বিশ্বকাপ ফুটবলের মঞ্চে আরও একটি মহানাটকীয়তার জন্ম হলো। টুর্নামেন্টের অন্যতম হট-ফেবারিট এবং বিশ্ব ফুটবলের পরাশক্তি নেদারল্যান্ডসের বিশ্বজয়ের স্বপ্ন চূর্ণ-বিচূর্ণ করে তাদের টুর্নামেন্ট থেকে বিদায় করে দিল মরক্কো। শেষ ৩২-এর স্নায়ুক্ষয়ী ও রুদ্ধশ্বাস এক লড়াইয়ে ডাচদের টাইব্রেকারে ৩-২ ব্যবধানে হারিয়ে শেষ ষোলোর টিকেট কেটেছে মরক্কোর অ্যাটলাস লায়ন্সরা।
শিরোপার অন্যতম দাবিদার নেদারল্যান্ডসের মতো এমন বড় দলের আকস্মিক ও ট্র্যাজিক বিদায় পুরো ফুটবল বিশ্বকে স্তব্ধ করে দিয়েছে। মাঠের নির্ধারিত ও অতিরিক্ত সময়ের খেলা ১-১ সমতায় থাকার পর, পেনাল্টি শুটআউটের চরম ভাগ্যপরীক্ষায় কমলা শিবিরের হৃদয় ভেঙে রূপকথার এক জয় ছিনিয়ে নিল মরক্কো।
ম্যাচের শুরু থেকেই দুই দলের মধ্যে কৌশলগত লড়াই দেখা যায়। নক-আউট পর্বের বাঁচা-মরার ম্যাচ হওয়ায় প্রথমার্ধে কোনো দলই রক্ষণভাগ উন্মুক্ত করতে চায়নি। নেদারল্যান্ডস বল দখলে এগিয়ে থাকলেও মরক্কোর জমাট রক্ষণভাগ ভাঙতে পুরোপুরি ব্যর্থ হয় ডাচ ফরোয়ার্ডরা। অন্যদিকে মরক্কোও মাঝেমধ্যে কাউন্টার অ্যাটাকে ওঠার চেষ্টা করলেও তা ফলপ্রসূ হয়নি। ফলে প্রথমার্ধের খেলা শেষ হয় গোলশূন্য ব্যবধানে। তবে দ্বিতীয়ার্ধে খোলস ছেড়ে বেরিয়ে আসে নেদারল্যান্ডস।
আক্রমণের ধার বাড়িয়ে ম্যাচের ৭২ মিনিটে ডেডলক ভাঙেন ডাচ তারকা কোডি গাকপো। তার দুর্দান্ত ও চোখধাঁধানো এক গোল গ্যালারিতে থাকা ডাচ সমর্থকদের বুনো উল্লাসে ভাসায় এবং দল ১-০ ব্যবধানে এগিয়ে যায়।
১-০ গোলে পিছিয়ে পড়েও হাল ছাড়েনি লড়াকু মরক্কো। ম্যাচের শেষ বাঁশি বাজার আগমুহূর্ত পর্যন্ত ডাচরা যখন জয়ের সুবাস পাচ্ছিল এবং ডাচ ডাগআউট উদযাপনের প্রস্তুতি নিচ্ছিল, ঠিক তখনই ডাচদের সেই আনন্দকে বিষাদে রূপান্তর করেন মরক্কোর ইসা দিওপ। নির্ধারিত ৯০ মিনিট শেষে যোগ করা সময়ের প্রথম মিনিটে এক অবিশ্বাস্য গোল করে স্টেডিয়ামে উপস্থিত মরক্কান সমর্থকদের গর্জনে মাতান দিওপ। ১-১ সমতায় শেষ হয় নির্ধারিত সময়ের খেলা।
এরপর ম্যাচের ভাগ্য গড়ায় অতিরিক্ত ৩০ মিনিটে। সেই ৩০ মিনিটেও দুই দল প্রাণপণে লড়েছে। মরক্কো একটি সুবর্ণ সুযোগ তৈরি করলেও ডাচ ডিফেন্ডারদের বাধায় তা কাজে লাগাতে পারেনি। ফলে অতিরিক্ত সময়েও কোনো গোল না হওয়ায় ম্যাচের চূড়ান্ত ফয়সালার জন্য রেফারি টাইব্রেকারের বাঁশি বাজান।
টাইব্রেকারের শুরুটা অবশ্য নেদারল্যান্ডসের পক্ষেই ছিল। ডাচদের হয়ে কুপমেইনার্স প্রথম শটে অত্যন্ত আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে গোল করার পর মরক্কোর নাঈফ আগুয়ের্দের নেওয়া প্রথম শটটি চমৎকারভাবে রুখে দেন ডাচ গোলরক্ষক। ফলে শুরুতেই লিড নেয় নেদারল্যান্ডস। কিন্তু এর পরেই নাটকের নতুন অঙ্ক শুরু হয়। দ্বিতীয় শটে ডাচদের ওপর চাপ বাড়ে এবং জাস্টিন ক্লুইভার্ট শট নিতে এসে লক্ষ্যভ্রষ্ট হন। অন্যদিকে মরক্কোর সেলিম আমাল্লাহ ঠান্ডা মাথায় গোল করে দলকে ১-১ সমতায় ফেরান। তৃতীয় শটে ডাচদের ওয়াউট ভেগহর্স্ট জোরালো শটে গোল করেন এবং মরক্কোর হয়ে সুফিয়ান রাহিমিও গোল করে ব্যবধান সমান রাখেন।
চতুর্থ শটে এসে ম্যাচের নাটকীয়তা চূড়ান্ত রূপ নেয়। নেদারল্যান্ডসের কুইন্টেন টিম্বারের শট লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়ে মাঠের বাইরে চলে যায়। মরক্কোর সামনে তখন এগিয়ে যাওয়ার সুবর্ণ সুযোগ, কিন্তু আশরাফ হাকিমির নেওয়া শটটি গোলবারে লেগে ফিরে আসলে স্কোরলাইন তখনও সমান থাকে। এরপর আসে পঞ্চম ও চূড়ান্ত শটের মাহেন্দ্রক্ষণ।
নেদারল্যান্ডসের কামিয়েল সামারভিলের নেওয়া শটটি বাঘের মতো ঝাঁপিয়ে পড়ে দারুণভাবে ঠেকিয়ে দিয়ে মরক্কোর ত্রাণকর্তা বনে যান গোলরক্ষক ইয়াসিন বুনো। ডাচদের বিদায় তখন সময়ের ব্যাপার মাত্র। মরক্কোর পক্ষে শেষ শট নিতে এসে বিন্দুমাত্র ভুল করেননি ইসমায়েল সাইবারি।
তার নিখুঁত শটটি বলের জাল স্পর্শ করতেই বাঁধভাঙা উল্লাসে মেতে ওঠে পুরো মরক্কো। নিজের আবেগ ধরে রাখতে না পেরে জার্সি খুলে ভোঁ-দৌড় দেন সাইবারি, আর তার পেছনে ছুটতে থাকেন পুরো দলের সতীর্থরা। ডাচদের কান্নার বিপরীতে মরক্কোর ঐতিহাসিক এক রূপকথার জয়ে শেষ হয় বিশ্বকাপের এই মহাকাব্যিক থ্রিলার।
সময়ের আলো/এসএকে