চট্টগ্রাম বন্দরের নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল (এনসিটি) ও চট্টগ্রাম কনটেইনার টার্মিনাল (সিসিটি) দেশি বা বিদেশি কোনো প্রতিষ্ঠানের কাছে ইজারা দেওয়ার পরিকল্পনা অবিলম্বে বন্ধের দাবি জানিয়েছে ‘বন্দর রক্ষা কমিটি’।
রোববার (২৮ জুন) চট্টগ্রাম প্রেসক্লাবে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এই দাবি জানানো হয়। সম্মেলনে বক্তারা বলেন, দেশের অর্থনৈতিক ও কৌশলগত স্বার্থ সুরক্ষায় দেশের এই বৃহত্তম সমুদ্রবন্দরের জাতীয় মালিকানা ও পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখা অপরিহার্য। একই সঙ্গে সরকারি-বেসরকারি অংশীদারিত্ব (পিপিপি) চুক্তির আওতায় টার্মিনাল দুটির পরিচালনা ভার বিদেশি প্রতিষ্ঠানের হাতে হস্তান্তরের উদ্যোগের বিষয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে কমিটি।
সংবাদ সম্মেলনে কমিটির আহ্বায়ক প্রকৌশলী দেলোয়ার মজুমদার লিখিত বক্তব্য পাঠ করেন। এ সময় সরকারের কাছে ৫টি সুনির্দিষ্ট দাবি তুলে ধরা হয়। এনসিটি ও সিসিটি দেশি-বিদেশি কোনো কোম্পানির কাছে ইজারা দেওয়ার প্রক্রিয়া সম্পূর্ণ বাতিল করা। বন্দরের সব টার্মিনাল চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের (চবক) সরাসরি ব্যবস্থাপনায় রাখা। বন্দর-সংক্রান্ত অতীতের সব চুক্তি জনসমক্ষে প্রকাশ করা। জাতীয় স্বার্থবিরোধী কোনো গোপন চুক্তি সই না করা। চট্টগ্রাম বন্দরের জাতীয় মালিকানা, নিয়ন্ত্রণ ও নিরাপত্তা বজায় রাখতে রাষ্ট্রীয়ভাবে স্পষ্ট নীতি ঘোষণা করা।
এছাড়াও পতেঙ্গা কনটেইনার টার্মিনাল, পানগাঁও ইংল্যান্ড কনটেইনার টার্মিনাল ও লালদিয়ার চর প্রকল্প-সংক্রান্ত সব চুক্তি প্রকাশের জোর দাবি জানানো হয়।
প্রকৌশলী দেলোয়ার মজুমদার বলেন, চট্টগ্রাম বন্দর দেশের প্রায় ৯০ শতাংশ আমদানি-রফতানি বাণিজ্য পরিচালনা করে। এর মালিকানা ও ব্যবস্থাপনা কেবল কোনো বাণিজ্যিক বিষয় নয়, এটি জাতীয় নিরাপত্তা, সার্বভৌমত্ব ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার সঙ্গে সরাসরি জড়িত।
তিনি আরও জানান, পিপিপি কাঠামোর অধীনে দুবাইভিত্তিক বন্দর পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠান ‘ডিপি ওয়ার্ল্ড’-এর সঙ্গে এনসিটি পরিচালনার আলোচনা চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে। এই আলোচনা কমিটিকে সহায়তার জন্য চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ ইতোমধ্যে ১২ সদস্যের একটি দলও গঠন করেছে।
ইজারা দেওয়ার বিরোধিতার পক্ষে কমিটির যুক্তিগুলো হলো, নিজস্ব অর্থায়নে নির্মিত এনসিটি ও সিসিটি দীর্ঘ বছর ধরে স্থানীয় ব্যবস্থাপনায় অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে পরিচালিত হচ্ছে। এনসিটির বার্ষিক তাত্ত্বিক সক্ষমতা ১১ লাখ টিইইউএস (কনটেইনার) হলেও বর্তমানে দেশি ব্যবস্থাপনায় এটি বছরে প্রায় ১৩ লাখ কনটেইনার হ্যান্ডলিং করছে। এমনকি গত মে মাসেই টার্মিনালটি রেকর্ড ১ লাখ ২৬ হাজার ৪৯৬টি কনটেইনার হ্যান্ডলিং করেছে।
চূড়ান্ত চুক্তি সইয়ের আগেই কনটেইনার হ্যান্ডলিং চার্জ অন্যায়ভাবে ৩৭ শতাংশ বাড়ানো হয়েছে। এর ফলে আমদানি-রফতানি খরচ বাড়বে, যার চূড়ান্ত খেসারত দিতে হবে সাধারণ ভোক্তাদের।
বিদেশি অপারেটরদের ইজারা দিলে বন্দরের আয়ের সিংহভাগ লভ্যাংশ হিসেবে বিদেশে চলে যাবে, যা দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ও সরকারি রাজস্বে নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে।
চট্টগ্রাম বন্দর গুরুত্বপূর্ণ সামরিক ও কৌশলগত স্থাপনার কাছাকাছি অবস্থিত। এর প্রধান টার্মিনালগুলোর নিয়ন্ত্রণ বিদেশি প্রতিষ্ঠানের হাতে গেলে জাতীয় নিরাপত্তা বিঘ্নিত হতে পারে।
টার্মিনাল দুটি ইজারা দেওয়ার এই আত্মঘাতী প্রস্তাবের প্রতিবাদে আগামী ৩০ জুন বেলা ১১টায় চট্টগ্রাম প্রেসক্লাব চত্বরে গণসমাবেশ ও মানববন্ধনের কর্মসূচি ঘোষণা করেছে বন্দর রক্ষা কমিটি। এই কর্মসূচিতে সর্বস্তরের জনগণকে অংশ নেওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে।
সংবাদ সম্মেলনে অন্যান্যের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন টিইউসি চট্টগ্রাম জেলা কমিটির সভাপতি তপন দত্ত, জাতীয়তাবাদী শ্রমিক দল চট্টগ্রাম বিভাগীয় কমিটির সাধারণ সম্পাদক কাজী শেখ নুরুল্লাহ বাহার, প্রকৌশলী সুভাষ চন্দ্র বড়ুয়া, টিইউসির যুগ্ম সম্পাদক ইফতেখার কামাল খান, জাতীয়তাবাদী ডক শ্রমিক দলের সাধারণ সম্পাদক তাসলিম হোসেন সেলিম এবং বন্দর রক্ষা কমিটির সদস্য সচিব ফজলুল কবির মিন্টু।
সময়ের আলো/জোই