একসময় নাজমুল হোসেন শান্তর নামের সঙ্গে ‘লর্ড’ শব্দটা জুড়ে দেওয়া হয়েছিল কেবল ব্যঙ্গ-বিদ্রুপ করে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তার ব্যাটিং নিয়ে ট্রলেরও যেন শেষ ছিল না। রান পাচ্ছেন না, ধীরগতিতে ব্যাটিং করছেন কিংবা সহজ সুযোগ নষ্ট করছেন। কিছু হলেই সমালোচনা শুরু হয়ে যেত। কিন্তু ক্রিকেটে সময়ই সবচেয়ে বড় জবাব। সময়ের সঙ্গে বদলে গেছে শান্তর গল্পও।
একবার এক সাক্ষাৎকারে শান্ত আক্ষেপ করে বলেছিলেন, ‘আমি মনে হয় বাংলাদেশের বিপক্ষে খেলি।’ দিনের পর দিন সমালোচনা আর ট্রলের চাপ বোঝাতেই কথাটা বলেছিলেন। এখন সেই কথাটাই যেন অন্য অর্থ পায়। কারণ, যাকে নিয়ে এত কথা হয়েছে, সেই শান্তই এখন একের পর এক সাফল্যে নিজের নাম লিখছেন।
সর্বশেষ ডারউইনে অস্ট্রেলিয়াকে ৯ উইকেটে হারিয়ে ইতিহাস গড়েছে বাংলাদেশ। আর সেই দলের অধিনায়ক ছিলেন শান্ত। অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে টেস্টে এটিই বাংলাদেশের প্রথম জয়। টেস্ট মর্যাদা পাওয়ার ২৬ বছর পর এমন জয় এসেছে তার নেতৃত্বে। এই জয়ের মধ্য দিয়ে বিদেশের মাটিতে অধিনায়ক হিসেবে তৃতীয় টেস্ট জয় পেলেন শান্ত, যা বাংলাদেশের কোনো অধিনায়কের সর্বোচ্চ।
সব মিলিয়ে ২০ টেস্টে নেতৃত্ব দিয়ে বাংলাদেশকে ৯টি জয় এনে দিয়েছেন শান্ত। তার নেতৃত্বে বাংলাদেশ হেরেছে ১০টি টেস্টে এবং ড্র করেছে একটিতে। জয়ের সংখ্যায় বাংলাদেশের টেস্ট অধিনায়কদের মধ্যে এখন সবার ওপরে তিনি। তুলনায় মুশফিকুর রহিম ৩৪ টেস্টে অধিনায়কত্ব করে পেয়েছেন ৭ জয়, ১৮ হার ও ৯ ড্র। অর্থাৎ সমানসংখ্যক ম্যাচে নেতৃত্ব দিয়েও মুশফিকের চেয়ে দুই জয় বেশি শান্তর।
অধিনায়ক শান্তর সাফল্য অবশ্য ডারউইনেই শুরু হয়নি। ২০২৩ সালে সিলেটে নিউজিল্যান্ডকে হারিয়ে ঐতিহাসিক টেস্ট জয় এনে দেন তিনি। একই বছর নিউজিল্যান্ডের মাটিতে ওয়ানডে ও টি-টোয়েন্টিতেও কিউইদের হারায় বাংলাদেশ। পরের বছর পাকিস্তানের মাটিতে দুই টেস্টের সিরিজে পাকিস্তানকে ২-০ ব্যবধানে হারানোর ইতিহাসেও নেতৃত্বে ছিলেন শান্ত। এই জয়গুলোই ধীরে ধীরে অধিনায়ক হিসেবে তার অবস্থানকে আরও শক্ত করেছে।
তবে শান্তর গল্প শুধু অধিনায়কত্বে নয়। ব্যাটসম্যান শান্তও এখন নিজের আলাদা পরিচয় তৈরি করেছেন। ৪৩ টেস্টে তার ব্যাট থেকে এসেছে ৯টি সেঞ্চুরি ও ৭টি ফিফটি। অর্থাৎ, অর্ধশতকের চেয়েও তার শতকের সংখ্যা বেশি। একবার উইকেটে থিতু হতে পারলে ইনিংসকে বড় করার সামর্থ্যই যেন তার সবচেয়ে বড় শক্তি। দলের প্রয়োজনের সময় লম্বা ইনিংস খেলে ম্যাচের গতিপথ বদলে দেওয়ার সামর্থ্যও দেখিয়েছেন, দেখিয়ে যাচ্ছেন নিয়মিতই।
অধিনায়ক হিসেবে ব্যাট হাতে শান্ত আরও উজ্জ্বল। নেতৃত্বের দায়িত্বে ২০ টেস্টে তার ব্যাট থেকে এসেছে ৫টি সেঞ্চুরি। ২০২৫ সালে গলে শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে এক টেস্টের দুই ইনিংসেই সেঞ্চুরি করেন তিনি। প্রথম ইনিংসে ১৪৮, দ্বিতীয় ইনিংসে অপরাজিত ১২৫। বাংলাদেশের প্রথম টেস্ট অধিনায়ক হিসেবে একই ম্যাচের দুই ইনিংসে শতক করার কীর্তিও গড়েন শান্ত।
২০২৪ সালে শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে ওয়ানডেতে ১২২ রানের অপরাজিত ইনিংসও খেলেছিলেন শান্ত। ওই ইনিংসের মাধ্যমে ওয়ানডেতে বাংলাদেশের অধিনায়ক হিসেবে সর্বোচ্চ ব্যক্তিগত রানের রেকর্ড গড়েন। ফলে অধিনায়ক হিসেবে তার সাফল্য শুধু জয়- পরিসংখ্যানে নয়, ব্যক্তিগত অর্জনেও ছড়িয়ে আছে। তবে পথটা সবসময় মসৃণ ছিল না। শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে একবার অধিনায়কত্ব থেকে সরে দাঁড়িয়েছিলেন। সেই অধ্যায় পেরিয়েই এখন তিনিই বাংলাদেশের সবচেয়ে সফল টেস্ট অধিনায়ক।
একসময় যাকে নিয়ে ট্রল করা হতো, আজ সেই শান্তই অনেক সমালোচককে নিজের ভক্তে পরিণত করেছেন। শুরুতে শান্তকে সমর্থন করায় তার ভক্তদেরও কটু কথা শুনতে হতো। এখন সেই সমালোচকরাই তার ব্যাটিং, নেতৃত্ব আর সাফল্যের প্রশংসা করছেন। পারফরম্যান্স দিয়েই যেন তিনি সমালোচকদের সবচেয়ে বড় জবাব দিয়েছেন।
ক্রিকেটে খারাপ সময় আসে, আবার সেটা কেটেও যায়। শান্তর ক্ষেত্রেও তাই হয়েছে। একসময় ‘লর্ড’ ছিল ট্রলের শব্দ, এখন সেই নামটাই যেন তার গল্পের এক অদ্ভুত অধ্যায়। সমালোচনার জায়গা থেকে উঠে এসে রেকর্ডের পাতায় নিজের নাম লেখানোর গল্প।
সময়ের আলো/প্রিন্ট/টিকে