স্বপ্নটা ছিল খুব সাধারণ-কিছু টাকা জমিয়ে সংসারের অভাব ঘোচানো, বাবা-মায়ের মুখে একটু হাসি ফোটানো। সেই স্বপ্ন নিয়েই গ্রাম ছেড়ে দূরের শহরে পাড়ি জমিয়েছিল রানা মিয়া আর খোকন মিয়া। কেউ জানত না, ফেরার পথটা এভাবে বন্ধ হয়ে যাবে। শনিবার (১৫ আগস্ট) দুপুরে গাইবান্ধায় পৌঁছাল দুটি অ্যাম্বুলেন্স-ভেতরে অভাব জয়ের স্বপ্নে বিভোর দুই তরুণের নিথর দেহ, কাঠের কফিনে মোড়ানো। চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডে জাহাজভাঙা কারখানায় বিষাক্ত গ্যাসে প্রাণ হারানো এই দুই শ্রমিকের মরদেহ যখন গ্রামের বাড়িতে পৌঁছায়, তখন কান্না আর আহাজারিতে ভারী হয়ে ওঠে চারপাশের বাতাস।
গত শুক্রবার (১৪ আগস্ট) সকালে চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ড উপজেলার ভাটিয়ারী ইউনিয়নের স্টেশন রোড এলাকায় ফেরদৌস স্টিল শিপ ব্রেকিং ইয়ার্ডে ভয়াবহ এই দুর্ঘটনা ঘটে। স্ক্র্যাপ জাহাজের একটি গ্যাস সিলিন্ডার থেকে হঠাৎ বিষাক্ত গ্যাস ছড়িয়ে পড়লে তাতে দমবন্ধ হয়ে ঘটনাস্থলেই মারা যান নয়জন শ্রমিক। নিহতদের মধ্যে পাঁচজন ভাটিয়ারীর স্থানীয় বাসিন্দা, একজনের বাড়ি পাবনায় আর বাকি দুজনের বাড়ি গাইবান্ধা জেলায়।
পরদিন শনিবার অ্যাম্বুলেন্সযোগে দুই শ্রমিকের মরদেহ পৌঁছায় তাদের নিজ নিজ গ্রামে। দুপুরে জানাজা শেষে পারিবারিক কবরস্থানে সম্পন্ন হয় দাফন।
গাইবান্ধা সদর উপজেলার পশ্চিম কুপতলা গ্রামের হারুন অর রশিদের ছেলে রানা মিয়া (২৩)। কিছুদিন আগেই তিনি গাইবান্ধা জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে অফিস সহায়ক পদে চাকরির জন্য আবেদন করেছিলেন। আগামী ২১ আগস্ট ছিল সেই পদের লিখিত পরীক্ষা। পরীক্ষা দিতে শনিবারই বাড়ি ফেরার কথা ছিল তার। কিন্তু ফিরলেন লাশ হয়ে।
ছেলের মরদেহ দেখে উঠানের এক কোণে বসে কাঁদছিলেন বর্গাচাষি বাবা হারুন অর রশীদ। ভাঙা গলায় তিনি বলেন, সংসারে অভাব ছিল, ছেলে প্রতি মাসে কিছু টাকা পাঠাত, তাতেই কোনোমতে চলত সংসার। এখন সেই সহায়তা কে দেবে, জানেন না তিনি।
রানার মা মনোয়ারা বেগম ছেলের ছবি বুকে নিয়ে বিলাপ করছিলেন। তার ভাষায়, পরিবারের কষ্ট ঘোচাতেই ছেলে চাকরিতে গিয়েছিল, টাকা জমিয়ে ঘরবাড়ি করার স্বপ্ন দেখেছিল। কিন্তু সেই স্বপ্ন পূরণের আগেই সব শেষ হয়ে গেল।
স্বজনরা জানান, ২০২১ সালে পশ্চিম কুপতলা উচ্চ বিদ্যালয় থেকে এসএসসি এবং ২০২৩ সালে সাদুল্লাপুর ডিগ্রি কলেজ থেকে এইচএসসি পাস করেন রানা। এরপর পরিবারের অভাব ঘোচাতে সীতাকুণ্ডের ওই শিপইয়ার্ডে শ্রমিকের কাজ নেন। বড় ভাই মোনারুল ইসলাম নিজেও চট্টগ্রামে চাকরি করেন, থাকেন স্ত্রীকে নিয়ে। তিনিই ভাইয়ের মরদেহ নিয়ে বাড়ি ফেরেন। রানাদের তিন ভাইবোনের মধ্যে একমাত্র বোন পিংকির বিয়ে হয়ে গেছে।
মরদেহ বাড়িতে পৌঁছানোর পর প্রতিবেশীরা এক নজর দেখতে ভিড় করেন উঠানে। জোহরের নামাজের পর জানাজা শেষে পারিবারিক কবরস্থানে দাফন করা হয় তাকে।
সুন্দরগঞ্জ উপজেলার ধোপাডাঙ্গা ইউনিয়নের কিশামত হলদিয়া গ্রামের রানু মিয়ার ছেলে খোকন মিয়া (২৬)-পরিবারের সবার ছোট সন্তান। প্রায় ছয় মাস আগে তিনি চট্টগ্রামের একটি জাহাজভাঙা কোম্পানিতে চাকরি নিয়েছিলেন। তার স্ত্রী দুই বছরের সন্তান নিয়ে ঢাকায় একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরি করেন।
পরিবারে খোকনের বড় ভাই উজ্জ্বল মিয়া কৃষিকাজ করেন, মেজো বোনের বিয়ে হয়ে গেছে। বাবা পেশায় বর্গাচাষি।
শনিবার দুপুরে খোকনের মরদেহও অ্যাম্বুলেন্সে করে পৌঁছায় গ্রামের বাড়িতে। দুপুরে জানাজা শেষে পারিবারিক কবরস্থানেই তাকে দাফন করা হয়।
সীতাকুণ্ডের ওই দুর্ঘটনায় নিহত নয়জন হলেন, মতিউর রহমান (১৯), সানি জলদাস (২৩), পলাশ জলদাস (৩৫), হাবিবুর রহমান (৫১), মোহাম্মদ মনসুর (৫৫), নাসির উদ্দিন (৫১), আবদুল আলীম (৩৬), রানা মিয়া (২৩) ও খোকন মিয়া (২৬)। এদের মধ্যে মনসুর ও নাসির উদ্দিন সহোদর ভাই ছিলেন এবং পাঁচজনই ছিলেন ভাটিয়ারীর স্থায়ী বাসিন্দা। আবদুল আলীমের বাড়ি পাবনা জেলায়।
গাইবান্ধার দুই পরিবারে এখন শুধুই শূন্যতা। যে দুই তরুণ পরিবারের অভাব ঘোচাতে দূর প্রবাসে নয়, নিজ দেশের কারখানাতেই শ্রম দিতে গিয়েছিলেন, তারাই আর ফিরলেন না জীবিত অবস্থায়। রেখে গেলেন দুটি পরিবারের অপূরণীয় ক্ষতি আর অনিশ্চিত ভবিষ্যতের প্রশ্ন।
মেয়ের আলো/জোই