ঢাকার কেরানীগঞ্জে সমাজসেবা অধিদফতরের ফ্যামিলি কার্ড কর্মসূচিতে ব্যাপক অনিয়ম, স্বজনপ্রীতি ও প্রকৃত দরিদ্রদের বঞ্চিত করার অভিযোগ পাওয়া গেছে। সরকারের এই কল্যাণমূলক কর্মসূচির আওতায় হতদরিদ্র, প্রান্তিক ও সুবিধাবঞ্চিত পরিবারের নারীদের অন্তর্ভুক্ত করার কথা থাকলেও বাস্তবে আর্থিকভাবে সচ্ছল পরিবারের সদস্যদের নাম অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে বলে অভিযোগ তুলেছেন স্থানীয় বাসিন্দারা।
তাদের দেওয়া তথ্য মতে, প্রবাসী পরিবারের সদস্য থেকে শুরু করে বাড়ি ও দোকান ভাড়া থেকে নিয়মিত আয় করেন এমন মানুষও এই কর্মসূচির সুবিধা পেয়েছেন।
এ বিষয়ে কথা হয় কেরানীগঞ্জ উপজেলা সমাজসেবা কর্মকর্তা মোহাম্মদ শিবলীজ্জামানের সঙ্গে। এ সময় তিনি বলেন, এটি একটি পাইলট প্রকল্প। কোনো প্রকৃত উপকারভোগী বাদ পড়ে থাকলে তাকে অন্তর্ভুক্ত করার সুযোগ রয়েছে। পাশাপাশি কারও বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট অনিয়মের অভিযোগ পাওয়া গেলে তা যাচাই-বাছাই করে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলেও আশ্বাস প্রদান করেন কেরানীগঞ্জ উপজেলা সমাজসেবা কর্মকর্তা মোহাম্মদ শিবলীজ্জামান।
এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে কেরানীগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) উমর ফারুক বলেন, উপকারভোগীদের তালিকা পুনরায় যাচাই করা হবে। প্রকৃত দরিদ্র ও অসহায় পরিবার যাতে সুবিধা পায় সে বিষয়ে আমরা গুরুত্ব দিচ্ছি। কোনো অনিয়ম কিংবা অসংগতি পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলেও হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেন কেরানীগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা উমর ফারুক।
সরেজমিন কথা হয় স্থানীয় বাসিন্দাদের সঙ্গে। এ সময় তারা মন্তব্য করেন, সরকারের মানবিক সহায়তা কর্মসূচির স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে বিতর্কিত তালিকা পুনর্মূল্যায়ন করতে হবে। পাশাপাশি অভিযোগগুলোর নিরপেক্ষ তদন্ত করাও অত্যন্ত জরুরি হয়ে পড়েছে। প্রকৃত দরিদ্র ও অসহায় মানুষের হাতে সরকারি সহায়তা পৌঁছাতে না পারলে ফ্যামিলি কার্ড কর্মসূচির মূল উদ্দেশ্য ব্যাহত হবে বলেও মন্তব্য করেন স্থানীয় বাসিন্দারা।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, তেঘরিয়া ইউনিয়নের ৮ নম্বর ওয়ার্ডের ছয়টি গ্রামের ৫০৯ জন গৃহিণীকে ফ্যামিলি কার্ডের আওতায় এনে গত ১৭ জুন আনুষ্ঠানিকভাবে ফ্যামিলি কার্ড কর্মসূচির উদ্বোধন করা হয়। কর্মসূচির আওতায় উপকারভোগীরা প্রতি মাসে ২ হাজার ৫০০ টাকা করে সরকারি সহায়তা পাবেন। আনুষ্ঠানিকভাবে ফ্যামিলি কার্ড কর্মসূচির উদ্বোধন করার পরপরই অভিযোগ উঠে, তালিকা প্রণয়নে অনিয়মের কারণে অনেক প্রকৃত দরিদ্র, দিনমজুর ও অসহায় পরিবার এই সুবিধা থেকে বঞ্চিত হয়েছেন।
স্থানীয় সূত্র জানায়, দক্ষিণ কেরানীগঞ্জের বাঘৈরনগর এলাকার সাথী বর্মণের স্বামী ফ্রান্সে থাকেন। একই এলাকার রাখী রানীর স্বামী কুয়েতপ্রবাসী এবং ছেলে সিঙ্গাপুরে কর্মরত। এ ছাড়া নাসরিন বেগমের স্বামী এবং নাহিদা আক্তারের স্বামীও বিদেশে অবস্থান করছেন। অথচ তাদের নাম ফ্যামিলি কার্ডের সুবিধাভোগীর তালিকায় রয়েছে।
অভিযোগ রয়েছে, শুধু প্রবাসী পরিবারের সদস্যরাই নন, যাদের নিজস্ব ভবন, ব্যবসা কিংবা বাড়ি ও দোকান ভাড়া থেকে নিয়মিত আয় রয়েছে এমন ব্যক্তিরাও এই কর্মসূচির সুবিধা পেয়েছেন।
স্থানীয়দের ভাষ্যমতে, হালিমা বেগমের একটি একতলা ভবন রয়েছে। তার স্বামী ফলের ব্যবসা করেন, আর ছেলে একটি ইটভাটায় ম্যানেজার হিসেবে কর্মরত। এ বিষয়ে বক্তব্য নেওয়ার জন্য হালিমা বেগমের মোবাইল ফোনে যোগাযোগ করা হলে ফোন ধরেন তার ছেলে ফয়সাল। এ সময় ফয়সাল জানান, তার বাবা ব্যবসা করেন এবং তিনি নিজেও চাকরি করেন। কীভাবে তার মায়ের নাম সুবিধাভোগীর তালিকায় এসেছে- এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক বাসিন্দা বলেন, এই কর্মসূচির উদ্দেশ্য ছিল প্রকৃত অসহায় মানুষকে সহায়তা করা। কিন্তু তালিকা তৈরির সময় নানা অনিয়ম হয়েছে। অনেক সচ্ছল ও প্রবাসী পরিবারের সদস্য কার্ড পেয়েছেন। অথচ প্রকৃত দরিদ্ররা বঞ্চিত হয়েছেন।
ফ্যামিলি কার্ড না পাওয়ায় আক্ষেপ করে স্থানীয় বাসিন্দা জবেদা বেগম বলেন, আমার স্বামী মারা গেছেন। ছোট ছোট সন্তান নিয়ে খুব কষ্টে জীবন চালাই। ভেবেছিলাম সরকারি এই সহায়তা পাব, কিন্তু পাইনি। অথচ অনেক সচ্ছল পরিবার সুবিধা পেয়েছে।
স্থানীয় আরেক বাসিন্দা চিনু দে বলেন, কারখানায় কাজ করে সংসার চালাই। ফ্যামিলি কার্ড পেলে কিছুটা উপকার হতো। কিন্তু আমার নাম তালিকায় আসেনি। যাদের প্রভাব আছে, তাদের আত্মীয়-স্বজনই সুবিধা পেয়েছে।
অভিযোগের বিষয়ে জানার জন্য যোগাযোগ করা হলে ফ্যামিলি কার্ডপ্রাপ্ত সাথী বর্মণ বলেন, সমাজসেবা অফিসের লোকজন বাড়িতে এসে খোঁজখবর নিয়ে আমাকে যোগ্য মনে করেছেন বলেই কার্ড দিয়েছেন। কেন দিয়েছেন সেটি তারাই ভালো বলতে পারবেন বলেও মন্তব্য করেন।
উল্লেখ্য ফ্যামিলি কার্ড হলো বাংলাদেশ সরকারের সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয় কর্তৃক প্রবর্তিত একটি ডিজিটাল সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি, যার লক্ষ্য দেশের দরিদ্র ও নিম্ন আয়ের পরিবারগুলোকে একটি একক ডাটাবেজের আওতায় এনে সরাসরি আর্থিক ও খাদ্য সহায়তা প্রদান করা।
চলতি বছরের ১০ মার্চ প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ঢাকার কড়াইল বস্তি সংলগ্ন টিঅ্যান্ডটি মাঠে আনুষ্ঠানিকভাবে এই কর্মসূচির উদ্বোধন করেন। এই উদ্যোগটি মূলত বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) নির্বাচনি ইশতেহারের অন্যতম প্রধান অঙ্গীকার ছিল। ফ্যামিলি কার্ড কর্মসূচির মূল দর্শন হলোÑ ব্যক্তি নয়, পরিবারই উন্নয়নের মূল একক।
ফ্যামিলি কার্ড কর্মসূচির প্রধান লক্ষ্যগুলো :
দারিদ্র্য বিমোচন : ২০৩০ সালের মধ্যে চরম দারিদ্র্য দূর করা এবং প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর আর্থিক সচ্ছলতা নিশ্চিত করা এই প্রকল্পের দীর্ঘমেয়াদি রূপকল্প।
পরিবারকে উন্নয়নের একক হিসেবে বিবেচনা : ব্যক্তি নয়, পরিবারই উন্নয়নের মূল একক- এই দর্শনের ওপর ভিত্তি করে প্রতিটি অভাবী পরিবারকে সরাসরি সহায়তার আওতায় আনা।
নারীর ক্ষমতায়ন : এই কর্মসূচির মাধ্যমে নারীকে পরিবারের প্রধান হিসেবে স্বীকৃতি দিয়ে সরাসরি তার হাতে অর্থ পৌঁছে দেওয়া হয়, যাতে নারী অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী হতে পারেন।
সমন্বিত ডিজিটাল ডাটাবেজ : ৯৫টিরও বেশি বিদ্যমান সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির মধ্যে সমন্বয়হীনতা দূর করে একটি একক ডিজিটাল ডাটাবেজ তৈরি করা।
ভুল ও দুর্নীতি রোধ : একই ব্যক্তির একাধিক সুবিধা গ্রহণ বন্ধ করা এবং প্রকৃত দরিদ্রদের বাদ পড়ার ঝুঁকি কমিয়ে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা।
সরাসরি অর্থ প্রদান : মোবাইল ব্যাংকিং বা ব্যাংক অ্যাকাউন্টের মাধ্যমে সুবিধাভোগীর কাছে কোনো মধ্যস্বত্বভোগী ছাড়াই সরাসরি সহায়তা পৌঁছে দেওয়া।
খাদ্য নিরাপত্তা ও পুষ্টি : নিয়মিত আর্থিক সহায়তার মাধ্যমে দরিদ্র পরিবারগুলোর খাদ্য ও প্রয়োজনীয় পুষ্টির চাহিদা মেটানো।
টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জন : দারিদ্র্য বিমোচন, খাদ্য নিরাপত্তা এবং লিঙ্গ বৈষম্য হ্রাসসহ অন্যান্য বৈশ্বিক লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে সহায়তা করা।
সময়ের আলো/প্রিন্ট/জেডি