হলুদ উৎসবে সামুরাই বাধা

মামুন হোসেন

খেলা

২০০৬ জার্মানি বিশ্বকাপে খেলা ব্রাজিলের কথা নিশ্চয়ই মনে আছে। সময়ের সব সেরাদের নিয়ে ওই আসরে অংশ নিয়েছিল সেলেসাওরা। কে ছিলেন

2026-06-29T00:49:20+00:00
2026-06-29T01:30:11+00:00
 
  সোমবার, ২৯ জুন ২০২৬,
১৫ আষাঢ় ১৪৩৩
সোমবার, ২৯ জুন ২০২৬
খেলা
হলুদ উৎসবে সামুরাই বাধা
মামুন হোসেন
প্রকাশ: সোমবার, ২৯ জুন, ২০২৬, ১২:৪৯ এএম  আপডেট: ২৯.০৬.২০২৬ ১:৩০ এএম
২০০৬ বিশ্বকাপে ২২ জুন ব্রাজিলের মুখোমুখি হয়েছিল জাপান। সংগৃহীত ছবি
২০০৬ জার্মানি বিশ্বকাপে খেলা ব্রাজিলের কথা নিশ্চয়ই মনে আছে। সময়ের সব সেরাদের নিয়ে ওই আসরে অংশ নিয়েছিল সেলেসাওরা। কে ছিলেন না কোচ কার্লোস আলবার্তো পেরেইরার দলে! কাফু, কাকা, রোনালদো নাজারিও, রোনালদিনহো, কার্লোস, রিকার্দিনহো, ডিডা, আদ্রিয়ানো, জুলিও সিজার, ফেড্রের মতো নামকরা সব ফুটবলার। 

২০০২ সালে চ্যাম্পিয়ন হওয়া দলটি সেবারও ছিল দারুণ ফেবারিট। তবে নিজেদের নামের প্রতি সুবিচার করতে পারেনি। কোয়ার্টার ফাইনালে ফ্রান্সের কাছে হেরে বিদায় নেন ম্যাজিক কোয়ার্টেটদের (রোনালদো, কাকা, রোনালদিনহো, আদ্রিয়ানো) সেই দল।

ফ্ল্যাশব্যাক থেকে ২০০৬ বিশ্বকাপের ব্রাজিলকে টেনে আনার কারণে এবার চোখ রাখা যাক- ২২ জুন রাতে ডর্টমুন্ডের বিখ্যাত সিগন্যাল ইদুনা পার্ক স্টেডিয়ামে গ্রুপ পর্বে ব্রাজিলের মুখোমুখি হয়েছিল জাপান। বিশ্বকাপে সেবারই প্রথম দুদলের দেখা, এরপর দুই দশক কেটে গেলেও বিশ্বমঞ্চে আর তাদের দেখা হয়নি। 

২০২৬ বিশ্বকাপ সেই আক্ষেপ ঘোচাতে চলেছে। আজ বিশ্বকাপের হাইভোল্টেজ ম্যাচে আবারও মুখোমুখি হচ্ছে লাতিন আমেরিকার ছন্দের জাদুকর এবং এশিয়ার জায়ান্ট ব্লু সামুরাই। আমেরিকার টেক্সাসের দৃষ্টিনন্দন স্টেডিয়াম হিউস্টনে পরস্পরের বিপক্ষে লড়বে তারা। বাংলাদেশ সময় রাত ১১টায় ম্যাচটি শুরু হবে। নকআউট পর্বের (রাউন্ড অব ৩২) এই লড়াইয়ে কোনো দলই পরিষ্কার ফেবারিট নয়।

দুই বিশ্বকাপে খেলার অভিজ্ঞতা (১৯৯৮ ও ২০০২) নিয়ে ২০০৬ বিশ্ব আসরে ব্রাজিলের মুখোমুখি হয়েছিল জাপান। পাঁচবারের বিশ্ব চ্যাম্পিয়নদের কাছে সেদিন ম্যাচটি ৪-১ গোলের বড় ব্যবধানে হেরেছিল। যদিও প্রথম গোলটি জাপানই করেছিল, তবে রোনালদো নাজারিওর জোড়া গোলে সেদিন হালে পানি পায়নি। 

তাই বিশ্বকাপে ব্রাজিলের বিপক্ষে অভিজ্ঞতা মোটেও সুখকর নয় সৃশৃঙ্খল আর গতিময় ফুটবলের পসরায় সাজানোর দলটির। বিশ্বকাপের পরিসংখ্যানই শুধু নয়, দুদলের ১৪ সাক্ষাতেও পিছিয়ে ব্লু সামুরাই। ব্রাজিলের ১১ জয়ের বিপরীতে জাপানের জয় কেবল একটি। দুদলের বাকি দুই ম্যাচ ড্র নিষ্পত্তি হয়েছে।

আগেই উল্লেখ করেছি, আজকের ম্যাচে কোনো দলই পরিষ্কার ফেবারিট নয়। ম্যাচটি ফিফটি-ফিফটি। যে কেউ জেতার ক্ষমতা রাখে। তার কারণও যথেষ্ট। জাপান যে ব্রাজিলের বিপক্ষে একটি ম্যাচ জিতেছে সেটি কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে। মাত্র ৮ মাস আগে। আন্তর্জাতিক ওই প্রীতি ম্যাচে শুরুতে ২-০-তে পিছিয়ে ছিল জাপান, তবে দৃঢ়চেতা মনোবল আর কাউন্টার অ্যাটাকে সমৃদ্ধ গতিশীল ফুটবলে ম্যাচটি শেষ পর্যন্ত ৩-২ ব্যবধানে জেতে আনন্দে মাঠ ছাড়ে জাপানই। 

এর বাইরে আরও কিছু কারণ উল্লেখ করা যেতে পারে। দলের সেরা তারকা নেইমার জুনিয়র পুরো ফিট নন। যদিও জাপানের বিপক্ষে তার পূর্ব রেকর্ড বেশ সমৃদ্ধ, স্কটল্যান্ডের বিপক্ষে সবশেষ ম্যাচে মাঠেও নেমেছেন। তারপরও ২০০৬ সালের সেই ব্রাজিল আর বর্তমান ব্রাজিলের আকাশ-পাতাল বিভেদ।


ব্রাজিল যখন আজ টেক্সাসের হিউস্টনে খেলতে নামবে, সেখানে নেইমারকে পেলেও দলের আরেক গুরুত্বপূর্ণ সদস্য রাফিনহা কিন্তু থাকছেন না। তাকে নিউ জার্সিতে রেখেই টেক্সাসে ঘাঁটি গেড়েছেন কোচ কার্লো আনচেলত্তি। তবে জাপানের বিপক্ষে আজ ফেবারিট না হলেও চলতি আসরে কিন্তু একেবারেই খারাপ খেলছে না হলুদ শিবির। 

‘সি’ গ্রুপ থেকে চ্যাম্পিয়ন হয়ে ৪৮-এর বাধা পেরিয়ে নকআউট পর্বে (রাউন্ড অব ৩২) উঠে এসেছে। শুরুতে মরক্কোর বিপক্ষে ড্রয়ের ধাক্কা সামলে শেষ দুই ম্যাচে হাইতি এবং স্কটল্যান্ডকে সমান ৩-০ গোলে হারিয়েছে। জয়ের সেই ধারাবাহিকতা নিশ্চয় আজও ধরে রাখতে চাইবে আনচেলত্তির দল। এর বাইরে যে বিকল্পও নেই। হেক্সা মিশনে এখন ব্রাজিলের সামনে প্রথম বাধা জাপানই। জয়ে কোটি ব্রাজিল ভক্তের ষষ্ঠ বিশ্বকাপ জয়ের স্বপ্ন বেঁচে থাকবে, হেরে গেলে দুই যুগের ট্রফি না পাওয়ার আক্ষেপ দীর্ঘ থেকে আরও দীর্ঘতর হবে। নিশ্চয়ই তা চাইবেন না নেইমার, ভিনিসিয়ুস, কাসেমিরোরা।

টানা অষ্টমবারের মতো বিশ্বকাপে খেলছে জাপান। ১৯৯৮ সালে বিশ্বমঞ্চে ব্লু সামুরাইদের পথচলা শুরু। এরপর আর কখনো ছেদ পড়েনি এশিয়ান চ্যাম্পিয়নদের। ২০০২ বিশ্বকাপের সহ-আয়োজকরা (দক্ষিণ কোরিয়ার সঙ্গে) কয়েকবার রাউন্ড অব সিক্সটিনে খেললেও বিশ্বকাপে এর বাইরে তেমন কোনো অর্জন নেই। 

তবে বড় দলগুলো শিকারে প্রায়শই সিদ্ধহস্ত তারা। গত বিশ্বকাপেই তো জার্মানি, স্পেনের মতো বিশ্বজয়ীদের হারানোর অভিজ্ঞতা হয়েছে। এ ছাড়া ফ্রেন্ডলি ম্যাচে ব্রাজিল, আর্জেন্টিনা, ইতালি কিংবা ফ্রান্সের মতো বিশ্বকাপজয়ীদের হারানোর মধুর অভিজ্ঞতাও আছে জাপানিজদের। সেই হিসাবে এবারের আসরেও জাপানকে গোনার বাইরে রাখার সুযোগ নেই।

‘এফ’ গ্রুপ থেকে রানার্সআপ হয়ে নকআউট পর্বে এসেছে জাপান। কোচ হাজিমে মোরিইয়াসুরের দল নিজেদের প্রথম ম্যাচেই নেদারল্যান্ডসকে ২-২ গোলে রুখে দিয়েছে। এরপর তিউনিসিয়াকে ৪-০ গোলে হারিয়ে এবং গ্রুপ পর্বের সবশেষ ম্যাচে ইউরোপের আরেক জায়ান্ট সুইডেনের বিপক্ষে ১-১ গোলে ড্র করে ৫ পয়েন্ট নিয়ে রাউন্ড অব ৩২-তে নাম লেখায়। উয়েদা, কামাদা, মায়েদা, এন্দো কিংবা অভিজ্ঞ নাগাতোমাদের নিয়ে গড়া দলটি যেকোনো সময় খেলার মোড় ঘুরিয়ে দিতে দারুণ পটু। ব্রাজিলের বিপক্ষে ব্লু সামুরাইয়ের এই যোদ্ধাদের সম্মিলিত আক্রমণে ম্যাচের মোড় ঘুরেও যেতে পারে। জাপানের সেই ক্ষমতা রয়েছে।


সুইডেনের বিপক্ষে ড্রয়ের পরপরই ব্রাজিল ম্যাচ নিয়ে রীতিমতো হুমকি দেন জাপান তারকা মায়েদা। তিনি জানান, ‘আমার মনে হয় এটা কঠিন একটা ম্যাচ হবে। তবে আমরা যদি নিজেদের খেলাটা ঠিকভাবে খেলতে পারি তা হলে তাদেরও হারাতে পারব। আমরা ভালোভাবে প্রস্তুতি নিচ্ছি। এত দিন যেভাবে খেলেছি, সেটাই মাঠে দেখাতে পারলে ভালো ফল পাওয়া সম্ভব।’ মায়েদার সুরে সুর মিলিয়ে অভিজ্ঞ নাগাতোমো বলেন, ‘নেইমার বিশ্বমানের একজন খেলোয়াড়। তাকে নিয়ে আমাদের বিশেষভাবে সতর্ক থাকতে হবে। ব্রাজিল সবসময়ই শক্তিশালী দল ছিল এবং এখনও তাই। তবে আমাদের দলটাও ভালো। আমরা বিশ্বাস করি নিজেদের সেরাটা খেলতে পারলে ব্রাজিলকে হারানো সম্ভব।’

চোটাক্রান্ত নেইমার এখনও নিজেকে মেলে ধরার অপেক্ষায়। তবে হলুদ জার্সিতে এবার উৎসবে সব রং এঁকে দিচ্ছেন সময়ের সেরা ফরোয়ার্ড ভিনিসিয়ুস জুনিয়র। গ্রুপ পর্বের প্রতিটি ম্যাচেই অবদান রেখেছেন। গোল করে দলকে কাক্সিক্ষত পয়েন্ট এনে দিচ্ছেন। দলের আরেক ফরোয়ার্ড মাতেউস কুনিয়াও কম যাননি। ভিনির সঙ্গে পাল্লা দিয়ে তিনিও ম্যাচের পর ম্যাচে গোল করছেন, গোলের পর ভিন্নধর্মী নাচে সবার আকর্ষণের কেন্দ্রে এখন কুনিয়া। নেইমার, ভিনি, কুনিয়ারা নিজেদের সেরাটা দিতে পারলে শুধু জাপান কেন যেকোনো দলকে বধের ক্ষমতা রাখে পাঁচবারের বিশ্ব চ্যাম্পিয়নরা।

ব্রাজিলের ফুটবল মানেই জোগো বোনিতো (সুন্দর ফুটবল)। নান্দনিক, ছন্দময় এবং আক্রমণাত্মক ফুটবলশৈলীর চমৎকার পসরা। অন্যদিকে জাপানের রয়েছে গতিময় ফুটবলের সঙ্গে দুর্দান্ত কাউন্টার অ্যাটাক আর সুশৃঙ্খল রক্ষণ, নিখুঁত পাসিং, পজিশনিং সেন্স- সবমিলে দারুণ এক লড়াইয়ের অপেক্ষায় এখন বিশ্বের কোটি ফুটবলপ্রেমী দর্শক-সমর্থক। 

হিউস্টনে আজ ব্রাজিলের হলুদ উৎসবে ব্লু সামুরাইরা চাইবে নীল বেদনার ঢেউ তুলতে। নেইমার, ভিনি, কুনিয়ারা পারবেন তো বেদনার সেই নীলকে হলুদ উৎসবে রাঙাতে।

সময়ের আলো/প্রিন্ট/জেডি  


  বিষয়:   হলুদ উৎসবে সামুরাই বাধা 


Loading...
Loading...
খেলা- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: