অ্যান্টার্কটিকার তলদেশে বিশ্বের সবচেয়ে মারাত্মক ধরনের ত্বকের ক্যানসার মেলানোমার চিকিৎসায় নতুন সম্ভাবনার সন্ধান পেয়েছেন বিজ্ঞানীরা। যুক্তরাষ্ট্রের দক্ষিণ ফ্লোরিডা বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকরা জানিয়েছেন, অ্যান্টার্কটিকার বরফঢাকা সমুদ্রের তলে বাস করা ক্ষুদ্র সামুদ্রিক প্রাণীদের শরীরে পাওয়া ব্যাকটেরিয়ার বিষাক্ত উপাদান এই ক্যানসারের কার্যকর ওষুধ হিসেবে ব্যবহৃত হতে পারে।
দ্য গার্ডিয়ানের এক প্রতিবেদন অনুযায়ী, সম্প্রতি ছয় সপ্তাহব্যাপী এক বিশেষ অভিযান চালিয়েছেন গবেষকদের এই দল। পৃথিবীর অন্যতম দুর্গম ও বরফাচ্ছন্ন অঞ্চল অ্যান্টার্কটিকায় তারা সামুদ্রিক অমেরুদণ্ডী প্রাণী ‘অ্যাসিডিয়ান’ বা সাধারণত যাকে ‘সি স্কুয়ার্ট’ বলা হয়, তার নমুনা সংগ্রহ করেন। বরফ ঠান্ডা পানিতেই এই প্রাণীগুলো স্বাভাবিকভাবে বেড়ে ওঠে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের রসায়ন বিভাগের অধ্যাপক ব্রায়ান বেকার জানিয়েছেন, শিকারি প্রাণীদের হাত থেকে নিজেকে রক্ষা করার জন্য এই প্রাণীগুলো স্বাভাবিকভাবেই এক ধরনের বিষাক্ত পদার্থ তৈরি করে। গবেষণায় দেখা গেছে, ওই বিষাক্ত উপাদানটিকে পরিবর্তন করে ওষুধ হিসেবে ব্যবহার করা সম্ভব। তাদের প্রাথমিক পরীক্ষায় ইঁদুরের শরীরে এই পদার্থটি মেলানোমা ক্যানসারের কোষ ধ্বংস করতে সক্ষম হয়েছে।
অধ্যাপক বেকার বলেন, ভালো খবর হলো, এই পদার্থটি ইঁদুরকে মারেনি। উল্টো তাদের শরীরের ক্যানসারকে ধ্বংস করেছে। এর মানে এই উপাদানটির শারীরবৃত্তীয় গুণাবলী ওষুধ হিসেবে কাজ করার উপযুক্ত। তবে তিনি স্পষ্ট করেছেন যে, আরও বড় পরিসরে পরীক্ষা চালানোর জন্য প্রচুর পরিমাণে এই পদার্থের প্রয়োজন। নিরাপত্তা ও কার্যকারিতা প্রমাণিত হলেই মানবদেহে পরীক্ষা শুরু করা সম্ভব হবে।
অভিযানটি ছিল অত্যন্ত কঠিন ও ঝুঁকিপূর্ণ। গবেষকদের ডুবুরি দলকে প্রায় ১৩০ ফুট গভীরতা পর্যন্ত পানির নিচে নামতে হয়েছে এবং প্রতিবার আধা ঘণ্টার মতো সেখানে কাজ করতে হয়েছে। অভিযানের ডুবুরি নিরাপত্তা কর্মকর্তা ও অধ্যাপক বেন মিস্টার জানিয়েছেন, কেবল হিমশীতল পানিই নয়, বরফের বাধা, বিপজ্জনক লেপার্ড সিল, অস্থির সমুদ্র ও দৃশ্যমানতার অভাব ছিল তাদের বড় চ্যালেঞ্জ। প্রতিটি ডুব দেওয়ার আগে নিরাপত্তা ও কাজের ভারসাম্য রেখে সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা তৈরি করতে হতো। মার্কিন বিজ্ঞান ফাউন্ডেশনের অর্থায়নে পরিচালিত এই অভিযানের পর এখন পরীক্ষণাগারে গবেষণার দ্বিতীয় পর্ব শুরু হয়েছে। মরু গবেষণা প্রতিষ্ঠান ও স্ক্রিপস ইনস্টিটিউশন অব ওশানোগ্রাফির সঙ্গে যৌথভাবে এই কাজ চলবে।
বিজ্ঞানীরা দীর্ঘদিন ধরেই ধারণা করছিলেন যে, এই বিষাক্ত উপাদান ক্যানসার প্রতিরোধে কাজে লাগতে পারে। এবারের অভিযানের মাধ্যমে তারা আরও বিশদভাবে জানতে পেরেছেন যে কীভাবে ক্যানসারনাশক এই ব্যাকটেরিয়াটি প্রাণীটির শরীরে বাস করে এবং তাদের পারস্পরিক সম্পর্ক কেমন।
তবে সবচেয়ে বড় বাধা হলো পর্যাপ্ত পরিমাণে এই পদার্থ সংগ্রহ করা। বেকার বলেন, একটি বাস্কেটবলের সমান আকারের প্রাণী সংগ্রহ করলেও আমরা প্রয়োজনীয় পরিমাণের মাত্র এক হাজার ভাগের এক ভাগ পদার্থ পাই। অ্যান্টার্কটিকা থেকে এত বেশি পরিমাণ প্রাণী সংগ্রহ করা সম্ভব নয়, কারণ এতে সেখানকার পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য ধ্বংস হয়ে যাবে। তাই আমাদের প্রধান লক্ষ্য এখন পরীক্ষণাগারে কৃত্রিমভাবে এই পদার্থটি তৈরি করার পদ্ধতি উদ্ভাবন করা।
অধ্যাপক বেকার জানিয়েছেন, তিনি ১৯৯০ সাল থেকেই সামুদ্রিক জীববিজ্ঞান ও রসায়ন নিয়ে কাজ করছেন। তার অভিজ্ঞতা বলছে, প্রাকৃতিক উৎস থেকে ওষুধ তৈরি করা নতুন কোনো বিষয় নয়। তার ভাষ্যমতে, যুক্তরাষ্ট্রের খাদ্য ও ওষুধ নিয়ন্ত্রণ সংস্থা এফডিএ অনুমোদিত ওষুধের অর্ধেকেরও বেশি উৎস হলো প্রকৃতি। শুধু অ্যান্টার্কটিকা নয়, বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলের সামুদ্রিক স্পঞ্জ, প্রবাল ও অন্যান্য জীব থেকেও নানা রোগের ওষুধ তৈরি হয়েছে।
মেলানোমা ক্যানসারের এই আবিষ্কারকে নিজের কর্মজীবনের অন্যতম শ্রেষ্ঠ সাফল্য হিসেবে উল্লেখ করেছেন বেকার। তিনি বলেন, পরীক্ষাগারের পাত্রে ক্যানসার কোষ ধ্বংস করা এক বিষয়, কিন্তু এর বাইরে গিয়ে সফল হওয়াটা অনেক কঠিন। আমরা ইতিমধ্যে অনেক বড় বাধা পার করেছি, তাই এখন আরও এগিয়ে যাওয়ার পথ সুগম হচ্ছে। তবে তিনি সতর্ক করে দিয়েছে যে, নিরাপদ ও কার্যকর ওষুধ তৈরি করে মানবদেহে ব্যবহারের অনুমতি পাওয়ার পথটি দীর্ঘ। এর জন্য ধাপে ধাপে কঠোর নিয়ম মেনে বিভিন্ন পর্যায়ের পরীক্ষা চালাতে হবে। তবে এবারের অভিযানের তথ্য ও অভিজ্ঞতা এই প্রক্রিয়াকে অনেকটা দ্রুততর করবে বলে তাদের বিশ্বাস।