দক্ষিণ এশিয়ার জনগণের শান্তি ও কল্যাণ নিশ্চিতে সার্ককে (দক্ষিণ এশীয় আঞ্চলিক সহযোগিতা সংস্থা) কার্যকর করতে চায় বাংলাদেশ। এই ইস্যুতে আগামী ৬ জুলাই ঢাকার একটি শীর্ষস্থানীয় থিংক ট্যাঙ্ক সেমিনারের আয়োজন করেছে। এ ছাড়াও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সার্ক পুনরুজ্জীবনে আগামী ছয় মাসব্যাপী সময়ে একগুচ্ছ পরিকল্পনা বাস্তবায়নের উদ্যোগ নিয়েছে।
কূটনৈতিক সূত্রে জানা গেছে, বাংলাদেশের বর্তমান সরকারের পররাষ্ট্রনীতির অন্যতম ইস্যু হচ্ছে সার্ককে কার্যকর করা, যা সরকারপ্রধানসহ সংশ্লিষ্টরা একাধিকবার এ বিষয়ে কথা বলেছেন। সার্কের মহাসচিব রাষ্ট্রদূত গোলাম সারওয়ার গত ২৪ ফেব্রুয়ারি ঢাকায় পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। ওই সময়ে প্রধানমন্ত্রীর পক্ষে পররাষ্ট্রমন্ত্রী এই সংস্থার মহাসচিবকে সার্ক সচল করার বার্তা দেন। এদিকে ঢাকায় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে সার্ককে সচল করতে একগুচ্ছ পরিকল্পনা বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। যার মধ্যে আগামী ৬ জুলাই ঢাকায় বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ইন্টারন্যাশনাল অ্যান্ড স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজের (বিআইআইএসএস) আয়োজনে সেমিনার অনুষ্ঠিত হবে। পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলাম সেমিনারে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থাকবেন। ওই সেমিনারে সার্কভুক্ত দেশগুলোর রাষ্ট্রদূত ও হাইকমিশনার, গবেষকসহ সংশ্লিষ্টদের যোগ দেওয়ার কথা রয়েছে।
সার্ক সচল করার উদ্যোগ হিসেবে আগামী ছয় মাস বেশ কয়েকটি পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করবে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। যার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে ঢাকাস্থ সার্কের দেশগুলোর রাষ্ট্রদূত ও হাইকমিশনারদের সঙ্গে বৈঠক ও রিট্রিট আয়োজন, নেপালের রাজধানী কাঠমান্ডুতে অবস্থিত সার্ক সচিবালয়কে সার্কের সিনিয়র অফিসিয়ালস মিটিং আয়োজনের উদ্যোগ গ্রহণের জন্য বাংলাদেশের পক্ষ থেকে অনুরোধ করা, বাংলাদেশের পক্ষ থেকে সার্ক সচিবালয়কে মন্ত্রীদের নিয়ে বিশেষ বৈঠকের আয়োজন করতে অনুরোধ করা, সার্ককে কার্যকর ও পুনঃজাগরিত করতে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর পক্ষ থেকে সার্কভুক্ত দেশগুলোর রাষ্ট্রপ্রধান বা সরকারপ্রধানদের কাছে বিশেষ দূতের মাধ্যমে বার্তা পাঠানো, জাতিসংঘের আসন্ন ৮১তম সাধারণ অধিবেশনের সাইডলাইনে নিউইয়র্কে সার্কভুক্ত দেশগুলোর পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের জন্য রিট্রিট বা বৈঠকের আয়োজন করা, সার্কভুক্ত দেশগুলোর সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রীদের নিয়ে এবং আমন্ত্রিত সাংস্কৃতিক দলের অংশগ্রহণে সার্ক সাংস্কৃতিক উৎসবের আয়োজন, সার্কভুক্ত দেশগুলোর অংশগ্রহণে সার্ক পর্যটন উৎসবের আয়োজন, সার্কভুক্ত দেশগুলোর বিনিয়োগ, বাণিজ্য ও বণিক সমিতির প্রতিনিধিদের নিয়ে সার্ক বাণিজ্য সম্মেলনের আয়োজন, সার্কভুক্ত দেশগুলোর প্রথিতযশা নারী উদ্যোক্তাদের অংশগ্রহণে সার্ক নারী উদ্যোক্তা সম্মেলনের আয়োজন, সাংবাদিক ও গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠানের অংশগ্রহণে সার্ক সাংবাদিক সম্মেলনের আয়োজন, সার্ক বন্ধুত্বমূলক ক্রীড়া উৎসবের আয়োজন, আসন্ন ৪১তম সার্ক প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উদযাপন, সার্কভুক্ত দেশগুলোর থিংক ট্যাঙ্ক, সুশীল সমাজ, শিক্ষাবিদ ও গবেষকদের অংশগ্রহণে ট্র্যাক টু ডিপ্লোমেসির আওতায় সভা, সেমিনার ও কর্মশালা আয়োজন।
এদিকে বিগত ২০১৪ সালের পর সার্কের শীর্ষ সম্মেলন না হওয়ায় সংস্থাটি অনেকাংশে স্থবির। বিগত দিনগুলোতে এবং বর্তমানেও নেপাল চেয়ার হিসেবে সার্ককে পুনরুজ্জীবিত করার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। বাংলাদেশের ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দল তাদের ইশতেহারেও সার্ক পুনরুজ্জীবনের ঘোষণা দিয়েছে। ঢাকার কূটনীতিকরা নীরবে এই ইস্যুতে কাজ করছেন। সম্প্রতি বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ভারত সফরে তাদের সঙ্গে দক্ষিণ এশিয়ার এই সংস্থাটি পুনরুজ্জীবিত করার বিষয়ে আলাপ করেন। দক্ষিণ এশিয়ার ২০০ কোটি মানুষের ভাগ্য পরিবর্তন করতে বাংলাদেশ সার্ককে পুনরুজ্জীবিত করে কাজে লাগাতে চায়। যাতে দক্ষিণ এশিয়ায় চলমান থাকে শান্তি ও সমৃদ্ধির সুবাতাস।
বিশ্বব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, সার্কভুক্ত দেশগুলোর মধ্যে বার্ষিক ৬৭ বিলিয়ন ডলারের বাণিজ্য হওয়া সম্ভব। যেখানে বর্তমানে এই সংস্থাটির আঞ্চলিক বাণিজ্যের পরিমাণ মাত্র ২৩ বিলিয়ন ডলার। এই হিসেবে বাংলাদেশ চায় যে অব্যবহৃত ৪৪ বিলিয়ন ডলারকে বাস্তবে কাজে লাগাতে, যাতে এই অঞ্চলের মানুষের উপকার হয়। অন্যদিকে জাতিসংঘের এশিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের অর্থনৈতিক ও সামাজিক কমিশন এবং সার্কের গবেষণা অনুযায়ী দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে আঞ্চলিক বাণিজ্যের সম্ভাবণার পরিমাণ ১৭০ বিলিয়ন ডলার।
দক্ষিণ এশিয়ার আঞ্চলিক এই সংস্থাটির সনদ অনুসারে, এর প্রধান উদ্দেশ্য দক্ষিণ এশিয়ার জনগণের কল্যাণ ও জীবনযাত্রার মান উন্নয়ন। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, সামাজিক অগ্রগতি ও সাংস্কৃতিক উন্নয়ন ত্বরান্বিত করা, যৌথ আত্মনির্ভরশীলতা জোরদার করা, পারস্পরিক আস্থা, বোঝাপড়া ও সহযোগিতা বৃদ্ধি, অর্থনৈতিক, সামাজিক, প্রযুক্তিগত ও বৈজ্ঞানিক ক্ষেত্রে সক্রিয় সহযোগিতা। এ ছাড়া সার্ক সনদের অন্যতম নীতি অনুযায়ী এই সংস্থাটি দ্বিপক্ষীয় বিতর্কিত ইস্যু এড়িয়ে চলে। সার্কের বর্তমান চেয়ারম্যান নেপাল। সার্কের চেয়ারম্যানশিপ সাধারণত শীর্ষ সম্মেলন আয়োজনকারী দেশের প্রধানমন্ত্রী/রাষ্ট্রপ্রধানের কাছে থাকে। কিন্তু ২০১৪ সালের পর থেকে কোনো শীর্ষ সম্মেলন অনুষ্ঠিত না হওয়ায় (১৮তম সম্মেলন নেপালে হয়েছিল এবং ১৯তম শীর্ষ সম্মেলন গত ২০১৬ সালে পাকিস্তানে অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা থাকলেও ওই বছর ভারত-পাকিস্তানের মধ্যকার উচ্চ কূটনৈতিক উত্তেজনা এবং সীমান্ত সন্ত্রাসবাদজনিত পরিস্থিতির কারণে তা স্থগিত হয়) নেপাল এখনও চেয়ারম্যানশিপ ধরে রেখেছে। মূলত নেপালের প্রধানমন্ত্রী বর্তমানে এই চেয়ারম্যানশিপের প্রতীকী নেতৃত্ব দিচ্ছেন।
ঢাকার একজন কূটনীতিক বলেন, সার্ককে যদি যথাযথভাবে সচল রাখা যেত তবে দক্ষিণ এশিয়ার রাষ্ট্রগুলো অনেক বেশি শক্তিশালী হতো। দক্ষিণ এশিয়ার অর্থনীতিও অনেক ভালো হতো। বর্তমান বৈশ্বিক যুগে ক্ষমতাধর দেশগুলোর যে দাপট, সেখানে সার্ক সচল থাকলে এই আঞ্চলিক সংগঠন সহজেই আন্তর্জাতিক অঙ্গনে দক্ষিণ এশিয়ার পক্ষে একটা শক্তি হয়ে দাঁড়াতে পারত। অথচ ভারত-পাকিস্তান দুই দেশের বৈরিতার কারণে দক্ষিণ এশিয়ার পুরো অঞ্চলকেই এর দায় বহন করতে হচ্ছে।
পাকিস্তানের এশিয়া প্যাসিফিক বিভাগের একজন কূটনীতিক এই প্রতিবেদককে বলেন, ২০১৬ সালে ইসলামাবাদে সার্ক শীর্ষ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা ছিল। যা এখনও বাকি আছে। সবার আগে ইসলামাবাদের ডিউ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হতে হবে। তারপর সার্ক পুনরুজ্জীবিত হওয়ার বিষয়টি সামনে আসবে।
ভারতের সাউথ ব্লকের একটি কূটনৈতিক সূত্র এই প্রতিবেদককে জানান, পাকিস্তান একটি সন্ত্রাসী রাষ্ট্র। তাদের সঙ্গে পথচলা অসম্ভব। ভারত সন্ত্রাস ইস্যুতে জিরো টলারেন্স এ বিশ্বাস করে। পাকিস্তানকে সঙ্গে নিয়ে এই অঞ্চলের সমৃদ্ধি সম্ভব নয় বলেই ভারত বিমসটেক (বে অব বেঙ্গল ইনিশিয়েটিভ ফর মাল্টিসেক্টরাল টেকনিক্যাল অ্যান্ড ইকোনমিক কো-অপারেশন) গঠন করেছে এবং এ সংস্থাকেই দিল্লি এগিয়ে নিতে চায়।
সাবেক রাষ্ট্রদূত মো. মাহফুজুর রহমান দৈনিক সময়ের আলোকে বলেন, সার্ক একটা নন-স্টার্টার। আঞ্চলিক সহযোগিতা গড়ে ওঠে এবং ফলপ্রসূ হয় যখন ওই অঞ্চলের দেশগুলোর মধ্যে সুসম্পর্ক থাকে, নেতৃত্বের মধ্যে আস্থা ও শ্রদ্ধা থাকে এবং সম্মিলিতভাবে সামনে এগিয়ে যাওয়ার অভিপ্রায় থাকে, দর্শন থাকে। সার্ক অঞ্চলে এসবের কোনোটিই নেই। ফলে সরকারের এজেন্ডা বালখিল্যতা মাত্র।
ভারতের ও.পি. জিন্দাল গ্লোবাল ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক রাধা দত্ত দৈনিক সময়ের আলোকে বলেন, এখন সার্কের পুনরুজ্জীবন নিয়ে কোনো ভবিষ্যৎ দেখি না। এর আওতায় সাব-রিজিওনাল কার্যক্রমগুলো চলতে পারে। কিন্তু শীর্ষ সম্মেলন হওয়ার মতো কোনো উপাদান এখন এই অঞ্চলের রাজনীতিতে বিদ্যমান নেই। কেননা সার্কের দুই প্রভাবশালী রাষ্ট্র ভারত ও পাকিস্তান নিজেদের মধ্যে কোনো ফরমেটেই কোনো সংলাপ বা আলোচনায় বসে না। যেমন ভারত ও চীনের মধ্যে বৈরিতা থাকলেও এই দুই দেশ বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন ইস্যুতে সংলাপ করে। কিন্তু ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে একেবারেই সংলাপ বন্ধ। এমন পরিস্থিতিতে শীর্ষ সম্মেলন বা সার্ক পুনরুজ্জীবন হওয়ার সম্ভাবনা নেই। সার্ক প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে বাংলাদেশের বর্তমান প্রধানমন্ত্রীর বাবার মূল অবদান ছিল, সে জন্য হয়তো বাংলাদেশ এখন সার্ক পুনরুজ্জীবিত করার উদ্যোগ নিয়েছে। কিন্তু এটি কীভাবে সম্ভব হবে তা জানি না।
সময়ের আলো/আরবিএন