এখন আর্জেন্টিনার সামনে নতুন চ্যালেঞ্জ- ২০২২ বিশ্বকাপের ধারাবাহিকতা বজায় রেখে শিরোপা ধরে রাখা। ছবি : সংগৃহীত
বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হিসেবে ২০২৬ বিশ্বকাপে খেলছে আর্জেন্টিনা। কাতারে দীর্ঘ ৩৬ বছরের অপেক্ষার অবসান ঘটিয়ে তৃতীয়বারের মতো বিশ্বকাপ জেতার পর এখন তাদের সামনে নতুন চ্যালেঞ্জ- শিরোপা ধরে রাখা। সাম্প্রতিক বছরগুলোর ধারাবাহিকতা, দলের ভারসাম্য এবং অভিজ্ঞ কোচিং স্টাফের কারণে আর্জেন্টিনাকে এখনও টুর্নামেন্টের অন্যতম বড় দাবিদার ধরা হচ্ছে।
১৯৩০ সালে প্রথম বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনা।
বিশ্বকাপ বাছাইপর্বে দক্ষিণ আমেরিকার দলগুলোর মধ্যে সবচেয়ে ধারাবাহিক পারফরম্যান্স দেখিয়েছে লিওনেল স্কালোনির দল আর্জেন্টিনা। ১৮ ম্যাচে ৩৮ পয়েন্ট নিয়ে তারা সবার আগে বিশ্বকাপ নিশ্চিত করে এবং শীর্ষস্থান দখল করে অভিযান শেষ করে। এই সাফল্য প্রমাণ করে, কাতারের ট্রফি জয় কোনো আকস্মিক ঘটনা ছিল না; বরং দীর্ঘ পরিকল্পনার ফল। তবে, এই যাত্রা একেবারে নিখুঁত ছিল না। বাছাইপর্বে কয়েকটি অপ্রত্যাশিত হারের মুখও দেখতে হয়েছে আর্জেন্টিনাকে। ঘরের মাঠে উরুগুয়ের কাছে পরাজয়, প্যারাগুয়ের বিপক্ষে হোঁচট কিংবা ভেনেজুয়েলার সঙ্গে ড্র মনে করিয়ে দিয়েছে যে বিশ্ব ফুটবলে কোনো ম্যাচই সহজ নয়। অনেক জয়ও এসেছে অল্প ব্যবধানে, যেখানে দলের রক্ষণভাগ ও গোলকিপারের দৃঢ়তাই বড় পার্থক্য গড়ে দিয়েছে।
অন্যদিকে, চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী ব্রাজিলের বিপক্ষে দুই লেগেই জয় আর্জেন্টিনার আত্মবিশ্বাস আরও বাড়িয়েছে। বিশেষ করে বুয়েনস আইরেসে বড় ব্যবধানে জয় শুধু সমর্থকদের আনন্দই দেয়নি, বরং দক্ষিণ আমেরিকায় আর্জেন্টিনার আধিপত্যও স্পষ্ট করেছে।
স্কালোনির সবচেয়ে বড় সাফল্য
আর্জেন্টিনা দলের কোচ লিওনেল স্কালোনি।
লিওনেল স্কালোনি জাতীয় দলের দায়িত্ব নেওয়ার সময় খুব বেশি কোচিং অভিজ্ঞতা নিয়ে আসেননি। কিন্তু অল্প সময়ের মধ্যেই তিনি এমন একটি দল গড়ে তুলেছেন, যেখানে ব্যক্তিগত তারকার চেয়ে দলগত সমন্বয় বেশি গুরুত্ব পেয়েছে।
অভিজ্ঞ ও তরুণদের ভারসাম্য, নির্দিষ্ট কৌশল এবং ড্রেসিংরুমে ইতিবাচক পরিবেশ- এই ৩টি বিষয় স্কালোনির দলের সবচেয়ে বড় শক্তি। তার অধীনেই আর্জেন্টিনা ২০২১ ও ২০২৪ সালে কোপা আমেরিকা এবং ২০২২ সালে বিশ্বকাপ জিতে আধুনিক ফুটবলের অন্যতম সফল দলে পরিণত হয়েছে।
মেসিই কী শেষ ভরসা?
মেসির ওপর নির্ভরতা কতটা কমাতে পেরেছে দল, এ প্রশ্ন জোরালো হচ্ছে।
লিওনেল মেসির নাম ছাড়া আর্জেন্টিনাকে কল্পনা করা এখনও কঠিন। বিশ্বকাপ জয়, কোপা আমেরিকা, ফাইনালিসিমা- সব বড় সাফল্যের কেন্দ্রে ছিলেন তিনি। তবে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এই প্রশ্নও জোরালো হচ্ছে- মেসির ওপর নির্ভরতা কতটা কমাতে পেরেছে দল?
জুলিয়ান আলভারেজ, লাউতারো মার্তিনেজ, আলেক্সিস ম্যাক অ্যালিস্টার, এনজো ফার্নান্দেজ, রদ্রিগো দে পল কিংবা ক্রিশ্চিয়ান রোমেরোদের মতো ফুটবলাররা এখন অনেক বেশি পরিণত। ফলে, আগের তুলনায় আর্জেন্টিনা এখন আরও ভারসাম্যপূর্ণ দল। তবুও বড় ম্যাচে মেসির উপস্থিতি এখনও প্রতিপক্ষের জন্য আলাদা চাপ তৈরি করে।
আর্জেন্টিনার সবচেয়ে বড় শক্তি হলো তাদের দলগত শৃঙ্খলা। স্কালোনির অধীনে খেলোয়াড়রা নিজেদের ভূমিকা সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা রাখেন। গোলকিপার এমিলিয়ানো মার্টিনেজের আত্মবিশ্বাস, শক্তিশালী সেন্টার-ব্যাক জুটি, পরিশ্রমী মিডফিল্ড এবং বহুমুখী আক্রমণভাগ- সব মিলিয়ে দলটি এখনও বিশ্বের অন্যতম সেরা।
তবে, চ্যালেঞ্জও কম নয়। বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হিসেবে প্রতিটি ম্যাচেই প্রতিপক্ষের বাড়তি মনোযোগ থাকবে। ইউরোপের শক্তিশালী দলগুলোর বিপক্ষে সাম্প্রতিক সময়ে প্রতিযোগিতামূলক ম্যাচ কম খেলাও একটি প্রশ্ন হয়ে থাকছে। পাশাপাশি, মেসি ও কয়েকজন অভিজ্ঞ ফুটবলারের বয়সও বিবেচনায় থাকবে।
বিশ্বকাপ ইতিহাসে আর্জেন্টিনা
এ পর্যন্ত ৩ বার শিরোপা জিতেছে আর্জেন্টিনা।
বিশ্বকাপের শুরু থেকেই আর্জেন্টিনা ফুটবলের অন্যতম শক্তিশালী দেশ। ১৯৩০ সালের প্রথম আসরেই তারা ফাইনালে উঠেছিল। এরপর ১৯৭৮ সালে নিজেদের মাটিতে প্রথম শিরোপা, ১৯৮৬ সালে দিয়েগো ম্যারাডোনার অনুপ্রেরণায় দ্বিতীয় এবং ২০২২ সালে মেসির নেতৃত্বে তৃতীয় বিশ্বকাপ জেতে।
বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনার হয়ে সর্বোচ্চ গোলদাতা লিওনেল মেসি। একইসঙ্গে বিশ্বকাপে দেশের হয়ে সবচেয়ে বেশি ম্যাচ খেলেছেনও তিনি। এই দুটি রেকর্ডই তার অসাধারণ ধারাবাহিকতার সাক্ষ্য বহন করে।
সামনে কী অপেক্ষা করছে?
বিশ্বকাপে অতীতের সাফল্য নতুন কোনো ট্রফির নিশ্চয়তা দেয় না। প্রতিটি আসরই নতুন পরীক্ষা। তবে বর্তমান স্কোয়াডের অভিজ্ঞতা, জয়ের মানসিকতা এবং স্কালোনির নেতৃত্ব আর্জেন্টিনাকে আবারও শিরোপার অন্যতম দাবিদার করে তুলেছে।
এখন দেখার বিষয়, বিশ্বচ্যাম্পিয়নের মুকুট ধরে রেখে আর্জেন্টিনা কি আবারও ফুটবল বিশ্বের সর্বোচ্চ মঞ্চে নিজেদের শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণ করতে পারে, নাকি নতুন কোনো শক্তির হাতে বদলে যাবে বিশ্ব ফুটবলের রাজত্ব।