কয়েক দিনের তীব্র পাল্টাপাল্টি সামরিক হামলার পর মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দাবি করেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধি দল কাতারের রাজধানী দোহায় ইরানের সঙ্গে একটি গুরুত্বপূর্ণ আলোচনায় বসবেন। ট্রাম্প সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ঘোষণা দেন যে, ইরান নিজেই এই বৈঠকের অনুরোধ করেছে। তবে তেহরান প্রশাসন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যে-কোনো ধরনের সরাসরি বা পরিকল্পিত বৈঠকের দাবি সম্পূর্ণ নাকচ করে দিয়েছে।
ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের সাথে রাজনৈতিক আলোচনার জন্য নয়, বরং চার মাসব্যাপী মার্কিন-ইসরায়েলি যুদ্ধ বন্ধের লক্ষ্যে চলতি মাসে স্বাক্ষরিত সমঝোতা স্মারকের (এমওইউ) অংশ হিসেবে জব্দকৃত ইরানি সম্পদ মুক্তির বিষয়টি তদারকি করতে তারা দোহায় একটি কারিগরি বিশেষজ্ঞ দল পাঠাচ্ছে। বর্তমান পরিস্থিতিতে ওয়াশিংটনের সঙ্গে কোনো পর্যায়েই কোনো বৈঠক করার ইচ্ছে তেহরানের নেই।
এদিকে কাতারের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র জানিয়েছেন যে, ট্রাম্পের মধ্যপ্রাচ্য বিষয়ক দূত স্টিভ উইটকফ এবং ট্রাম্পের উপদেষ্টা ও জামাতা জ্যারেড কুশনার উচ্চ-পর্যায়ের আলোচনার জন্য দোহা পৌঁছেছেন। তবে তারা ইরানি কর্মকর্তাদের সঙ্গে সরাসরি টেবিলে বসবেন না। মার্কিন দূতেরা মূলত কাতারি মধ্যস্থতাকারীদের সঙ্গে বৈঠক করে আলোচনার অগ্রগতি নিয়ে কথা বলবেন।
কাতার স্পষ্ট করেছে যে, জব্দকৃত ৬০০ কোটি (৬ বিলিয়ন) ডলারের সম্পদ এখনো তেহরানে হস্তান্তর করা হয়নি এবং এটি আলোচনার অগ্রগতির সঙ্গে সরাসরি জড়িত।
মার্কিন কর্মকর্তাদের মতে, দোহা সফরের ফাঁকে একটি কারিগরি বৈঠক হবে যেখানে সমঝোতা স্মারক কীভাবে বাস্তবায়ন করা যায় তার খুঁটিনাটি নিয়ে আলোচনা হবে। তবে এই উচ্চ-পর্যায়ের বৈঠকের মূল আলোচ্য বিষয় হবে ‘হরমুজ প্রণালী’ এবং এর নিয়ন্ত্রণ কার হাতে থাকবে। সম্প্রতি এই জলপথে উভয় পক্ষই নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করছে এবং গত সপ্তাহে হওয়া গোলাগুলি ও উত্তেজনা প্রশমনের জন্য দুই দেশ একটি বিশেষ হটলাইন ব্যবহার করেছিল।
দোহায় ইরানের মূল লক্ষ্য থাকবে তাদের জব্দকৃত তহবিল অবমুক্ত করা। তবে ট্রাম্প এবং তার শীর্ষ কর্মকর্তারা কাতারে থাকা ইরানের এই তহবিল ছাড়ের ক্ষেত্রে কঠোর শর্ত আরোপ করেছেন। ট্রাম্পের সাফ কথা, এই অর্থ শুধুমাত্র যুক্তরাষ্ট্র থেকে খাদ্য ও চিকিৎসা সামগ্রী কেনার জন্য ব্যবহার করতে পারবে ইরান।
অন্যদিকে তেহরান চায়, তারা যেন এই অর্থ স্বাধীনভাবে ব্যবহারের নিশ্চয়তা পায় এবং এমন কোনো ব্যবস্থার মুখোমুখি হতে না চায় যেখানে তহবিল নামমাত্র ছাড়া হলেও কার্যত তা হিমায়িত থাকবে। ভূ-রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, কাতার এখানে কোনো নিরপেক্ষ ডাকবাক্স নয়, তারা এই বিপুল অর্থের তত্ত্বাবধায়ক হওয়ায় দোহা এখন তেহরানের জন্য একটি বড় প্রলোভনের কেন্দ্র।
গত বৃহস্পতিবার থেকে সোমবার পর্যন্ত ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে ঘটে যাওয়া হামলাগুলো ছিল সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরের পর প্রথম পারস্পরিক আক্রমণের ঘটনা, যা পুরো চুক্তিটিকেই ভেস্তে দেওয়ার হুমকি সৃষ্টি করেছে। ওমানের কাছাকাছি একটি নতুন মার্কিন-সমর্থিত বিকল্প নৌপথ খোলার প্রচেষ্টাকে ইরান “অগ্রহণযোগ্য” বলে অভিহিত করেছে।
ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি বলেছেন, সমঝোতা স্মারক অনুযায়ী হরমুজ প্রণালী ৩০ দিনের জন্য ইরানের নিয়ন্ত্রণে থাকবে। এর আগে মার্কিন রুট ব্যবহার করা একটি কন্টেইনার জাহাজ ও তেল ট্যাঙ্কারে হামলার জবাবে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের সামরিক স্থাপনায় হামলা চালায়, যার পাল্টা জবাবে ইরান বাহরাইন ও কুয়েতের মার্কিন ঘাঁটিতে হামলা করেছিল।
বর্তমানে তেহরান ও ওয়াশিংটনের মধ্যে প্রধান অমীমাংসিত বিষয়গুলোর মধ্যে অন্যতম হলো সমঝোতা স্মারকের ৫ নং অনুচ্ছেদ। এই ধারা অনুযায়ী ইরান ৬০ দিনের জন্য পারস্য উপসাগর থেকে ওমান সাগর পর্যন্ত বাণিজ্যিক জাহাজগুলোর নিরাপদ ও বিনা খরচে যাতায়াতের ব্যবস্থা করবে। তবে এর ব্যাখ্যায় দুই দেশের সুস্পষ্ট ভিন্নতা রয়েছে।
ইরান মনে করে, চূড়ান্ত চুক্তিতে পৌঁছানোর আলোচনা চলাকালীন এই ৬০ দিন সামুদ্রিক চলাচল নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা তাদের হাতেই থাকবে। বিপরীতে যুক্তরাষ্ট্রের মতে, ইরানের উচিত নৌচলাচলের ওপর কোনো হস্তক্ষেপ না করে জাহাজগুলোকে নির্বিঘ্নে চলতে দেওয়া।
লেবানন পরিস্থিতি নিয়েও দুই দেশের সংঘাতের গভীরতা অনেক বেশি। মার্কিন-ইসরায়েলি বিমান হামলায় ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আলী খামেনির হত্যার জবাবে হিজবুল্লাহ ইসরায়েলে রকেট নিক্ষেপ করলে এই সংঘাত তীব্র রূপ নেয়। ইরান জোর দিয়ে বলেছে যে, আলোচনার পরবর্তী ধাপে যাওয়ার আগে লেবাননসহ সব জায়গায় যুদ্ধ বন্ধ করতে হবে এবং ইসরায়েলকে লেবানন থেকে সরে যেতে হবে।
তবে যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় হওয়া পৃথক চুক্তি অনুযায়ী হিজবুল্লাহ নিরস্ত্র না হওয়া পর্যন্ত ইসরায়েলি বাহিনী দক্ষিণ লেবাননে অবস্থান করতে পারবে। হিজবুল্লাহ ও ইরান দুই পক্ষই এই শর্ত প্রত্যাখ্যান করেছে। ফলে সব মিলিয়ে দোহায় এই আলোচনা কোনো যুগান্তকারী অগ্রগতি নয়, বরং আপাতত পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার একটি ভঙ্গুর চেষ্টা মাত্র।
সময়ের আলো/জেডি