মানবজীবনে বিভিন্ন সময় নানা সংকট সামনে হাজির হয়। বন্ধুমহলে ভুল বোঝাবুঝি হয়। বন্ধুত্ব ভেঙে যায়। ঠিক একই রকম, দাম্পত্য জীবনেও অনেক সংকট এসে হানা দেয়। সংসারে মতভেদ বা অভিমান দেখা দেয়। এমন মুহূর্তে আমাদের করণীয় কী, সেটা আমাদের জানতে হবে। এবং সে অনুযায়ী পরিস্থিতি সামাল দিতে হবে।
অনেকে মনে করেন, সর্ব যুগের সর্ব শ্রেষ্ঠ মানব, নবীজির (সা.) সংসারে কখনও মতভেদ বা অভিমানের দেখা মেলেনি। কিন্তু, তাদের এই মনে করাটা ভুল। ইসলাম আমাদের বাস্তবতাই শেখায়। অবাস্তব কোনো কিছু শেখায় না। নবীজির স্ত্রীদেরও স্বাভাবিক চাওয়া-পাওয়া, আবেগ ও অভিমান ছিল। আর প্রিয় নবী সেগুলোকে ধৈর্য, প্রজ্ঞা ও ভালোবাসার মাধ্যমে মোকাবিলা করেছেন।
অত্যন্ত সাদাসিধে জীবনযাপন করতেন আমাদের প্রিয় নবী মুহাম্মাদ (সা.)। দিনের পর দিন তার ঘরে চুলা জ্বলত না, খেজুর ও পানি খেয়েই দিন কাটাত পরিবারের সদস্যরা। অথচ তিনি চাইলে দুনিয়ার সব সম্পদ তার পায়ের তলায় এসে হাজির হতো, কিন্তু চাননি। তিনি প্রাধান্য দিয়েছিলেন আখেরাতকে। (বুখারি, হাদিস : ৬৪৫৯)
হজরত হাফসার (রা.) সঙ্গে কথোপকথনের সময় বিচারক হিসেবে হজরত উমরকে (রা.) একবার ডাকা হলো। আলোচনার একপর্যায়ে হাফসা (রা.) একটি আবেগপূর্ণ কথায় উমর (রা.) রেগে যান। কিন্তু নবীজি (সা.) তাকে থামিয়ে দেন। এতে বোঝা যায়, রাগের মুহূর্তে বলা কথাকে বড় করে দেখা বা অপমানের কারণ বানানো উচিত নয়। (সিরাতে হালাবিয়্যা, ৩/২১৭)
নবীজির (সা.) স্ত্রীরাও কখনও কখনও বেশি ভরণপোষণ চাইতেন। তখন হজরত আবু বকর (রা.) ও হজরত উমর (রা.) নিজেদের কন্যাদের শাসন করতে চাইলে, নবীজি তাদের সে সুযোগ দেননি। কারণ, স্বাভাবিক চাওয়া-পাওয়ার আবদার করা অবাধ্যতা নয়। (হায়াতুস সাহাবা, ২/৬৮৪)
পরবর্তীতে স্ত্রীদের অতিরিক্ত ভরণপোষণের আবেদনে নবীজি (সা.) কষ্ট পান। সেই কষ্টের কারণে, টানা এক মাস স্ত্রীদের থেকে আলাদা থাকেন। এ সময় গুজব ছড়িয়ে পড়ে যে, তিনি তালাক দিয়েছেন। হজরত উমর (রা.) এসে জানতে পারেন, বিষয়টি সত্য নয়। তখন তিনি নবীজিকে হাসানোর চেষ্টা করেন এবং পরিবেশ স্বাভাবিক করেন। (বুখারি, হাদিস : ৫১৯১। মুসলিম, হাদিস : ১৪৭৯)
এই ঘটনার পর আল্লাহ তায়ালা নবীজিকে পরামর্শ দেন। তার স্ত্রীদেরকে দুনিয়ার সৌন্দর্য ও আখেরাতের মধ্যে কোনটিকে তারা পছন্দ করে সেই সুযোগ দিতে নির্দেশ দেন তারা সকেলেই আল্লাহ ও তার রাসুল এবং আখেরাতকেই বেছে নেন। (সুরা আহযাব, আয়াত :২৮-২৯)
নবীজির (সা.) সংসারে আমাদের জন্য অনেক কিছু শেখার রয়েছে। দাম্পত্য জীবনে মতভেদ হওয়া অস্বাভাবিক নয়। তবে ধৈর্য, ক্ষমা, পারস্পরিক বোঝাপড়া ও ন্যায়বিচারই একটি পরিবারকে টিকিয়ে রাখে। রাগের সময় সংযম, ভুল হলে সংশোধন এবং সম্পর্ক রক্ষার মানসিকতাই নববি আদর্শ। নিজেদেরকে এভাবে গঠন করতে পারলে সংসারে টানাপড়েন দীর্ঘ হবে ন। সংসার সুখের হবে।
সময়ের আলো/জেডআই