল্লেখযোগ্য কোনো সম্পদও নেই পরিবারের।
সম্প্রতি সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, ত্রিশাল উপজেলার বালিপাড়া ইউনিয়নের ধলা বাজার রেলওয়ে স্টেশনের সামনে একটি ছোট টিনের ঝুপড়ি দোকানে চা ও পান বিক্রি করছেন শামীম মিয়া। কথা বলতে না পারলেও চা তৈরিতে তার দক্ষতা চোখে পড়ার মতো। হাসিমুখে ক্রেতাদের জন্য আদা ও লেবু দিয়ে লাল চা বানিয়ে দেন। ইশারা-ইঙ্গিতেই ক্রেতাদের চাহিদা বুঝে সেবা দেন তিনি।
শামীমের ছোট্ট চায়ের দোকানে প্রতিদিন বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের আনাগোনা থাকে। স্বল্প আয়ের এই দোকানই তার পরিবারের একমাত্র অবলম্বন। দোকানের পাশের একটি বাড়িতে গৃহকর্মীর কাজ করেন শামীমের বাক-প্রতিবন্ধী ছোট বোন সাকিন। কাজের ফাঁকে তিনি নিয়মিত ভাইয়ের দোকানে এসে খোঁজখবর নেন। ভাই-বোনের এই নীরব যোগাযোগ যেন ভাষাহীন এক গভীর মমতার।
স্থানীয় ধলা বাজারের ব্যবসায়ী ও শামীমের প্রতিবেশী আব্দুল মতিন বলেন, শামীমের বাবা এই বাজারেই চা বিক্রি করতেন। এখানেই তিনি মারা যান। এখন শামীম বাবার মতোই একটি ছোট চায়ের দোকান চালিয়ে সংসার চালানোর চেষ্টা করছে। তার পরিবারের চারজন বাক-প্রতিবন্ধী। মাত্র ৫ টাকা কাপ দরে লাল চা বিক্রি করে যে আয় হয়, তা দিয়ে দোকান ভাড়া, বিদ্যুৎ বিল, চা-চিনি ও অন্যান্য খরচ মেটানোর পর হাতে তেমন কিছুই থাকে না। কথা বলতে না পারলেও শামীম সংগ্রাম করে বাঁচতে শিখেছে। কখনো কারও কাছে হাত পেতে কিছু চায় না।
তিনি আরও বলেন, মা, ভাই, বোন, স্ত্রী ও সন্তানদের নিয়ে তার বড় পরিবার। এত অল্প আয়ে সংসার চালাতে তাকে অনেক কষ্ট করতে হয়। ধলা বাজারে সরকারি খাস জমি রয়েছে। সেখানে শামীমের স্থায়ী কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করে দিলে সে সম্মানের সঙ্গে পরিবারের ভরণপোষণ করতে পারবে।
স্থানীয় বাসিন্দা মিজান মিয়া ও শেখ ফরিদ বলেন, শামীমের পরিবার অনেক কষ্টে দিন কাটাচ্ছে। তাদের থাকার জন্য একটি ঘর ছাড়া আর কিছুই নেই। শামীম ভাড়া দোকানে চা বিক্রি করে পরিবার চালানোর চেষ্টা করেন। সরকারি ও সমাজের বিত্তবানদের সহযোগিতা পেলে পরিবারটি স্বাভাবিকভাবে বেঁচে থাকার সুযোগ পেত।
এলাকার বাসিন্দা সাইদুর রহমান বলেন, শামীম ছোটোবেলা থেকেই আমাদের এলাকায় বড় হয়েছে। সে কখনো কারও কাছে হাত পাতে না। তাই আমরা এলাকাবাসী মিলে তাকে একটি ভাড়া দোকানে চায়ের ব্যবসা করার ব্যবস্থা করে দিয়েছি।
তিনি বলেন, শামীমের পরিবারের চারজন বাক-প্রতিবন্ধী। তাদের মধ্যে দুজন সরকারি প্রতিবন্ধী ভাতা পান। শামীমের ছোট বোন আমার বাসায় কাজ করেন। তাদের ভাষা সবাই বুঝতে না পারলেও আমি কিছুটা বুঝতে পারি। শামীমের বাবা মারা গেছেন। এখন পরিবারের সবার দায়িত্ব তার কাঁধে। অনেক কষ্ট করে সে পরিবার চালিয়ে যাচ্ছে। সরকার যদি তাদের পাশে দাঁড়ায় এবং আরও সহযোগিতা করে, তাহলে তাদের দুর্ভোগ অনেকটাই কমে আসবে।
বালিপাড়া ইউনিয়ন পরিষদের প্রশাসক শফিকুল ইসলাম বলেন, একই পরিবারের চারজন বাক্প্রতিবন্ধী থাকার বিষয়টি আমার জানা নেই। আমি খোঁজ নিয়ে দেখব। তারা যদি কোনো ধরনের সরকারি ভাতা থেকে বঞ্চিত হয়ে থাকে, তাহলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
সময়ের আলো/জোই