চীনের সঙ্গে বাংলাদেশের বাণিজ্যে নতুন একটি সম্ভাবনার দুয়ার খুলেছে কাঁঠাল। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সাম্প্রতিক চীন সফরে দুই দেশের মধ্যে বাংলাদেশ থেকে কাঁঠাল রফতানির বিষয়ে একটি সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) সই হয়েছে। এর ফলে বিশ্বের সবচেয়ে বড় কাঁঠাল আমদানিকারক বাজারে বাংলাদেশের প্রবেশের পথ আরও সহজ হতে পারে।
কিন্তু প্রশ্ন হলো, কৃষিপণ্য উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণতার দিকে এগিয়ে যাওয়া চীন কেন বাংলাদেশ থেকে কাঁঠাল আমদানি করতে চায়? আর এই সুযোগ বাংলাদেশের জন্য কতটা গুরুত্বপূর্ণ?
চীনের আগ্রহ নতুন নয়
বাংলাদেশ থেকে কাঁঠাল আমদানির আগ্রহ চীনের নতুন কোনো সিদ্ধান্ত নয়। ২০২৫ সালে বাংলাদেশ থেকে প্রথমবারের মতো কাঁচা আম আমদানি শুরু করার সময়ই চীনের পক্ষ থেকে কাঁঠাল ও পেয়ারা আমদানির আগ্রহ প্রকাশ করা হয়েছিল। সাম্প্রতিক সফরে দুই দেশের মধ্যে ১৭টি সমঝোতা স্মারক সই হয়েছে। এর একটি হলো বাংলাদেশ থেকে কাঁঠাল রফতানির বিষয়ে। সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, এর মাধ্যমে কাঁঠাল রফতানির আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়া আরও এগিয়ে যাবে এবং কৃষিপণ্য রফতানিতে নতুন সম্ভাবনা তৈরি হবে।
বিশ্বের সবচেয়ে বড় কাঁঠালের বাজার চীন
বিশ্বে কাঁঠালের সবচেয়ে বড় আমদানিকারক দেশ চীন। দেশটির বিশাল জনগোষ্ঠী এবং খাদ্যশিল্পের কারণে প্রতিবছর বিপুল পরিমাণ কাঁঠালের চাহিদা তৈরি হয়। বর্তমানে চীন তাদের অধিকাংশ কাঁঠাল আমদানি করে ভিয়েতনাম ও থাইল্যান্ড থেকে। অন্যদিকে বাংলাদেশ বিশ্বের অন্যতম বড় কাঁঠাল উৎপাদনকারী দেশ হলেও আন্তর্জাতিক বাজারে এর অংশগ্রহণ খুবই সীমিত।
জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার (এফএও) তথ্য অনুযায়ী, বৈশ্বিক কাঁঠাল রপ্তানিতে বাংলাদেশের অংশ মাত্র ০.৩ শতাংশ। অথচ বিশ্বব্যাপী কাঁঠালের বাজারের আকার ইতোমধ্যে প্রায় ৩৭০ কোটি মার্কিন ডলারে পৌঁছেছে।
বাংলাদেশের জন্য বড় সুযোগ কেন?
প্রতি বছর বাংলাদেশে প্রায় ৮ থেকে ১০ লাখ মেট্রিক টন কাঁঠাল উৎপাদিত হয়। কিন্তু অভ্যন্তরীণ চাহিদা সীমিত হওয়ায় এবং পর্যাপ্ত রফতানি ও প্রক্রিয়াজাতকরণ ব্যবস্থা না থাকায় উৎপাদিত কাঁঠালের প্রায় ৪৫ শতাংশই নষ্ট হয়ে যায়। অর্থাৎ উৎপাদনের বড় একটি অংশ কৃষকের কোনো অর্থনৈতিক মূল্য তৈরি করতে পারে না।
চীনের মতো বড় বাজারে নিয়মিত রফতানি শুরু হলে কৃষক ন্যায্যমূল্য পাবেন, অপচয় কমবে এবং কাঁঠালকে ঘিরে নতুন শিল্প গড়ে ওঠার সুযোগ তৈরি হবে।
শুধু কাঁঠাল নয়, বাড়তে পারে প্রক্রিয়াজাত খাদ্য রফতানিও
বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট ইতোমধ্যে কাঁঠাল দিয়ে ভেজিটেবল মিট, চিপস, জেলি, আচার, আইসক্রিম, কেকসহ নানা ধরনের মূল্যসংযোজিত খাদ্যপণ্য উদ্ভাবন করেছে। এছাড়া কাঁঠালের নতুন কয়েকটি জাতও উদ্ভাবন করা হয়েছে।
বিশ্বের বিভিন্ন দেশে উদ্ভিদভিত্তিক খাদ্যের জনপ্রিয়তা বাড়ছে। সেই বাজারে কাঁচা কাঁঠালের পাশাপাশি প্রক্রিয়াজাত কাঁঠালজাত পণ্যও বাংলাদেশের জন্য নতুন রপ্তানি সম্ভাবনা তৈরি করতে পারে।
বড় চ্যালেঞ্জ কোথায়?
বিশেষজ্ঞদের মতে, আন্তর্জাতিক বাজারে টিকে থাকতে হলে বাংলাদেশকে ফলের মান নিয়ন্ত্রণ, আন্তর্জাতিক ফাইটোস্যানিটারি (উদ্ভিদ স্বাস্থ্য) মান, আধুনিক প্যাকেজিং, কোল্ড চেইন এবং দ্রুত পরিবহন ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে।
বর্তমানে বাংলাদেশের অধিকাংশ কৃষিপণ্য প্রবাসী বাংলাদেশিদের (এথনিক মার্কেট) বাজারে সীমাবদ্ধ। ইউরোপ বা চীনের মতো বড় বাজারে প্রবেশের জন্য আন্তর্জাতিক মান পূরণ করাই সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, কাঁঠাল রফতানি শুধু একটি ফলের ব্যবসা নয়; এটি বাংলাদেশের কৃষিপণ্য রফতানির নতুন অধ্যায়ও হতে পারে।
চীনের মতো বিশাল বাজারে সফলভাবে কাঁঠাল রফতানি শুরু হলে ভবিষ্যতে আম, পেয়ারা, লিচুসহ অন্যান্য কৃষিপণ্যের জন্যও নতুন বাজার তৈরি হবে। একই সঙ্গে বাংলাদেশ-চীন কৃষিপণ্য বাণিজ্যের একটি স্থায়ী সরবরাহ চেইন গড়ে উঠতে পারে।
সব মিলিয়ে, কাঁঠাল রফতানির এই সমঝোতা শুধু একটি বাণিজ্যিক চুক্তি নয়; সঠিক পরিকল্পনা, মান নিয়ন্ত্রণ ও প্রক্রিয়াজাত শিল্পের উন্নয়ন নিশ্চিত করা গেলে এটি বাংলাদেশের কৃষি অর্থনীতিতে বৈদেশিক মুদ্রা আয়, কৃষকের আয় বৃদ্ধি এবং কৃষিপণ্য রফতানির নতুন দিগন্ত উন্মোচন করতে পারে।
সময়ের আলো/কেএইচও