সন্তান আল্লাহর পক্ষ থেকে পিতা-মাতার জন্য এক মহামূল্যবান আমানত। এই আমানতের যথাযথ হেফাজত ও সঠিক পরিচর্যা করা প্রতিটি পিতা-মাতার ওপর ফরজ দায়িত্ব। মনে রাখতে হবে, সন্তানকে যদি সঠিক পথে পরিচালিত না করা হয় এবং তার আখেরাতকে অবহেলা করা হয়, তবে সেই সন্তান একদিন পিতা-মাতার জন্য দুনিয়া ও আখেরাত উভয় জগতেই বিপদের কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে। বর্তমান সমাজে এমন অসংখ্য উদাহরণ রয়েছে যেখানে সন্তানদের ভুল শিক্ষা, বেপরোয়া স্বাধীনতা এবং দ্বীনি শিক্ষার অভাবের কারণে পিতা-মাতাকে চরম লাঞ্ছনা ও কষ্ট ভোগ করতে হয়েছে। অনেক রত্নগর্ভা মা, যারা একসময় সন্তানের সাফল্য নিয়ে গর্ব করতেন, পরবর্তীতে সেই সন্তানদের কারণেই অশ্রু বিসর্জন দিতে বাধ্য হয়েছেন। নাম-যশ, ধন-সম্পদ কিংবা উচ্চ ডিগ্রি অর্জন করলেও যখন সন্তান চরিত্রহীন, অবাধ্য ও ধর্মবিমুখ হয়ে যায়, তখন সেই সাফল্য পিতা-মাতার জন্য কোনো কল্যাণ বয়ে আনে না। এগুলো তো দুনিয়ার কিছু বাস্তব চিত্র মাত্র।
কিন্তু আখেরাতের অবস্থা আরও ভয়াবহ। কেয়ামতের দিন প্রত্যেক অভিভাবককে জিগ্যেস করা হবে তার অধীনস্থদের ব্যাপারে। সন্তানকে ঈমান, নামাজ, কুরআন, আদব-আখলাক ও ইসলামি মূল্যবোধ শিক্ষা দেওয়ার ব্যাপারে যদি অবহেলা করা হয়, তবে সেই জবাবদিহি অত্যন্ত কঠিন হবে।
আরও পড়ুন
দুঃখজনক হলেও সত্য, অনেক পিতা-মাতা জেনেশুনেই এই ভুল পথে পা বাড়ান। তারা সন্তানের ভবিষ্যৎ বলতে শুধু চাকরি, ব্যবসা, অর্থ ও সামাজিক মর্যাদাকেই বুঝেন। অথচ যে ভবিষ্যতের কোনো শেষ নেই, যে জীবনের কোনো মৃত্যু নেই, সেই আখেরাতের প্রস্তুতির ব্যাপারে তারা উদাসীন থাকেন। ফলস্বরূপ যখন সন্তান বড় হয়ে পিতা-মাতার অবাধ্য হয়, দ্বীন থেকে দূরে সরে যায় কিংবা বিভিন্ন অপকর্মে জড়িয়ে পড়ে, তখন তারা আফসোস করেন। কিন্তু তখন অনেক ক্ষেত্রেই আফসোস করা ছাড়া আর কিছুই করার থাকে না। সন্তানের শিক্ষার প্রথম ধাপ হওয়া উচিত কুরআন শিক্ষা। কারণ কুরআনই মানুষের জীবনের প্রকৃত দিকনির্দেশনা। যে শিশু ছোটবেলা থেকে কুরআনের সঙ্গে বেড়ে ওঠে, আল্লাহর কালামের সঙ্গে যার হৃদয়ের সম্পর্ক গড়ে ওঠে, তার চরিত্র, চিন্তা-চেতনা ও জীবনদর্শন অন্যদের তুলনায় অনেক বেশি সুন্দর ও পরিশুদ্ধ হয়। কিন্তু আমাদের সমাজের একটি বড় সংকট হলো আমরা সন্তানের দুনিয়াবি শিক্ষার জন্য লাখ লাখ টাকা ব্যয় করতে প্রস্তুত, কিন্তু কুরআন শিক্ষার ক্ষেত্রে চরম কৃপণতা প্রদর্শন করি। নামিদামি স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি করানোর জন্য আমরা বিনা দ্বিধায় বিপুল অর্থ খরচ করি; অথচ একজন কুরআন শিক্ষক যদি সামান্য কয়েকশ টাকা পারিশ্রমিক দাবি করেন তখন আপত্তির শেষ থাকে না।
এ যেন আমাদের মূল্যবোধের এক করুণ চিত্র। আমরা দুনিয়ার জন্য সবকিছু দিতে রাজি, কিন্তু আখেরাতের জন্য সামান্য ব্যয় করতেও কষ্ট অনুভব করি। অথচ বাস্তবতা হলো সন্তানকে যে শিক্ষা তার রবকে চিনতে শেখায়, কুরআনের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেয়, নামাজ ও ইসলামি আদর্শের প্রতি উদ্বুদ্ধ করে, সেই শিক্ষাই তার জীবনের সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ। আজ সময় এসেছে নিজেদের প্রশ্ন করার, আমরা কি সন্তানকে শুধু দুনিয়ার জন্য প্রস্তুত করছি, নাকি দুনিয়া ও আখেরাত উভয়ের সফলতার জন্য গড়ে তুলছি? যদি আমরা সত্যিই সন্তানের কল্যাণ চাই, তা হলে সর্বপ্রথম তার ঈমান, কুরআন শিক্ষা, নামাজ এবং ইসলামি চরিত্র গঠনের প্রতি গুরুত্ব দিতে হবে। তা হলেই আমাদের আগামী প্রজন্ম সুন্দর হবে।