মানুষের ইহকালীন জীবন অত্যন্ত সংক্ষিপ্ত ও ক্ষণস্থায়ী। সময়ের এই ছোট পরিসরে আমরা দুনিয়াবি পদমর্যাদা, সম্পদ অর্জন এবং বাহ্যিক সফলতার পেছনে আপ্রাণ ছুটছি। কিন্তু যদি প্রশ্ন করা হয় প্রকৃত সফল কারা? এই প্রশ্নের উত্তর একেকজনের কাছে একেক রকম। মানুষ সাধারণত অর্থবিত্ত, ক্ষমতা বা সামাজিক প্রতিপত্তিকে সফলতার মানদণ্ড হিসেবে বিবেচনা করে। অথচ মহাবিশ্বের স্রষ্টা মহান আল্লাহ তায়ালার কাছে সফলতার সংজ্ঞা সম্পূর্ণ ভিন্ন ও উচ্চতর। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তায়ালা ঘোষণা করেছেন, ‘নিশ্চয়ই সে সফলতা লাভ করবে, যে পবিত্রতা অর্জন করে’ (সুরা আলা, আয়াত : ১৪)। এখানে ‘পবিত্রতা’ বলতে মূলত মানুষের অন্তঃকরণ বা কলবের আত্মশুদ্ধিকে বোঝানো হয়েছে। অর্থাৎ যারা তাদের অন্তরকে জাগতিক কলুষতা থেকে মুক্ত ও পাপমুক্ত রাখতে পেরেছে তারাই প্রকৃত সফল।
কলব বা অন্তর সুন্দর রাখার তাৎপর্যপ্রশ্ন জাগতে পারে কলব সুন্দর রাখার প্রকৃত অর্থ কী? কলব সুন্দর রাখার অর্থ হলো মানুষের মনকে যাবতীয় আত্মিক ও মানসিক ব্যাধি থেকে মুক্ত রাখা। আমাদের অন্তর হলো রবের দেখার স্থান। তাই একে যাবতীয় নেতিবাচক চিন্তা থেকে মুক্ত রাখা মুমিনের অন্যতম প্রধান দায়িত্ব। অন্তরের ব্যাধিগুলোর মধ্যে অন্যতম হলো হিংসা, বিদ্বেষ, লোভ-লালসা এবং অহংকার। কোনো বান্দা যদি নিজের অন্তরকে এসব কলুষতা থেকে ধুয়েমুছে বিশুদ্ধ করতে পারেন, তবেই তিনি আল্লাহর ভালোবাসার পাত্র হতে পারেন। অন্তর যখন পরিশুদ্ধ হয় তখন মানুষের আখলাক বা চরিত্রে তার প্রতিফলন ঘটে।
আরও পড়ুন
অহংকার আত্মিক বিনাশের মূল কারণঅন্তর বিনষ্টকারী মানসিক ব্যাধিগুলোর মধ্যে সবচেয়ে মারাত্মক ও ধ্বংসাত্মক হলো অহংকার (তাকাব্বুর)। অহংকার এমন এক জঘন্য আত্মিক রোগ, যা মানুষের ঈমান ও আমলকে এক নিমিষেই ভস্মীভূত করে দিতে পারে। আপনি দেখতে রূপবান হতে পারেন, উচ্চশিক্ষিত হতে পারেন কিংবা বিপুল সম্পদের মালিক হতে পারেন; কিন্তু আপনার মনে যদি অহংকারের বীজ লুকিয়ে থাকে তবে আল্লাহর দরবারে এর কোনো মূল্য নেই। আল্লাহ তায়ালা স্পষ্টভাবে সতর্ক করে বলেছেন, ‘নিশ্চয়ই আল্লাহ কোনো দাম্ভিক ও অহংকারীকে পছন্দ করেন না’ (সুরা লোকমান, আয়াত : ১৮)। অনেক সময় দেখা যায়, প্রচুর ইবাদত বা নেক আমল করার কারণে মানুষ নিজেকে অন্যের চেয়ে শ্রেষ্ঠ মনে করতে শুরু করে। এটিও অহংকারের এক ভয়াবহ রূপ, যা মানুষকে অগোচরে ধ্বংসের পথে নিয়ে যায়। রাসুলুল্লাহ (সা.) অত্যন্ত কঠোর সতর্কবার্তা দিয়ে বলেছেন, ‘যার অন্তরে সরিষার দানা পরিমাণ অহংকার থাকবে সে জান্নাতে প্রবেশ করতে পারবে না।’ (সহিহ মুসলিম)
ইবলিসের অধঃপতন থেকে শিক্ষা অহংকারের কারণে মহান আল্লাহ তায়ালা বহু সম্মানিত সৃষ্টিকে এক লহমায় লাঞ্ছিত ও অপদস্থ করেছেন। এর সবচেয়ে প্রকৃষ্ট উদাহরণ হলো ইবলিস (যাকে আজাজিল নামেও অভিহিত করা হয়)। সে ছিল জিন জাতির মধ্যে সবচেয়ে ইবাদতগুজার ও সম্মানিত। কিন্তু মহান আল্লাহ যখন তাকে আদম (আ.)-কে সেজদা করার নির্দেশ দিলেন, তখন সে অহংকারের বশবর্তী হয়ে আল্লাহর আদেশ অমান্য করল। সে নিজেকে আগুনের সৃষ্টি এবং আদম (আ.)-কে মাটির সৃষ্টি দাবি করে শ্রেষ্ঠত্বের অহংকার প্রদর্শন করল। তার এই দাম্ভিকতা তাকে আল্লাহর দরবার থেকে চিরদিনের জন্য বিতাড়িত ও অভিশপ্ত শয়তানে পরিণত করল। এটি আমাদের জন্য এক বড় শিক্ষা যে, বড় ইবাদতকারী হলেও অহংকার মানুষের সব অর্জিত নেকি বরবাদ করে দিতে পারে।
অহংকারের বিভিন্ন রূপআমাদের মাঝে অহংকার বিভিন্নভাবে প্রকাশ পায়। কখনো তা প্রকাশ্য, আবার কখনো অত্যন্ত সূক্ষ্ম। অনেকে মুখে সরাসরি অহংকার প্রকাশ করেন। যেমন ‘আমি তার চেয়ে কত ভালো’, কিংবা কথায় কথায় বংশের আভিজাত্য বা ক্ষমতার দাপট দেখিয়ে বলা ‘তুমি কি জানো আমি কার সন্তান’ ইত্যাদি। আবার অনেকে মুখে কিছু না বললেও তাদের হাঁটাচলা, শারীরিক অঙ্গভঙ্গি ও আচরণে অহংকার স্পষ্ট হয়ে ওঠে। তারা অন্য মানুষকে তুচ্ছতাচ্ছিল্য করে মনে মনে তৃপ্তি পান। আবার এক শ্রেণির মানুষের অহংকার মুখে বা আচরণে প্রকাশ পায় না, বরং তা মনের গভীরে সুপ্ত থাকে। তারা সুযোগের অপেক্ষায় থাকে অন্যের ক্ষতি করার জন্য এবং মনে মনে ভাবে, ‘সময় আসুক, তখন বুঝিয়ে দেব আমি কী জিনিস!’ অন্তরের এই গোপন অহংকার ও হিংসাই সমাজে বড় বড় ফিতনা ও বিভেদের জন্ম দেয়।
বিনয়ই সাফল্যের সোপানআমাদের মনে রাখতে হবে, মানুষ হয়তো আমাদের অন্তরের খবর জানে না, কিন্তু মহান আল্লাহ অন্তরের সব গোপন রহস্যের খবর রাখেন। দুনিয়াতে প্রভাবশালী মানুষের প্রিয় পাত্র হওয়ার জন্য আমরা কত ত্যাগ স্বীকার করি, অথচ মহাবিশ্বের মালিক আল্লাহর পছন্দের তালিকায় জায়গা পাওয়ার জন্য আমাদের অন্তরকে অহংকারমুক্ত রাখা সবচেয়ে জরুরি। অহংকারের একমাত্র প্রতিষেধক হলো বিনয় বা নম্রতা। বিনয় মানুষের ব্যক্তিত্বকে সুশোভিত ও উজ্জ্বল করে। যারা অহংকারমুক্ত ও বিনয়ী জীবনযাপন করতে পারেন তারাই দুনিয়া ও আখেরাতে প্রকৃত সম্মানের অধিকারী হন। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘যে আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য বিনয়ী হয়, আল্লাহ তার মর্যাদা বাড়িয়ে দেন’ (সহিহ মুসলিম)। বর্তমান অস্থির ও প্রতিযোগিতামূলক সমাজে মানবিক ও নৈতিক গুণাবলি ক্রমশ বিলীন হয়ে যাচ্ছে। সামাজিক শান্তি, স্থিতিশীলতা এবং পরকালীন মুক্তির জন্য আমাদের অহংকার পরিহার করে বিনয়ী হতে হবে। মহান আল্লাহর কাছে প্রার্থনা, তিনি যেন আমাদের সবাইকে অন্তর থেকে অহংকার বিসর্জন দেওয়ার তৌফিক দান করেন এবং একটি বিনয়ী, পরিচ্ছন্ন ও সুন্দর জীবন দান করেন।
শিক্ষার্থী, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়
এএডি/